ভূত ভেবে লজ্জাবতী বানরকে পেটালো গ্রামবাসী
রাতে কখনো বাঁশের ঝাড়ে কখনো বা বড় কোন গাছের ডালে। খাদ্যের সন্ধানে এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে চলা। মাঝে মধ্যে সরু গলায় ডাকে। এমনই এক অজানা এক প্রাণীর ভয়ে আতঙ্কে এক গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবার। রাতে অনেকেই প্রাণীটির ভয়ে বের হন না ঘর থেকে।
অনেকেই প্রাণীটির নাম দিয়েছেন ‘ভূত’। তাই রাতে ভূতের খুঁজে এক গাছ থেকে আরেক খোঁজাখুঁজি করেন স্থানীয়রা। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাতে তারাবি নামাজ শেষে প্রাণীটির উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয়রা লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রাতের লাল চোখের এই প্রাণী মূলত আর কিছু নয় বিলুপ্তপ্রায় লজ্জাবতী বানর। প্রাণীটিকে দেখার পর স্থানীয়দের মনে থাকে কাঁটে ভূতের আতঙ্ক।
এই ঘটনা নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুরে। উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া গ্রামে গত কয়েক দিন ভূতের আতঙ্ক বিরাজ করলেও অবশেষে আতঙ্ককে পেয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। শুক্রবার রাতে সালাম কাজী বাসার সামনে বৈদ্যুতিক তার থেকে প্রাণীটিকে পিটিয়ে মাটিতে ফেলে। পরে স্থানীয় বাসিন্দা খালেক কাজী বানরটি উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যান।
বিষয়টি জানতে পেরে শনিবার বিকেলে খালেক কাজীর বাড়ি থেকে বানরটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য অ্যানিমেলস অফ সুসং এর সদস্যরা। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রাণীটিকে উদ্ধারের পর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সন্ধ্যায় উপজেলার সদর ইউনিয়নের গহীন বনে বানরটি অবমুক্ত করেন।
স্থানীয়রা জানান, গেল কয়েক দিন ধরে রাতে হঠাৎ গাছের ওপর থেকে অদ্ভুত শব্দ শুনতে পাচ্ছিল স্থানীয়রা। প্রথম দিকে স্থানীয়রা বিড়াল ভেবে এটি গুরুত্ব না দিলেও শব্দগুলো বিড়ালের মত না হয় আতঙ্ক তৈরি হয় তাদের মনে। মনে মনে ভাবতে শুরু করেন ভয়ঙ্কর কোনো প্রাণী হয়তো এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। অপরিচিত এ প্রাণী ভয়ে তাই অনেকেই আতঙ্কে দিন কাটিচ্ছেন। রাতে হঠাৎ প্রাণীটিকে দেখতে পেয়ে তাই যে যার মত লাঠিসোটা নিয়ে এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রাণীটি মাটিতে পড়ার পর স্থানীয়রা বুঝতে পারেন এটি কোনো হিংস্র জাতীয় প্রাণী নয়।
স্থানীয়রা আরো জানান, সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলায় বিভিন্ন প্রকারের বন্য প্রাণীর দেখা মিলতো। কিন্তু এখন কালের বিবর্তনে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত প্রায়। তার ওপর পাহাড়ে খাদ্য সংকটে বন থেকে লোকালয়ে আসছে বিভিন্ন প্রকার প্রাণী। বনভূমি উজাড় ও উপজেলার পাহাড়ি সোমেশ্বরী নদীতে বালু খেকোদের তাণ্ডবে আশ্রয় হারিয়ে বন্যপ্রাণী গুলো শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছেনা ।
স্থানীয় বাসিন্দা খালেক কাজী জানান, আমরা আগে কোনোদিন এই প্রাণীকে দেখি নি। সবার কাছেই এ প্রাণী অচেনা। গত কয়েকদিন ধরে গাছের কাছে ঘোরাফেরা করে এবং ডাকাডাকি করে। শুক্রবার রাতে কারেন্টের তার দিয়ে চলাচল করার সময় স্থানীয়রা এটিকে পিটিয়ে আহত করে। পরে গিয়ে প্রাণীটিকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসি এবং বিষয়টি স্থানীয় মেম্বারকে জানাই। তিনি প্রথম জানান এটি কোনো হিংস্র প্রাণী না। এটি বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর।
সেভ দ্য অ্যানিমেলস অফ সুসং সংগঠনের দফতর সম্পাদক শোভন ঘোষ জানান, সংবাদ পাওয়ার পর পরই বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানরটিকে উদ্ধার করি। আসলে প্রাণীটির তাদের কাছে অপরিচিত হয় তারা লাঠি সোটা দিয়ে পিটিয়ে আহত করেছে। এর ফলে হাতে, পায়ে এবং একটি চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাণী চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছি। যেহেতু আমাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী এবং চিকিৎসা সামগ্রী নেই তাই চিকিৎসকদের পরামর্শে এই প্রাণীটিকে আবার বনে অবমুক্ত করা হয়েছে। আমরা এর আগেও চারটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করেছি। ওই প্রাণীগুলোকে যেখানে অবমুক্ত করা হয়েছে এটিতেও একই জায়গায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এই নিয়ে এখন পর্যন্ত আমরা ২১ টি রেস্কিউ অপারেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণীদের বন্য অবমুক্ত করতে পেরেছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রাজিব উল আহসান জানান, লজ্জাবতী বানর খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসছে। আমরা তাৎক্ষণিক তাদেরকে উদ্ধার করে আবারও বনে অবমুক্ত করছি। আজো একটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধারের পর বিষয়টি সেভ দ্য অ্যানিমেলস অফ সুসং সদস্যরা জানানোর পরপরই প্রাণীটিকে চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছি। পরবর্তীতে প্রাণীটিকে সদর ইউনিয়নের গহীন বনে স্বেচ্ছাসেবকরা অবমুক্ত করছে।