ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

বিশ্বসেরা বাঙালি জাদুকর, যার ইশারায় কঙ্কাল বদলে যেত নারীদেহে

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪:৪৫, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
বিশ্বসেরা বাঙালি জাদুকর, যার ইশারায় কঙ্কাল বদলে যেত নারীদেহে
ছবি: জাদু দেখাচ্ছেন জাদুকর

শিরোনাম পড়ে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন এক জাদুকরের কথা বলছি। ম্যাজিক শো দেখতে পছন্দ করেন না এখন কাউকে খুঁজে পাওয়া কষ্টই বটে। অনেকে তো আছেন নিজে নিজে একবার দুইবার চেষ্টাও করেছেন জাদু দেখানোর। তবে এটা কিন্তু তেমন সহজ কাজ নয়। এর জন্য চর্চার পাশাপাশি দরকার সাধনাও।    

বিশ্ব বিখ্যাত জাদুকরদের তালিকায় বাংলার সন্তান রয়েছেন কয়েকজন। এরমধ্যে পিসি সরকারের কথা তো জানেন। গণপতি চক্রবর্তীর কথা জানেন কি? তিনি ছিলেন পিসি সরকার সিনিয়রের গুরু। চোখের পলকে কঙ্কাল বদলে দিতে পারতেন নারীদেহে। আবার তার জনপ্রিয় এক খেলা ছিল জাদু গাছ। জাদু দিয়ে টাকাও বানাতে পারতেন নাকি তিনি। এই জাদুকরকে নিয়েই থাকছে আজকের লেখা। জাদু দিয়ে অন্যের মনোরঞ্জন করতে পারলেও নিজের ভাগ্য বদলাতে পারেন নি তিনি।  

বিখ্যাত বাঙালি জাদুকর গণপতি চক্রবর্তী১৮৫৮ সালের নভেম্বর মাসে শালকিয়াতে জন্ম এই জাদুকরের। বাবার নাম মহেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের কাছে ছাতরা গ্রামে একটি জমিদারের পুত্র মহেন্দ্রনাথ। জ্ঞাতিবিরোধে সম্পত্তিচ্যুত হয়ে বাড়ি করেন হাওড়ার শালকিয়াতে। তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। পূজা আর্চনা করেই দিন কাটাতেন তিনি। তার ইচ্ছে ছিল বালক গণপতি চক্রবর্তীও পূজা-অর্চনা, দেবভক্তি নিয়েই থাকবেন। গণপতির লেখাপড়ায় মন নেই একেবারেই। বাড়িতে তিরস্কার, উপদেশ, বকুনি লেগেই থাকত অধ্যায়নে মনোযোগ দেয়ার জন্য। অথচ তার কিশোর বয়স থেকেই জাদুবিদ্যা শেখার ঝোঁক। পথে-ঘাটে যেখানেই মাদারিদের খেলা দেখতে পেতেন, সেখানেই অপলক একমনে দাঁড়িয়ে পড়তেন তিনি। তার বাবা তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ভয়ও দেখাতেন। তাতেও কাজ হয়নি কোনো, মন গলেনি তার।     

তবে সঙ্গীতচর্চায় ছিল আগে থেকেই ভালোবাসা। তবলায় ছিল চমৎকার হাত। বাবা মহেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী খুব ভালো পাখোয়াজ বাজাতেন। সেখান থেকেই সঙ্গীতচর্চার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল বালক গণপতির। ছোট থেকেই তবলায় নানান বোল ফোটাতে পারতেন তিনি। আরেকটু বড় হতেই তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জাদুচর্চা। সেসময় কলকাতার দর্জিপাড়ায় ছিল রামানন্দ পাল মহাশয়ের নাট্যচর্চার দল নাট্য সমাজ। সেখানেই গণপতি খুঁজে পেলেন তার জাদুশিক্ষার প্রথম গুরু ক্ষেত্রপাল বসাককে। পরবর্তীকালে জওহরলাল ধরের কাছেও শিক্ষাগ্রহণ করেন তিনি।

আরো পড়ুন: কথা বলে উঠল ৩০০০ বছরের পুরনো মমি!

সেসময় তার একমাত্র দর্শক ছিল মণীন্দ্রনাথ লাহা। গণপতির বাল্যকালের বন্ধু তিনি। টুকটাক ছোটখাটো খেলা বানিয়ে এই বন্ধুকেই দেখাতেন গণপতি। বয়স তখন তাদের সতেরো-আঠারোর কোঠায়। দুই বন্ধুতে পালিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। স্বপ্ন ছিল জাদুকর হওয়ার। তবে তার বদলে গিয়ে পড়লেন সাধু-সন্ন্যাসীদের পাল্লায়। মণীন্দ্রনাথ বেশ ভালোই ছিলেন পড়াশোনায়। বেশিদিন সেখানে থাকা হল না তার। ফিরে এলেন বাড়িতে। তবে কিশোর গণপতি রয়ে গেলেন সাধুদের সঙ্গেই। সেখানে কখনো চুরুট সাজিয়ে দেয়া আবার কখনো সাধুদের ভেলকবাজির সহকারী। এভাবেই দিন কাতছে তার। তবে বেশ কিছু জাদুবিদ্যা, তন্ত্র-মন্ত্রের সাধনা, ভবিষ্যৎ ও অদৃষ্ট গণনা, ভেলকিবাজি, ঝাড়ফুঁক এবং নানা রোগের অলৌকিক চিকিৎসাবিদ্যা শিখে গেলেন তিনি।

জাদুর গাছ খেলা দেখাচ্ছেন গণপতি চক্রবর্তী      

কালচক্রের পরিবর্তনে সেই কিশোরই যুবক হয়ে উঠল। দীর্ঘ মেদহীন চেহারা, ছুঁচালো গোঁফ। সামান্য ট্যারা চোখের দৃষ্টি সুতীক্ষ্ণ। চোখে-মুখে প্রচ্ছন্ন আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ। নিজেকে একজন পূর্ণ জাদুকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেলেন। একসময় তার জাদুর খ্যাতি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। তার সম্পর্কে গুজব কিংবা গল্পকথাও বাদ ছিল না। তবে যাকে নিয়ে এত আলোচনা সমালচনা সেই গণপতি নির্বিকার। দেখতে শান্ত, চুপচাপ একজন মানুষ। সাদাসিধে বেশভূষা, হাঁটুর ওপর কাপড়, পায়ে চটি জুতা, গায়ে তিনপোয়া হাতাওয়ালা খাটো পাঞ্জাবী, মাথায় সরু টিকি। তাকে দেখে বিশ্বাস করার জো নেই যে, তিনি এতো গুজবের আধিকারী। সাত্ত্বিকভাবাপন্ন গৌরকান্তি ব্রাহ্মণ। আড্ডা দিতেন চিৎপুর রোড আর বিডন স্ট্রিটের মোড়ে শ্রীকৃষ্ণ লাইব্রেরিতে।   

সেসময় গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের মালিক ছিলেন প্রিয়নাথ বসু। গণপতি এই সার্কাসে যোগদান করেন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে। তবে শর্ত ছিল তিনি ফাউ হিসেবেই কাজ করবেন। লোককে হাসাবেন, টুক-টাক ম্যাজিক দেখাবেন। কিন্তু কোনো পয়সা পাবেন না। দুইজন শিল্পীর খেলা দেখানোর মাঝে যে ফাঁক পাওয়া যায়, সেই সময়টুকুই মঞ্চ পাবেন তিনি। কিন্তু কোনো শিল্পীর মর্যাদা পাওয়া যাবে না। তবে দক্ষ গণপতি বেশ ভালোই খেলা দেখাতেন। কৌতুক সৃষ্টি করায় তার সহজ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। মানুষকে হাসাতেও দক্ষ ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। দীর্ঘ ২০ বছর তিনি যুক্ত ছিলেন এই সার্কাসের সঙ্গে। ৫৫ বছর বয়সে তিনি এই সার্কাসের কাজ ছেড়ে দেন। তিনি পরে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের কয়েকজন শিল্পীকে নিয়ে আলাদা দল গড়ে তোলেন।

উনবিংশ শতাব্দীর ভারত রত্নপ্রসবা বলে খ্যাত। সেই রত্নরাজির মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী অন্যতম। তার খেলায় ছিল প্রচুর হাস্যরস, ছিল টেম্পো, ছিল বাক-চাতুর্য। বিদেশি খেলাকে এদেশের দর্শকদের উপযোগী চিত্রবিভ্রমকারী, বিস্ময়কর কার্যকারিতা রূপে উপস্থাপন করতেন তিনি। যা একাধারে অবিশ্বাস্য এবং ক্ষিপ্ততায় সমুজ্জ্বল। তিরিশ-চল্লিশ বছরেরও বেশি এইসব খেলা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় দেখিয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে সেই সময় ভারতে অন্য কোনো জাদুকর না থাকায়, প্রচুর সুনাম অর্জন করতে পেরেছিলেন তিনি।

গণপতি চক্রবর্তীর বিখ্যাত খেলাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ভৌতিক বাক্স (ইল্যিউশন বক্স), জাদুর গাছ (ইল্যিউশন ট্রি) এবং কংসের কারাগার। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তাকে বাক্সের মধ্যে তালা বন্ধ করা রাখা হত। পরীক্ষাও করতেন দর্শকরা। তারপর সেই অবস্থা থেকেই বেরিয়ে আসতেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যেই আবার ঢুকেও যেতেন সেই বাক্সের মধ্যে। এই খেলাটি এতটাই ক্ষিপ্রতা এবং তৎপরতার সঙ্গে দেখাতেন, মানুষ তাকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলেই ভাবত। তিনি ভেন্ট্রিলোক্যুইজমে দক্ষ এবং পারদর্শী ছিলেন।

তার আরেকটি খেলা ছিল ব্ল্যাক আর্ট। একটা উজ্জ্বল আলো থাকত। তারপর ধীরে ধীরে ঘন অন্ধকার হয়ে আসত। তারপর রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হত নরকঙ্কাল। রঙ্গমঞ্চজুড়ে হাহা-হিহি অট্টহাসি আলোড়িত হত। তারপর সেই কঙ্কালগুলো আবির্ভূত হত নারীদেহে। শূন্যে উড়ে আসত চেয়ার, টেবিল, চায়ের কাপ। তার সঙ্গে ভয়ঙ্কর মড়ার খুলি উড়ে এসে গণপতির মুখ থেকে সিগারেট নিয়ে খেত। মুঠো মুঠো ধুলো নিক্ষেপ করার পর সেখান থেকেই আবির্ভূত হত সুন্দর নারীমূর্তি। পাশাপাশি হাঁসের ডিম থেকে পায়রার জন্ম দিতেন তিনি। সেই পায়রা জন্মেই উড়ে যেত শূন্যে। এই ভয়াবহ, রোমাঞ্চকর, অদ্ভুতকর্মা ঐন্দ্রজালকে পেয়ে বাংলা কার্যতই গর্ব অনুভব করত। কারণ জাদুবিদ্যা ভারতের নিজস্ব কলা। প্রাচীনকাল থেকেই এটি প্রচলিত।

খেলা দেখাচ্ছেন জাদুকর
বিভিন্ন খেলা এবং অভিজ্ঞতার দরুন ভারতীয় জাদুকরগণ তাকে গুরুর ন্যায় শ্রদ্ধা করতেন। তার জাদুপ্রদর্শনী দেখার জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও  উদগ্রীব থাকতেন।  সেই আকর্ষণের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। এই প্রসঙ্গে রস-সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামীর ‘স্মৃতিচিন্ত্রন’ গ্রন্থ থেকে এই উদ্ধৃতিটি উল্লেখযোগ্য। “শান্তিনিকেতনে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই দেখলাম গণপতি চক্রবর্তীর ম্যাজিক। দেখলাম তার সেই বিখ্যাত, প্রসিদ্ধ ভৌতিক বাক্স’র খেলা। এই আসরে রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন। খেলা শুরু হওয়ার আগে সন্তোষ মজুমদার, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আরও অনেকে বেশ ভালভাবেই বাক্সটি পরীক্ষা করেছিলেন।”

আরো পড়ুন: নাৎসিদের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্ট’ থেকে যেভাবে প্রাণে বাঁচেন তিনি  

তার সঙ্গে বিভিন্ন সময় মজার মজার ঘটনা ঘটেছে। এক দর্শক তার খেলা দেখতে আসতেন প্রায় তিন দিন-চার দিন পর পর। একদিন তিনি সুযোগ পেয়ে উপস্থিত হলেন গ্রিনরুমের পাশে। স্টাফদের বললেন, জাদুকরকে একটু ডেকে দেবেন? রাজি হলেন না তারা। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন সেই ভদ্রলোক। শেষমেশ স্টাফরা খবর দিলেন গণপতিকে। তিনি ডেকে পাঠালেন সেই ভদ্রলোককে। ভদ্রলোক গণপতির পায়ে পড়ে বললেন হাওয়া থাকে টাকা ধরার মন্ত্র শিখিয়ে দিতে। কারণ তার মেয়ের বিয়ে আসন্ন। তবে ঘরে চরম অর্থাভাব। গণপতির উদারতার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল সেদিন। বলেছিলেন, মেয়ের বিয়ের জন্য তোমাকে মন্ত্র শিখতে হবে না। আমিই দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেব তোমার মেয়ের। বিয়ের সমস্ত বন্দোবস্তই করে দিয়েছিলেন জাদুকর গণপতি।

তার নিজের লেখা বই যাদুবিদ্যা তাকে আধুনিক জাদু-জগতের পথিকৃৎ বলাও চলে। কারণ তার হাত ধরেই উঠে এসেছেন বাংলার বিখ্যাত জাদুকরেরা। গণপতি চক্রবর্তীর শিষ্য ছিলেন তিনজন। প্রথম জন প্রতুল চন্দ্র সরকার অর্থাৎ পিসি সরকার সিনিয়র, দ্বিতীয়জন জাদুকর দুলাল চন্দ্র দত্ত বা ডিসি দত্ত, আর তৃতীয়জন দেবকুমার ঘোষাল বা জাদুসূর্য দেবকুমার। আরো অনেকে ছিলেন তার শিষ্য। তবে গণপতি চক্রবর্তী জাদুসম্রাট পিসি সরকারের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। গর্ববোধ করতেন তার জাদু প্রতিভার। এমনকি ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের কৃতিত্ব দিয়ে পিসি সরকারকে চিঠিও লিখেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। এছাড়াও নিজেই জাদুবিদ্যার বিষয়ে একটি বই-ও লিখেছিলেন গণপতি। সে বইয়ের নাম ছিল যাদুবিদ্যা। যা ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। 

শেষ জীবন গণপতি সাধন-ভজনেই অতিবাহিত করেছেন। তারই প্রতিষ্ঠিত রাধা-গোবিন্দের মন্দিরে সেদিন চলছে অন্নকূটের উৎসব। দিনটা ছিল ২০ নভেম্বর ১৯৩৯ সাল। বাতাসে ভেসে আসছে ধূপ-ধুনো-ফুলের পবিত্র সৌরভ। গণপতি রাধা-গোবিন্দের মূর্তিকে জড়িয়ে ধরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। জীবনের মতো মৃত্যুও তার এমনই অবিশ্বাস্য ছিল। অনেকে তো এই মৃত্যুকেও অলৌকিক বলে থাকেন। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেএসকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!