মৃত্যুর আগে চিকিৎসককে যা বলেছিল নুসরাত
ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছিল নুসরাত।
এ হত্যাকাণ্ডের রায়ে ১৬ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান।
এ মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণকালে তার মা শিরিনা আক্তার জানান, ২৭ মার্চ খবর শুনেই আমি মাদরাসায় যাই। সে সময় অধ্যক্ষ আমার সঙ্গে ভীষণ খারাপ ব্যবহার করেন। পরে সোনাগাজী থানার দারোগা ইকবাল এসেও কটু কথা শুনান। থানায় গিয়েও অসম্মানের শিকার হই। কোথাও সুবিচার পাইনি। ৪ এপ্রিল ফেনীতে মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও অতিরিক্ত ডিসি পি কে এম এনামুল হকের অফিসে গিয়ে সব কিছু খুলে বলি। কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সহায়তা পাইনি।
তিনি ৬ এপ্রিলের ঘটনা সম্পর্কে বলেন, সকাল ১০টার কিছুক্ষণ পর ছেলে নোমান মোবাইল টেলিফোনে আমাকে ঘটনা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে ফেনী সদর হাসপাতালে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরা ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) নেয়ার পরামর্শ দেন।
নুসারাতে মা আরো বলেন, অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকায় উদ্দেশে রওনা দেই। পথে নুসরাত কিছু কথা বলেছিল, যা মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়েছে। কারা কিভাবে তাকে ডেকে নিয়ে আগুন দিয়েছে তার বক্তব্যেরও একাধিক ভিডিও রয়েছে।
তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে নুসরাত বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে বলেন—আমাকে ছাদে ডেকে নেয়ার পর সেখানে যারা ছিল তাদের মধ্যে আমি একজনকে চিনতে পেরেছি। সে হলো হুজুরের (সিরাজ) জেঠাশের মেয়ে তুহিন (উম্মে সুলতানা পপি)। তাকে আটক করা হলে কারা কারা জড়িত ছিল, সব প্রকাশ হবে। ওই ভিডিওটি সংরক্ষিত আছে।
পরে জবানবন্দিতে জানা যায়, নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে থাকা অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন সে সময়ের অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা। দুই অনুগত ছাত্র নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম জেলখানায় সিরাজের সঙ্গে দেখা করতে গেলে নুসরাতকে চাপ দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করাতে বলেন। এতে কাজ না হলে তাকে পুড়িয়ে হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যার নামে চালানোর তিনি নির্দেশনাও দেন।
আদালতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিরিনা বলেন, ‘১২ আসামির ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা জেনেছি, সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান জোবায়ের, জাবেদ হোসেন, উম্মে সুলতানা পপি ও কামরুন নাহার মনি আমার মেয়েকে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। এরা যেভাবে আমার মেয়েকে আগুনে পুড়িয়েছে, আমিও যদি এদের সেভাবে পারতাম তবে শান্তি পেতাম।’
এ মামলায় গত ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ২৭ জুন থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। মামলার ৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জন সাক্ষ্য দেন। বাকি চারজনের মধ্যে একজন বিদেশে থাকায় এবং তিনজনের সাক্ষ্য অন্য সাক্ষীদের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাওয়ায় তাদের সাক্ষ্যগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।
গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে মামলা করলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেফতার করা হয়।
পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসাকেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে নুসরাতকে মাদরাসার প্রশাসনিক ভবন কাম সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন দিয়ে দুর্বৃত্তরা আগুন ধরিয়ে দেয়।