বিলুপ্তির পথে লাল কাঁকড়া
এক সময় কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাঁকড়ার দেখা মিলতো। সমুদ্র সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী (সায়মন বীচ) পয়েন্ট ছাড়াও সৈকতের নানা স্থানে টকটকে লাল কাঁকড়া দেখা যেতো। বর্তমানে এই আকর্ষণীয় লাল কাঁকড়া বিলুপ্ত প্রায়। এখন পুরো সৈকতজুড়ে লাল কাঁকড়া দেখা যায়না বললে চলে। তবে মাঝে মধ্যে টেকনাফ, ইনানী ও হিমছড়ি সৈকতের কিছু জায়গায় লাল কাঁকড়ার দেখা মিলে। সৈকতে যখন লাল কাঁকড়ার দল ছুটোছুটি করে, তখন দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন পুরো সৈকতে লাল গালিচা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের অধিকাংশই লাল কাঁকড়া দেখতে খুবই আগ্রহী, অনেকেই শুধু এক ঝলক টকটকে লাল এই কাঁকড়া দেখতে ছুটে আসেন সমুদ্রে। কিন্তু পর্যটকদের সেই বুকভরা আশা নিমিষেই বুকফাটা কষ্টে পরিণত হয়। কারণ পুরো সৈকত ঘুরে কাঁকড়ার দেখা পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। করোনাকালে যখন সমুদ্র সৈকতে পর্যটক যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তখন লাল কাঁকড়া দেখা গিয়েছিল সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে। নিষেধাজ্ঞা শেষে লাখ লাখ মানুষের পদচারণায় হারিয়ে গেছে কাঁকড়া।
কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও জেলে কারেন্টজাল বসিয়ে ধ্বংস করছে লাল কাঁকড়া। অসাধু জেলে ছাড়াও সম্প্রতি পরিবেশ বিরোধী কিছু ব্যবসায়ী অর্থের বিনিময়ে সৈকতে ঘোড়া ও বিচ বাইকের বেপরোয়া চলাচলে লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল বিনষ্ট করছে। এসব পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির অপার সুন্দর টকটকে লাল কাঁকড়া। এতে করে সৈকতের সৌন্দর্য্যে বিঘ্ন সৃষ্টির পাশাপাশি মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। প্রাকৃতিক এই জীব বিলুপ্ত হওয়ায় বিমুখ হয়ে পড়েছে পরিবেশবাদী পর্যটকদের অনেকেই।
সমুদ্র সৈকতের হিমছড়ি, ইনানী ও শহরের ডায়াবেটিক পয়েন্টের অদূরে নির্জন এলাকায় এখনো কিছু লাল কাঁকড়ার দেখা মেলে।
সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক শামসুল হক চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারে আমার আসা -যাওয়া ২০ বছরেরও বেশি। ছাত্র জীবনে কক্সবাজার খুব বেশি আসতাম। আসার কারণ হলো, সমুদ্রে গোসল করা, মুক্ত হাওয়া উপভোগ ও লাল কাঁকড়া দেখা। তখন সমুদ্রে নামলেই ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাঁকড়ার দেখা মিলতো। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হবে, বালুচরজুড়ে যেন রক্ত লাল কৃষ্ণচূড়া ছেয়ে গেছে। এখন কাঁকড়া পাওয়া আর দেখা ভাগ্যের ব্যাপার।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান, সমুদ্রসৈকতে লাল কাঁকড়া রক্ষায় বিচ বাইক ও ঘোড়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ সব প্রকার যানবাহন চলাচলে আইন চালু করার পাশাপাশি এই প্রাণীদের চারণ ভূমি চিহ্নিত করতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে সাগরে কারেন্টজাল বসানো। সৈকতে চরম অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে লাল কাঁকড়া।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কক্সবাজার এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান জানান, সৈকতে লাল কাঁকড় বা রাজ কাঁকড়া বিলুপ্ত প্রায়। সচরাচর এসব কাঁকড়ার দেখাই মেলে না। টেকনাফ, ইনানী ও হিমছড়ি সমুদ্র উপকূলে মাঝে মধ্যে কিছু লাল কাঁকড়া দেখা যায়। তাও জেলেদের ফেলে দেওয়া কারেন্টজালে আটকা পড়ে নিয়মিত প্রাণ হারাচ্ছে।