ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

দুগ্ধ খামারিদের মুখের হাসি কেড়ে নিচ্ছে গো-খাদ্য

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা 
প্রকাশিত: ১৮:১৮, ১ জুন ২০২১
দুগ্ধ খামারিদের মুখের হাসি কেড়ে নিচ্ছে গো-খাদ্য
বিক্রয়কেন্দ্রে দুধ বিক্রি করছেন খামারিরা

রমজানের আগে দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খামারিদের উৎপাদিত দুধের দাম দু’ দফা দাম বাড়িয়েছে। এতে দুধের ভালো দাম পাওয়ায় বৃহত্তর পাবনার অর্ধলাখ খামারি খুশি। দুধের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দুধ ব্যবসায়িরা এখন পর্যাপ্ত দুধই জোগান দিতে পারছেন না। দুধের দামে খুশি হলেও গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় খামারিরা আশানুরূপ লাভবান হতে পারছেন না। 

খামারিরা সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সরকারিভাবে গো-খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি চালু ও এর মাধ্যমে ভর্তুকি প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। গো-খাদ্যের দাম না কমলে অনেকের পক্ষে গাভি পালনই সম্ভব হবে না বলে জানান অনেক খামারি।

দুধের দেশ নিউজিল্যান্ড খ্যাত বৃহত্তর পাবনার কয়েকটি উপজেলার (সাঁথিয়া, বেড়া, শাহজাদপুর, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া) অধিকাংশ গ্রামের বসতবাড়ির অঙিনায় ও বাথান এলাকায় গবাদিপশু পালন করা হয়।  লক্ষাধিক উন্নতজাতের গাভি পালনের আয়ে এলাকাবাসীর আর্থিক অবস্থায়  বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। উন্নতজাতের গাভি পালন করে এসব এলাকার হাজার হাজার কৃষক অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। এমন অনেক খামারি আছেন যাদের কৃষি কাজ করে এক সময়ে দু’বেলা পেটের ভাতই জুটত না, সেই তারাই এখন গাভি পালন করে প্রতিদিন ১ মণ থেকে ২ মণ দুধ বিক্রি করে প্রতিদিন ২ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা আয় করছেন। আয়ের অর্থ দিয়ে তারা প্রতি বছর জমিজমা কেনা থেকে শুরু করে ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাচ্ছেন।

বাজারে দুধ বিক্রির করছেন ক্ষুদ্র খামারিরা

সাঁথিয়া উপজেলার রতনপুর গ্রামের ফজলু খান নামে এক গো-খামারির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দু’বছর আগে তিনি  ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ‘ফ্রিজিয়ান-১০০’ জাতের একটি গাভি কিনে লালন-পালন করেন। গাভিটির বর্তমান মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা। ওই গাভিটি ১ বছর আগে একটি উন্নতজাতের বাছুর জন্ম দেয়। বাছুরটির বর্তমান দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ওই গাভিটি সম্প্রতি আরো একটি উন্নতজাতের বকনা বাছুর প্রসব করেছে যার বর্তমান দাম প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া ওই গাভিটি প্রতিদিন ২২ লিটার করে দুধ দিচ্ছে। গড়ে ৪৫-৫০ টাকা লিটার দরে প্রতিদিন ১ হাজার টাকা উপার্জন হচ্ছে। এ থেকে গাভিটির খাওয়া খরচ হিসাবে ৩০০ টাকা বাদ দিলে প্রায় ৭ শ’ টাকা আয় থাকছে। এ হিসেবে প্রতি মাসে তার লাভ হচ্ছে ২১ হাজার টাকা। এ আয় থেকে তিনি সংসার খরচ চালিয়েও বাড়তি সঞ্চয় করে প্রতিবছর জমি কিনছেন। রতন শেখের মতো হাজার হাজার গো-খামারি বৃহত্তর পাবনা জেলায় উন্নতজাতের গাভি পালন করছেন। কেউ তাদের বসতবাড়িতে আবার কেউ কেউ ও বাথানে গাভি পালন করেন।

প্রাণ ডেইরি মিল্কের শাহজাদপুরের এজিএম  ইফতেখারুল ইসলাম জানান, এবার রমজানের আগে দু দফায় দুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে চাষিরা ফ্যাট ভেদে ৪৩- ৫০ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করতে পারছেন। 

তিনি আরো জানান, ক্ষেত্রবিশেষ ফ্যাটের মাত্রা বেশি হলে চাষিরা ৫৫ টাকা লিটার পর্যন্ত দাম পাচ্ছেন। বৃহত্তর পাবনায় শুধু প্রাণেরই প্রায় ৩০টি দুগ্ধ ক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সব কোম্পানিই দুধের দাম বেশি দিচ্ছেন খামারিদের।

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার অন্যতম দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চল ডেমরার খামারি ও দুধ ব্যবসায়ি শামীম হোসেন জানান, চাষিদের সেই দুর্দিন নেই। তারা এক সময় উপযুক্ত দাম না পেয়ে রাগে, ক্ষোভে এক সময়ে রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ করেছেন। এখন চাষি ও খামারিরা দুধের দামে খুশি। তবে গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। 

তিনি জানান, গমের ছাল বস্তাপ্রতি ১১ শ’ টাকার জায়গায় হয়েছে ১২ শ’ টাকা, কাউফিড বস্তাপ্রতি ৯শ’ টাকার জায়গায় বেড়ে হয়েছে ১০৫০ টাকা। ডালের ভুসি বস্তা (৩৫ কেজি)প্রতি কিনতে হচ্ছে ১২ শ’ টাকা, এ্যাংকর ডালের ভুসি ৮ শ’ টাকা টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। 

তিনি জানান, ধানের খড়ের দামও বেশি। ৬শ’ টাকা মণ দরে খড় কিনতে হচ্ছে। খড়ের মণ নাকি ৩০ কেজিতে। প্রতি শতাংশ জমির জাম্বু ঘাস কিনতে হচ্ছে ৩০০ টাকা দরে, প্রতি শতাংশ জমির নেপিয়ার ঘাস ৪০০ শ’ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। গো-খাদ্যের দাম কমানো না হলে কিম্বা খামারিদের ভর্তুকি মূল্যে গো- খাদ্য না দিলে তাদের পক্ষে খামার রাখা অসম্ভব হয়ে উঠবে। 

করিমন যোগে সরবরাহ করা হচ্ছে খামারিদের দুধ

ফরিদপুর উপজেলার দুগ্ধ সমবায় সমিতির ম্যানেজার হযরত আলী জানান, তারা বিক্রয়কেন্দ্রে ফ্যাট ভেদে ৪২- ৪৪ টাকা কেজি দরে দুধ বিক্রি করতে পারছেন। 
তিনি জানান, এমন দাম থাকলে তারাও লাভবান, খামরিরাও লাভবান। কিন্তু খামারিদের লাভটা শেষ হয়ে যাচ্ছে গো-খাদ্যের দাম বাড়ার কারণে। তিনি বলেন এক কেজি খৈলের দাম ৪০-৪২ টাকা। তাহলে কৃষক কীভাবে দুধেল গাভিকে খৈল খাওয়াবেন?  

তিনি জানান, বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে দুধের এখন ভালো কদর। তিনি প্রতিদিন অন্তত তিনশ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ লিটার দুধ সরবরাহ করেন। তার এলাকায় তার মত দুই- তিনশ’ দুধের ব্যাপারি রয়েছেন। যারা এলাকায় ‘ঘোষ’ বলে পরিচিত। 

সাঁথিয়ার পোরাট দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির ফজলুর রহমান জানান, গাভি লালন-পালন করা অনেক কষ্টের ব্যাপার। তার খাবার প্রস্তুত করে খাওয়ানো, পরিচর্যা, দুধ দোহন করা, গোয়াল পরিষ্কার করা, গাভির গোসল সবই সময় ও শ্রমের ব্যাপার। গো- খাদ্য কেনার জন্য প্রকৃত খামারিদের ভর্তুকি দিলে ক্রেতা ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হতেন।

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের( মিল্কভিটা) সাবেক সভাপতি হাসিব খাঁন তরুণ জানান, বৃহত্তর পাবনা জেলায়  অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ লিটারের বেশি দুধ উৎপাদন হয়। দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা পাবনার ভাঙ্গুড়া ক্রয়কেন্দ্র , সিরাজগঞ্জের লাহিড়ী মোহনপুর ও বাঘাবাড়ি মিল্কভিটায় প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ লিটার দুধ সরবরাহ করেন। এ অঞ্চলে প্রায় এক হাজার দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমিতির মাধ্যমে এ দুধ সরবরাহ হয়। সমিতিভুক্ত মোট সদস্যের সংখ্যা ৫০ হাজার। এ ছাড়া সমিতির বাইরেও কয়েক হাজার খামারি দুধ সরবরাহ করে থাকেন। এছাড়া ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ২৮ থেকে ২৯ হাজার লিটার দুধ কিনে থাকে। বে-সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুধ কিনে প্রক্রিয়াজাত করে রাজধানীতে পাঠাতে অনেক বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছে। অধিকাংশ স্থানে খামারিরা বাড়ি বসেই দুধ বিক্রি করতে পারেন। ঘোষরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে দুধ কিনে এসব কেন্দ্র সরবরাহ করেন।  

তিনি জানান, এখন কাঁচা ঘাস ও খেসারি না থাকায় অনেক খামারিরা বাথান থেকে গরু খামারে নিয়ে এসেছেন। এ সময়ে গো-খাদ্য বেশি কেনা লাগছে খামরিদের। এজন্য দুধের উৎপাদন খচর বেশি পড়ছে। তবে চাষিরা দুধের দাম ভালো পাচ্ছেন। গো-খাদ্যের দাম কম থাকলে খামরি ও চাষিরা আরো লাভবান হতে পারতেন। 

তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার লাহিড়ী মোহনপুর এলাকায় সরকারি ২৭ কোটি টাকা সরকারি অর্থ সহায়তা ও মিল্কভিটার অর্থায়নে একটি গো-খাদ্য প্লান্ট করা হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের সমবায়ী গো-খামারিরা ন্যায্য মূল্যে সুষম গো-খাদ্য ক্রয় করে সার্বিকভাবে লাভবান হচ্ছিলেন। সেখান থেকে খামারিরা গো-খাদ্য কিনে একমাস পরও টাকা দিতে পারতেন। তাদের দেয়া দুধের টাকা থেকেও মিল্কভিটা গো-খাদ্যের টাকা সমন্বয় করে দেয়া হতো। 

তিনি জানান, দুঃখজনক ব্যাপার হলো গত তিন মাস ধরে সেখানে কোনো গো-খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে না। নানা অজুহাতে বন্ধ রাখা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে খামারিদের গো-খাদ্য কেনায় সহজেই ভর্তুকি দেয়া সম্ভব। কারণ এখানে যারা দুধ দেবেন তারাই ভর্তুকিতে গো-খাদ্য কিনতে পারবেন। এতে কোনো ভুয়া খামারির কম দামে গো-খাদ্য কেনার সুযোগ থাকবে না। খামারিদের লাভবান করতে এ প্রতিষ্ঠানটিকে সরকার ব্যাপকভাবে কাজে লাাগতে পারে। খামারিরা সাশ্রয়ী দামে গো-খাদ্য কিনতে পারলে ভোক্তা এবং উৎপাদনকারী উভয়েই উপকৃত হবেন। 

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, পাবনায় কাঁচা ঘাসের প্রাচুর্য রয়েছে। জেলায় প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঘাস চাষ করা হয়। তবে দানাদার খাদ্যের দাম কিছুটা বেশি। সেটাতে ভর্তুকি দেয়ার ব্যাপারে তার স্থানীয়ভাবে কিছু করার নেই। এটা নীতি নির্ধারকদের বিবেচনার বিষয়। তবে চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং লাভবান হচ্ছেন। 
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!