ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

নতুন ঠিকানায় বিপন্ন সুন্ধি কাছিম

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:৩০, ১০ আগস্ট ২০২১
নতুন ঠিকানায় বিপন্ন সুন্ধি কাছিম
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

খরস্রোতা পানির স্রোতে মাছের ধরার জালে ধরা পড়েছে বিপন্ন প্রজাতির সুন্ধি কাছিম। মাছ নেই তাই ঝুড়িতে ছোট ছোট মাছের সঙ্গে বাজারে ঠাঁই হয়েছে তার।

বাজারে আসতেই অনেকে অনেক নামেই ডাকতে শুরু করেন ছোট এই কাছিমটিকে। বেশিরভাগ মানুষের কাছে এটি পরিচিতি পায় কচ্ছপ নামে। 

অনেকেই কৌতূহল নিয়ে প্রাণীটিকে দেখলেও এর মাঝে স্থানীয় এক চা বিক্রেতার নজরে আসে। শখের বশে জেলের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে নিয়ে আসেন দোকানে। প্লাস্টিকের নীল রঙের বালতির ভেতর পানি রেখে তার ভিতরে ছোট ছোট কিছু মাছ দিয়ে কাছিমটিকে রাখেন দোকানের এক কোণে। দোকানে চা খেতে আসা আরেক ব্যক্তি প্রাণীটিকে দেখে কৌতূহলবশত দর কষাকষি করে চা বিক্রেতার থেকে কিনে নেন খাওয়ার জন্য। 

এর মাঝেই বিপন্ন প্রজাতির এই কাছিমে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করতেই বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের।

সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং এর সদস্যরা ওইদিন রাতেই স্বেচ্ছাসেবকরা শহীদ মিয়ার সাথে যোগাযোগ করে প্রাণীটি উদ্ধারের পরিকল্পনা করেন। আজ দুপুরের পর শহীদ মিয়া ও স্বেচ্ছাসেবকদের চেষ্টায় আবারো উদ্ধার হয় প্রাণীটি। পরে সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের সদস্যরা শহীদ নিয়ার কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যের সন্ধি কাছিম টিকে কিনে নেন। 

পরে বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পৌর শহরের একটি জলাশয়ে বিপন্ন প্রজাতির এই প্রাণীটিকে অবমুক্ত করেন স্বেচ্ছাসেবকরা। এসময় স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রয়েল সংমা। আর সাথে সাথেই বিপন্ন এই সন্ধি কাছিমও ফিরে পেল নতুন ঠিকানা। 

প্রাণী ও পরিবেশ কর্মীদের বলেন, কাছিম একটি সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী। সাধারণত জল ও ডাঙ্গা উভয় স্থানেই বসবাস করেন। এদের প্রায় ৩শত প্রজাতির মাঝে সন্ধি কাছিম বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায়। এগুলো পাহাড়ের বড় বড় পাথরের খাঁজে ছোট ছোট মাছকে বেঁচে থাকেন। অনেক সময় তীব্র বৃষ্টি ও স্রোতের কারণে প্রাণী গুলো ভেসে চলে আসে। হয় তো পাহাড়ি কোন ঝর্ণাধারা থেকে পানির স্রোতে ভেসে এসে সোমেশ্বরী নদীতে জেলেদের মাছ ধরার জালে ধরা পড়ে কাছিমটি।  

এক সময় এই নদীতেই কাছিম, কচ্ছপ সহ শুশুকের অভয়াশ্রম ছিলো। তবে কালের বিবর্তনে ও নদীর নাব্যতা কমায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাশাপাশি বিলুপ্তি হয়ে গেছে কাছিম, কচ্ছপ সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। যদি নদীতে নিষিদ্ধ বাংলায় ড্রেজার দিয়ে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ সহ নদীতে বালু খেকোদের দূরত্ব বন্ধ করা যায় তাহলেই নদীতে আবারো জলজ প্রাণী সহ মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন প্রাণী ও পরিবেশ কর্মী। 

চা বিক্রেতার শহিদ মিয়া ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, গতকাল রবিবার সকালের দিকে আমি দোকানেই কাজ করতে ছিলাম হঠাৎ এক মাছ বিক্রেতার খাঁচার উপর সবাই ভিড় করছে দেখে আমিও গিয়ে দেখি ঘটনাটা কি। এই সময়ই ছোট্ট প্রাণীটি আমার নজরে আসে। আমি প্রাণীটির নাম টাম কোন কিছুই জানিনা। তবে প্রাণীটি দেখতে অনেক সুন্দর।  শখের বশেই মাছ বিক্রেতার কাছ থেকে প্রাণীটিকে কিনে বাড়িতে লালন-পালন করার চিন্তা করি।

তিনি বলেন, দোকানে বালতির ভিতর রাখার সময় আমার কাছে এক ব্যক্তি প্রাণীটিকে দেখে খুব জোরাজুরি করেই আমার থেকে নিয়ে যায়। এর আগে আমি প্রাণীটির বেশ কিছু ছবি আমার মোবাইল ফোনে তুলে রেখেছিলাম। রাতে এই ছবিগুলোই আমার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করি।

কিছুক্ষণ পরেই স্বেচ্ছাসেবকরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকে এবং প্রাণীটি আবারো উদ্ধার করার জন্য অনুরোধ জানান। পরে আজকে সকালে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আবারো প্রাণীটি নিয়ে এসে দুপুরে স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তুলে দিই। যে দাম দিয়ে কাছিম কিনেছিলাম স্বেচ্ছাসেবকরা যে দামও পরিশোধ করেই প্রাণীটিকে নিয়ে যায়। 

সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনিসুল হক সুমন ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, আমরা গত রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপন্ন প্রজাতির সন্ধি কাছিমের বিষয়টি জানতে পারি। রাতেই আমরা স্থানীয় চা বিক্রেতা শহীদ মিয়া সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রাণীটির উদ্ধারে সহযোগিতা চাই। আমি যোগাযোগ করার পর থেকেই তিনি ও আন্তরিক ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রাণীটিকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। আজ দুপুরের দিকে সাথে নিয়েই আমরা প্রাণীটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হই।

কাছিমটি এখন অনেক ছোট। এটির ওজন প্রায় আধা কেজির উপরে হবে। আমরা উদ্ধারের পরপরই বিকেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রয়েল সংমাকে সঙ্গে নিয়ে প্রাণীটিকে পৌর শহরের বড় একটি জলাশয় অবমুক্ত করি। এর আগে প্রাণীটিকে উদ্ধারের পরপরই স্থানীয় চা-বিক্রেতা শহিদ মিয়া কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে পরিশোধ করে সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠন প্রাণীটিকে কিনে নেন। যেহেতু তিনি একজন গরিব মানুষ। তিনিও কাছিমকে লালন পালনের জন্য কিনে রেখেছিলেন। তাই এই বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা এই উদ্যোগটি গ্রহণ করি।

ইউএনও রাজিব উল আহসান ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, আজ দুপুরের দিকে সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের সদস্যরা বিপন্ন একটা সন্ধি কাছিম উদ্ধারের ব্যাপারে আমাদের অবগত করেন। এর পরপরই আমরা স্থানীয় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী কর্মীদের সাথে কথা বলে বড় একটি জলাশয় প্রাণীটিকে অবমুক্তির জন্য নির্দেশনা প্রদান করি। যদিও প্রাণীটিকে নদী থেকে আটক করেছে। বর্তমানে নদীতে তীব্র স্রোত ও অগভীর পানি থাকার কারণেই কাছিমটিকে ও বড় জলাশয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। বিকেলের দিকে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রাণীটিকে অবমুক্ত করেন। 

 

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএস
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!