ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

বাঘ-হরিণ হত্যার নেপথ্যে প্রভাবশালীরা

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৩৭, ৩ জুন ২০২১
বাঘ-হরিণ হত্যার নেপথ্যে প্রভাবশালীরা
বাঘ-হরিণের চামড়া

প্রভাবশালী চক্রের অতিরিক্ত অর্থের লোভে সুন্দরবনের পাহারাদার রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে। বিশ্বের বৃহত্তর এ বনের বাঘ-হরিণ সহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী নিধনে বন সংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০টি শক্তিশালী গ্রুপ। 

গত বিশ বছরে চোরা শিকারীদের হামলাসহ বিভিন্ন কায়দায় সুন্দরবনের অসংখ্য বাঘের মৃত্যু হয়েছে। 

বাঘ রক্ষায় সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে বন্যপ্রাণী হত্যার দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছরের কারাদণ্ড রাখা হয়েছে। সুন্দরবনে বৈধভাবে প্রবেশ করে বন্যপ্রাণীর আক্রমণে নিহত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ লাখ টাকা ও আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েল-বেঙ্গল টাইগারের চামড়াসহ অন্য-অন্য অঙ্গ-প্রতঙ্গের চড়া মূল্য থাকায় বন-সংলগ্ন এলাকার কিছু অর্থলোভী প্রভাবশালীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে সুন্দরবনের পাহারাদার এই বাঘ। 

১৯৮০ দশক থেকে বাঘের চামড়া সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর বিদেশের বাজারে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। তবে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদ-পাই রেঞ্জ সংলগ্ন গ্রামগুলোয় ৮ থেকে ১০টি সংঘবদ্ধ বাঘ, হরিণ ও কুমিরসহ নানা বন্যপ্রাণী শিকারী চক্র ও তাদের গডফাদার রয়েছে। এদের অবস্থান শরণখোলা রেঞ্জ সংলগ্ন শরণখোলা, সোনাতলা, মোড়েলগঞ্জ, রাম-পাল, মোংলা, বরগুনা, পাথরঘাটা, চরদুয়ানী ও পিরোজপুরের মঠবাড়িয়াসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকা। বন্যপ্রাণী শিকারী চক্র মাছ ধরার জেলে সেজে বনে প্রবেশ করে। পরে বিভিন্ন প্রাণীর মাংসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে, ফাঁদ পেতে ও গুলি করে বাঘসহ হরিণ হত্যার পর স্থানীয় পদ্ধতিতে প্রসেসিং করে সংরক্ষণ করে। সুযোগ বুঝে পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকা পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তীতে হাত বদল হয়ে ওই চামড়া চলে যায় বিদেশের বাজারে। 

স্থানীয়ভাবে একটি বাঘের চামড়া শিকারীরা ২-৩ লাখ টাকা বিক্রি করলেও আন্তরর্জাতিক বাজারে তা বিক্রি হয় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা। যে কারণে বন-সংলগ্ন প্রভাবশালী চক্র অসাধু জেলেদের ম্যানেজ করে বাঘ, হরিণসহ সুন্দরবনের নানা প্রাণী হত্যা করে তা বিদেশের বাজারে পাচার করে যাচ্ছেন প্রভাবশালী চক্রের সদস্যরা। আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে মাঝে মধ্যে যারা আটক হচ্ছেন তারা চুনাপুটি মাত্র। এদের গড়ফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। 

বন-বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে একটি বাঘ ও ১৯ টি হরিণের চামড়াসহ ১৪ জন চোরা শিকারী ও পাচারকারীকে গ্রেফতার করে আইনশৃংখলা বাহিনী। গ্রেফতাররা হলেন, উপজেলার সাউথখালী এলাকার মো. গাউস ফকির, বাগেরহাট সদর উপজেলার মো. মোশারফ শেখের ছেলে ড্রাইভার মো. মনির হোসেন শেখ, রাজৈর গ্রামের মো. ইলিয়াস কাজী। 

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানান, সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ সংলগ্ন মধ্য সোনাতলা এলাকার বাসিন্দা মো. হাবিব তালুকদার (বাঘ হাবিব), মো. তানজের বয়াতী মো. আলম হাওলাদার ও বকুলতলা গ্রামের বাসিন্দা মো. চাঁন মিয়া হাওলাদার (ওরফে চাঁন্দু) এবং পাথরঘাটা এলাকার মালেক গোমোস্তাসহ একাধিক ব্যক্তি পাচার চক্রে জড়িত। বন-বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নানা ক্ষেত্রে এদেরকে সহায়তা করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে । বন বিভাগের হিসেবে ৫৪ টি বাঘের নানা কারণে মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে ১৫টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় গ্রামবাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে ১৪টি। আর চোরা শিকারীরা বিভিন্ন ফাঁদ ব্যবহার করে হত্যা করেছে ২৬টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। 

সর্বশেষ গত ২৯ মে পুলিশের জালে ধরা পড়ে উপজেলার মধ্য সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা সুন্দরবনের সাবেক বনদস্যু কদম আলী তালুকদারের ছেলে বাঘ খেকো মো. হাবিব তালুকদার। বাঘ শিকার করাই তার নেশা। গত ২০ বছরে বিভিন্ন কায়দায় তিনি বনের প্রায় ৭০টি বাঘ নানাভাবে হত্যা করেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

পাশাপাশি বন্যপ্রাণী নিধনের অপরাধে তার নামে ৮টি বন মামলাও রয়েছে। তাতেও শিকারের নেশা থেকে ফিরে আসেননি তিনি। গড়ফাদারদের দেয়া রসদ নিয়ে বাঘ হত্যার জন্য বছরের বেশির ভাগ সময় সুন্দরবনেই কাটান হাবিব। 

সুন্দরবন সুরক্ষা কমিটির সহ-সভাপতি ও উপজেলা কৃষকলীগ নেতা মো. ওয়াদুদ আকন বলেন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী নিধনের ক্ষেত্রে বন সংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালীরা অনেকটা দায়ী। কিছু অসাধু লোক তাদের ছত্রছায়ায় থেকে এসব অপকর্ম করে আসছেন। পাশাপাশি বনবিভাগসহ পুলিশের টহল ব্যবস্থা জোরদার না থাকার কারণে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা মোটরসাইকেলের মাধ্যমে ঢাকা, চট্রগ্রাম, বাগেরহাটসহ দেশের নানা প্রান্তে হরিণের মাংসসহ বন্যপ্রাণীর অঙ্গপ্রতঙ্গ পাচার করার সাহস পাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে ২-১টি চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশই ধরা ছোয়ার বাইরে। 

নিয়ম অনুযায়ী জেলেদের সব নৌকা ও ট্রলার বনে প্রবেশ এবং বের হওয়ার সময় বনরক্ষীরা তল্লাশী করবেন কিন্তু তারা অনেক ক্ষেত্রে ম্যানেজ হয়ে সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন না। তাছাড়া পুলিশের টহল বৃদ্ধি করে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলসহ ঢাকা চট্রগ্রামগামী পরিবহনগুলোর দিকে নজরদারী বাড়ানো হলে পাচার কার্যক্রম কিছুটা বন্ধ হবে। তাছাড়া আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়া শিকারীদের আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে গড়ফাদারদের নাম বেরিয়ে আসবে। 

এ বিষয়ে শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, অপরাধী চক্রকে সহযোগিতা করার বিষয়টি গুজব। তবে, শিকারি হাবিব বন বিভাগ ও পুলিশে কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড। তার নামে ৮টি এবং মালেক গোমস্তার নামে ৩০টি মামলা রয়েছে। তবে, বন্যপ্রাণী নিধনের পেছনে গডফাদারদের হাত থাকলেও আমরা কিছুই করতে পারছি না। কারণ সু-নির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের অভাবে জড়িত প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!