ঢাকা,  শুক্রবার   ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

দোয়ার বহুবিধ ফায়দা 

হাবীবুল্লাহ সিরাজ 
প্রকাশিত: ১৮:৩৬, ১ আগস্ট ২০১৯
দোয়ার বহুবিধ ফায়দা 
প্রতীকী ছবি

প্রথমের আমরা জানবো দোয়া কী? দোয়া হলো আহ্বান করা, ডাকা, আকর্ষণ করা ইত্যাদি। তবে আমরা যে দোয়ার আলোচনা করবো তা শুধু ডাকার অর্থেই ব্যবহার হয় না, বরং ডাকার সঙ্গে হৃদয়ের আকুলতা ব্যকুলতার মিশেল থাকে।

তাহলে আমরা বলতে পারি দোয়া হলো- হৃদয়ের কষ্ট আকুতি মিনতি করে আল্লাহর দরবারে কোনো কিছু চাওয়া। মুমিন জীবনে দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুমিন তার সকল কাজের প্রথম কাজ হলো দোয়া। এই দোয়ার আদেশ দিয়ে মহান আল্লাহ তার পাক কালামে ঘোষণা করেন,
 
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ

অর্থাৎ: ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।’ (সূরা: গাফির, আয়াত: ৬০)। 

Advertisement

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ

অর্থাৎ: ‘আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করে (আমি তা শুনি, আমি তাদের নিকটই) দোয়াকারী যখন দোয়া করে, আমার কাছে কিছু চায়, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই অর্থাৎ তার দোয়া কবুল করি। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক তথা আমার কাছে দোয়া করুক। এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক যেন তারা সঠিক পথে চলতে পারে।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৬)।

এতোক্ষণ আমরা কোরআনে দোয়ার আলোচনা শুনলাম। এবার হাদিসে মুবারকের মধ্যে দোয়া আলোচনা শুনবো। হাদিসে নববীতে দোয়ার অশেষ ফজিলতের কথা বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। বুখারি শরিফের এক হাদিসে রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
 
عن أنس بن مالك عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : الدعاء مخ العبادة

অর্থাৎ: ‘দোয়াই ইবাদতের মূল।’

ইবাদত যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন? এটা জানা থাকতে হবে যে, দোয়াই কিন্তু ইবাদতের মগজ। মগজ ছাড়া যেমন মানুষ চলতে পারে না, বা সুস্থ থাকতে পারে না। তেমনি দোয়া ছাড়াও ইবাদত কবুল হয় না। ইবাদত কবুলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ কান্নাকাটির দোয়া লাগে। দোয়াবিহীন ইবাদত কবুল হয় না। তাই ইবাদত যত গুরুত্বপূর্ণ তাতে দোয়াও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়। 

হাদিসের বিশাল ভাণ্ডারে দোয়ার যত ফজিলতের কথা; সম্ভবত অন্য কোনো বিষয়ে এতো ফজিলতের কথা নেই। সুনানে ইবনে মাজার এক হাদিসে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عن أبي هريرة -رضي الله عنه قال: ليس شيءٌ أكرمَ على الله من الدعاء

অর্থাৎ: ‘দোয়া থেকে অধিক প্রিয় ও সম্মানিত কোনো বস্তু আল্লাহ কাছে নেই।’
 
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, দোয়ার মাহাত্য কতো। মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া থেকে প্রিয় কোনো বস্তু নেই। 

দোয়ার মহত্ব ও বড়ত্ব বুঝার জন্য উল্লিখিত কোরআন হাদিসই যথেষ্ট। এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই সাহাবিদের মাঝে দোয়ার আমল ছিল পূর্ণমাত্রায়। সাহাবিদের দিন শুরু হতো দোয়া দিয়ে, দিন শেষ হতো দোয়া দিয়ে। দোয়ার জন্য তারা পাগলপাড়া ছিল। কখনো একাকি দোয়া করতেন, আবার কখনো প্রকাশ্যে অন্যদের সঙ্গে মিলে মিশে দোয়া করতেন। সামান্য থেকে সামান্য সমস্যায় দোয়ায় বসে যেতেন, কঠিন থেকে কঠিন বিপদেও দোয়া কে রাখতেন সর্বাগ্রে। 

সাহাবিরা দোয়ায় গুরুত্ব দিবে-ই না বা কেন? দোয়ায় গুরুত্ব না দিলে স্বয়ং আল্লাহ নারাজ হন। বান্দার ওপর আল্লাহ মারাত্মক অখুশি প্রকাশ করেন। সেই সংবাদ আমাদের জানাচ্ছেন রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি হাদিস শরিফে ইরশাদ করেন,
 
حدثنا قتيبة حدثنا حاتم بن إسماعيل عن أبي المليح عن أبي صالح عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم إنه من لم يسأل الله يغضب علي

অর্থাৎ ‘যে আল্লাহর কাছে দোয়া করে না, আল্লাহ তার ওপর ক্রোধান্বিত হোন।’ 

আজকের সমাজের মুসলমান ইবাদতে মনোযোগী ঠিকই, কিন্তু দোয়ায় তত মনোযোগী না। প্রতিদিন নামাজ পড়ে তাহাজ্জুদ পড়ে কিন্তু দোয়ায় বড়োই অলসতা। বিশেষ করে আজকের ছাত্রসমাজ। তাও আবার কওমি মাদরাসার ছাত্ররা। নিজের দোষ নিজেরা বলছি, আত্মসমালোচনা করছি! আমরা আজ দোয়ায় উদাসীন। দোয়া থেকে গাফেল আমরা। দোয়াতে আমরা সময় দিতেই চায় না। একারণে আমাদের চোখে কান্না আসে না। হৃদয় বিগলিত হয় না। কায়মানোবাক্যে রাব্বুল আলামিনের দরবারে পেশ করা হয় না হৃদয়ের আকুতি ও মিনতি। প্রাণভরে চাওয়া হয় না ইলমের উন্নতি ও জীবনের উগ্রগতি। দোয়াতে ঝরানো হয় না চোখের লোনাজল। আজকের কওমি ছাত্ররা যেসব কারণে পিছনে পড়ে আছে তন্মধ্যে অন্যতম একটি হলো দোয়ায় উদাসীনতা। সাপ্তাহিক তাহাজ্জুদ হয়, কিন্তু একটি দোয়া হয় না। প্রতিদিন আওয়াবিন পড়া হয়, কিন্তু দোয়ায় দুই মিনিট আকুতি জানানো হয় না। 

দোয়ার বহুবিধ ফায়দা রয়েছে। সবচে’ উল্লেখযোগ্য ফায়দা হলো দোয়া কখনো বিফলে যায় না। সঙ্গে সঙ্গে কবুল না হতে পারে, কিন্তু এই দোয়ার একটি প্রতিদান আছেই। হয়তো এই দোয়ার বদৌলতে মহান আল্লাহ তায়ালা কাল কিয়ামতের ময়দানে দোয়াকারীর মান ও মর্যাদা বুলন্দ করে দিবেন, হয়তো এই দোয়ার বদৌলতে দোয়াকারীর ওপর আগত বিপদ কাটিয়ে দেবেন। হয়তো এই দোয়ার বদৌলতে দোয়াকারীর পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। হাদিস শরিফে এসেছে, তোমরা বেশি বেশি করে আল্লাহর কাছে রোনাজারি করো। কেননা, রোনাজারির কখনো কবুল হওয়া থেকে বিফলে যায় না। যদিও তোমরা দেখ দোয়া কবুল হয়নি, কিন্তু বাস্তবতা হলো এই দোয়া ও রোনাজারির দ্বারা বান্দার দুনিয়াতে মান মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, আর পরকালে গোনাহ মাফ হয়। 

দোয়ার মাধ্যমেই আমাদের সবকিছু আল্লাহর কাছ হতে চেয়ে নিতে হবে। অবশ্য দোয়ার বিভিন্ন কায়ফিয়াত আছে। তবে হৃদয়ে দোয়া কবুলের পূর্ণ আশা নিয়ে যে দোয়া করা হয়, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই সেই দোয়া কবুল করেন।

প্রবন্ধের শেষ লগ্নে সকলের প্রতি এই আহবান জানাই, আসুন আমরা দোয়ায় মনোযোগী হই। দোয়াকে বানাই আমাদের হাতিয়ার। সকল চেষ্টা সাধনার আগে ও পরে বারবার চাই দোয়া আর দোয়া। আল্লাহ আমাদের সকল দোয়া কবুল করুন। আমিন। এই বলে আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি। 

ডেইলি বাংলোদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!