মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ-হত্যায় স্বীকারোক্তি আদায়, জীবিত ফিরল স্কুলছাত্রী
নিখোঁজ স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিস। আদালতে এ স্বীকারোক্তি না দিলে তোদের গুলি করে হত্যা করা হবে। এমন ভয়ভীতি দেখিয়ে দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি করিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকতা শামীম আল মামুন। এ অভিযোগ করছেন কারাগারে বন্দি থাকা তিন যুবকের পরিবারের স্বজনেরা।
সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার মূল ফটকের সামনে থেকে এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণের মামলায় গ্রেফতার করা হয় যুবক আব্দুল্লাহ, তার বন্ধু রকিব ও নৌকার মাঝি খলিলকে।
গ্রেফতার আব্দুল্লাহর মা শিউলী আক্তার বলেন, আব্দুল্লাহ ওয়ার্কশপে কাজ করতো। আমার ছেলের একটি স্টেটমেন্ট ছিলো যে, আমি ওর সঙ্গে ঘুরেছি একসঙ্গে। আর কিছু করিনি। বিনা কারণে আমার ছেলেকে এত কিছু সহ্য করতে হয়েছে। যদি আমার ছেলে কিছু করতো তাহলে মেয়েটা জীবিত ফিরে আসলো কেমনে? আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামীমকে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন জানিয়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরো বলেন, প্রথমে যখন ধরে আনে তখন টর্চার যাতে না করে সেজন্য ৭ হাজার টাকা দিয়েছি। পরে আরো ৩ হাজার টাকা দিয়েছি। টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। টাকা দেয়ার পর সে (এসআই শামীম) বলেছে, আমার ছেলেকে মারবে না। কিন্তু মেরে তার কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছে।
নৌকার মাঝি খলিলের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, সন্দেহ করে আমার স্বামীকে ধরে এনেছে। পরে পুলিশ বলছে, ওই মেয়েকে নাকি আমার স্বামী মেরে ফেলেছে। এখন তো দেখতেছি এ মেয়ে বেঁচে আছে। আমার স্বামীকে কেন পুলিশ ফাঁসিয়েছে সেটা আমি জানতে চাই।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ছোটবেলা মা-বাবাকে হারিয়ে আমি এতিম। স্বামী উপার্জন না করলে না খেয়ে থাকি। এ কয়েক দিন আমার তিনটা মেয়ে নিয়ে আমি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। এসআই শামীমের বিরুদ্ধে টাকা নেয়ার অভিযোগ করেন শারমিনও।
তিনি বলেন, টাকা না দিলে জেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল শামীম স্যার। টাকা না দেয়ায় আমার স্বামীকে সারারাত ঝুলিয়ে পিটিয়েছে। এ কথা শুনার পর আমি অনেক কষ্ট করে সাত হাজার টাকা দিয়েছি।
শারমিন আরো বলেন, আমার স্বামী নির্দোষ, তারে ছেড়ে দেন। এ কথা বারবার পুলিশরে বলছি। তখন আমারে কইলো, বেশি কথা বইলো না। বেশি কথা বললে সবাইরে জেলে ঢুকাইয়া দিমু।
রকিবের ভাই সজিব জানান, পুলিশ আমার ভাইকে বাসা থেকে নিয়ে এসেছে সাক্ষী দিতে হবে । কিন্তু পুলিশ তারে মার্ডার মামলার আসামি বানাইয়া দিল। দুই দফায় রিমান্ডে এনে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। আবার জেলও খাটছে এর বিচার আমি চাই।
নগরীর দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার পঞ্চম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি জিডি করেন তার বাবা। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় অপহরণ মামলা করেন।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ ও তার বন্ধু বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিবকে। ওইদিনই তাদের গ্রেফতার করা হয়। একই ঘটনায় দুই দিন পর গ্রেফতার করা হয় বন্দরের একরামপুর ইস্পাহানি এলাকার বাসিন্দা নৌকার মাঝি খলিলকে।
গত ৯ আগস্ট পুলিশ জানায়, স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয় আসামিরা। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে বলেও জানায় পুলিশ। অথচ গত ২৩ আগস্ট দুপুরে বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকায় সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া যায় নিখোঁজ স্কুলছাত্রীকে। এ ঘটনায় চারদিকে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেয়া জবানবন্দি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এদিকে আসামিদের স্বজনেরা বলছেন, পুলিশি হেফাজতে অমানুষিক নির্যাতনের মুখে তারা ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পুলিশ এ ঘটনা সাজিয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানা পুলিশের এসআই শামীম আল মামুন আসামির স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধ উপায়ে কয়েক হাজার টাকা নিয়েছেন বলেও রয়েছে অভিযোগ।