ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

হাজারো বছরের দাওয়াই বাবলার কষ, দাম শুনলে চমকে উঠবেন!

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:৩৩, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
হাজারো বছরের দাওয়াই বাবলার কষ, দাম শুনলে চমকে উঠবেন!
ছবি: বাবলার কষের ব্যবহার মিশরে হাজার হাজার বছর আগে

গাছের গুণের শেষ নেই। জ্বালানি থেকে ওষুধ তৈরি কিংবা ঘরের কাঠামো তৈরি সবকিছুতেই গাছের ব্যবহার। দেশিয় গাছের মধ্যে বাবলা গাছ বেশ পরিচিত। এই গাছ আমাদের দেশে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় বেশি। তবে মিশরীয়রা এর কষ ব্যবহার করতেন রান্নায়। তাদের জনপ্রিয় অনেক খাবার রান্নায় ব্যবহার করা হত বাবলার কষ। 

বাবলা গাছের রয়েছে ভেষজ গুণ অনেক। এর ফুল মিষ্টি গন্ধের, গোলাকার, রঙ উজ্জ্বল হলুদ। তবে ফলগুলো চ্যাপ্টা হয়ে থাকে। ফলের রঙ সাদা। এই গাছটির শিকড় ব্যতীত সব অংশই ঔষুধের কাজে লাগে। লিভারের বিভিন্ন রোগ এবং হজমের সমস্যায় বাবলা ভীষণ উপকারী। বাবলার পাতার রস শিশুদের পেটের বিভিন্ন অসুখে ঘরোয়া ঔষুধ হিসেবে দারুণ কাজ করে।

কাঠের চেয়ে কষের মূল্য বেশি এই গাছেরবাবলা পাতার রস আমাদের রক্ত পরিষ্কার রাখে। আর এতেই আমাদের ত্বক অনেক ভালো থাকে এবং অকালে ত্বক বুড়িয়ে যায় না। তারপরও এই গাছের এখন তেমন একটা দেখাই মেলে না। রোপণ তো দূরে থাক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এই মূল্যবান গাছ। তবে এখানেই শেষ নয়। বাবলা গাছের কদর বেশি এর কষের জন্যই।

আরো পড়ুন: সাধারণ নারী থেকে যেভাবে বিপ্লবী হয়ে ওঠেন ‘গান্ধীবুড়ি’  

আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে মিশরীয়রা বাবলা গাছের কষ ব্যবহার করত। নানা ধরনের খাবার তৈরির উপকরণ হিসেবেই তারা এটি ব্যবহার করত। খাবারের স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই সময় থেকেই রং ও ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহার হতো গাম অ্যারাবিক নামে পরিচিত এই কষ। গেল শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও সারাহা মরুভূমি এলাকায় গাম অ্যারাবিকের ছিল রমরমা বাণিজ্য।

ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে বাবলার কষ বেচেই তবে বর্তমানে জলবায়ুর পরিবর্তন, জ্বালানি হিসেবে বাবলা গাছের অতিমাত্রার ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে সহস্রাব্দ-প্রাচীন সেই বাণিজ্যের পসার। মিশর, সুদান, মালি, কেনিয়াসহ অনেক দেশে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিযোগ্য পণ্যটির উৎপাদন নেমে আসে মাত্র পাঁচ থেকে ১০ শতাংশে। 

আফ্রিকার দেশ মালিতে ১৯৬০ সালের দিকেও ১০ হাজার টনের বেশি অপরিশোধিত গাম অ্যারাবিক উৎপাদিত হতো। বর্তমান বাজার দরে তার দাম ছিল অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন কারণে এই কষের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে দেশটিতে। ১৯৯২ সালে দেশটি মাত্র ৩২ টন অপরিশোধিত গাম অ্যারাবিক রপ্তানি করে।  

এরপর থেকে অবস্থা আরো ভয়াবহ হতে শুরু করে সেখানে। ২০০১  থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশটিতে বনভূমির পরিমাণ কমে ১০ লাখ একরের বেশি। যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল বাবলা গাছ। ওই সময়টাতে কেনিয়া, সুদানেও কমে এই কষের উৎপাদন। 

বাবলার বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাকাশিয়া নাইলোটিকা। ইংরেজিতে শুধু অ্যাকাশিয়া নামেই পরিচিত। আফ্রিকার আদি নিবাসী এই উদ্ভিদ এখন এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়ও পাওয়া যায়। তবে সাহারা অঞ্চলের উদ্ভিদে যে কষ পাওয়া যার তার গুণগত মান পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক এগিয়ে। ফলে তার দামও বেশি। মালি, সুদান বা কেনিয়া থেকে আমদানি করা গাম অ্যারাবিক বাংলাদেশেও প্রতি কেজি ১০ হাজার টাকা বেশি দরে বিক্রি হয়।

এর পাতা, ফুল, ফল, বাকল কিছুই ফেলনা নয়তবে আশার কথা, চলতি শতকে এসে বিশ্বজুড়ে গাম অ্যারাবিকের চাহিদা শুরু হয়েছে নতুন করে। বিশ্বের নানা অঞ্চলে খাবারের স্বাদ বাড়ানো থেকে শুরু করে রং ও ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে কদর বাড়ছে মরুভূমির এই উদ্ভিদের কষের। যার কারণে সাহারা অঞ্চলজুড়ে ফের বাড়তে শুরু করেছে বাবলা গাছের সংখ্যা, বাড়ছে এর আঠা বা কষের বাণিজ্যও।

আরো পড়ুন: ত্বক নয় মার্বেলের মূর্তির উপর উল্কি এঁকেই বিখ্যাত তিনি 

মালিতে সরকারি উদ্যোগে গত দুই বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে নতুন করে বাবলা গাছ রোপণ করা হয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগেও লাখ লাখ নতুন বাবলা গাছ লাগিয়েছেন দেশটির বিভিন্ন এলাকার উদ্যোক্তারা। কেনিয়ায় কয়েক হাজার মানুষ বাবলা কষ উৎপানে নিজেদের নিয়োজিত করে আয় করছেন লাখ লাখ টাকা। গেল কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে সুদানের গাম অ্যারাবিকের চাহিদায় নতুন মাত্রা পাওয়ায় সেখানেও নতুন করে বাবলা গাছ বাড়ানোর শতাধিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এই কাজে দরিদ্র্য দেশগুলোর নারীদের কর্মসংস্থান হয়েছে  বিবিসির এক অনুসন্ধানে উঠে আসে বাবলার কষ বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা। সিসিকো নামে কেনিয়ার এক কষ সংগ্রহকারী বলেন, জ্বালানি হিসেবে তারা বড় একটি বাবলা গাছ মাত্র ১৫০ টাকায় বিক্রি করেন। অথচ একটি গাছের কষ থেকে প্রতি বছর এর চাইতে কয়েক গুণ বেশি টাকার কষ সংগ্রহ করা যায়। আর সেটা চলে কয়েক দশক ধরে। তাই তারা এখন বাবলা গাছ কেটে বিক্রি করার চাইতে এর আঠা সংগ্রহের ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন।  

সিসিকো আরো জানান, ২০১৯ সালে তিনি বাবলা কষ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহের বাইরেই প্রায় দুই লাখ টাকা জমাতে পেরেছেন। এর আগে কখনো তিনি এত টাকা জমানোর কথা চিন্তা করেননি। শুধু সিসিকো নয়,সাহারা মরু এলাকায় তার মতো হাজার হাজার মানুষের স্বচ্ছলতা আসছে এই বাবলার কষে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেএসকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!