ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

নাৎসিদের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্ট’ থেকে যেভাবে প্রাণে বাঁচেন তিনি

২য় পর্ব
সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:৩৬, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
নাৎসিদের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্ট’ থেকে যেভাবে প্রাণে বাঁচেন তিনি
ক্রিস্টিনা স্কারবেক

নারীদের সাফল্য নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। রিকশা চালানো থেকে উড়োজাহাজ কিংবা বন থেকে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে গেছে নারীরা। বর্তমান বিশ্বে পুরুষের পাশাপাশি সমান তালে সবক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে নারীরা। তবে এটা শুধু এখনই না অনেক আগে থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আজ থেকে শত বছর আগেও নারীরা নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ গুলো করেছে, তার মধ্যে একটি হলো গুপ্তচরবৃত্তি। গোপন তথ্য হতিয়ে নিতে তারা ব্যবহার করতেন নানা ধরণের কৌশল। হোক তা প্রেমের ফাঁদ। আবার প্রয়োজনের খাতিরে হয়ে ওঠেন ভয়ংকর ও দুর্ধর্ষ।

ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা টেলিগ্রাফ তুলে ধরেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করেছেন এমন ৫ জন দুর্ধর্ষ নারীর গল্প। দুঃসাহসিক এই নারীদের কর্মকাণ্ড আপনাকে বিস্মিত করবে। রীতিমতো আপনার গায়ে কাঁটা দেবে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা। শত বছর আগে বিশ্বযুদ্ধের অংশ হয়েছিলেন তারা। গুপ্তচরবৃত্তি থেকে শত্রু হত্যা সবই করেছেন। সেই নারীদের নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের বিশেষ আয়োজনে থাকছে আজ ২য় পর্ব। এর আগের পর্বে আমরা জেনেছিলাম দুঃসাহসিক এক নারী ভার্জিনিয়া হলের কথা। ২৭ বছর বয়সে এক পা হারিয়ে দমে যান নি তিনি। হয়ে উঠেছিলেন গুপ্তচর।

ক্রিস্টিনা স্কারবেকআজকের সেই নারী ক্রিস্টিনা স্কারবেক। ব্রিটিশ স্পেশাল অপারেশনের হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেশ কিছু সাহসী অভিযান পরিচালনা করেন ক্রিস্টিনা স্কারবেক। দুর্দান্ত মেধাবী এই গুপ্তচরকে বিশ্বযুদ্ধের পর হত্যা করা হয়। আবার এমনও বলা হয় তিনি নিজেই আত্মহত্যা করেছেন। 
তার আসল নাম ক্রিস্টিনা গ্রানভিলে। ১৯০৮ সালে পোল্যান্ডের এক সচ্ছল পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ একজন ব্যাংকার। মাত্র ২০ বছর বয়সে ক্রিস্টিনা বিয়ে করেন। তবে তার সেই বিয়ে সুখের হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ডে আক্রমণ হওয়ার পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগে ঢুকে পড়েন তিনি । তখনও এসওই আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়নি।

আরো পড়ুন: পা ছাড়াই বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রতিপক্ষকে কাবু করেন তিনি   

বিলাসব্যসনে অভ্যস্ত ক্রিস্টিনা দায়িত্ব পেয়ে আর দেরি করেননি। হাঙ্গেরি থেকে চোরাইপথে পোল্যান্ডে ঢুকে পড়েন। তবে কাজটি কিন্তু এতটা সহজ ছিল না। এরমধ্যে সবচেয়ে কষ্টের ছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তাত্রা পর্বতমালা অতিক্রম করা। তবে সব বাঁধা অতিক্রম করে ক্রিস্টিনা পা রাখেন পোল্যান্ডে। যোগাযোগ করতে থাকেন অন্যান্য এজেন্ট ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে। এরপর শুরু করেন পোলিশ বিমানসেনাদেরকে নিরপেক্ষ যুগোস্লাভিয়ায় পাচারের কাজ। যাতে তারা মিত্রশক্তির বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে পারে।

একদিকে ছিলেন ধনী পরিবারের মেয়ে অন্যদিকে সুন্দরী ক্রিস্টিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ কিছু সাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সে জন্য তিনি ছিলেন নাৎসিদের মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে। তার সবচেয়ে সাহসী অভিযান ছিল এক উদ্ধার অভিযান। ঘটনাটি ফ্রান্সের। ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাস, ক্রিস্টিনা ফ্রান্সের এক গেস্টাপো নিয়ন্ত্রিত জেলখানায় ঢুকে পড়েন। সেই জেলে বন্দি থাকা ৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্পাইকে মুক্ত করে আনেন তিনি।  
তার গুপ্তচরবৃত্তির বিশেষত্ব ছিল সেনা সদস্যরা কখন কোন পথ পাড় হবে সে সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য জোগাড় করা। তার দেয়া তথ্য ধরেই হামলা পরিচালনা করা হতো। একবার তথ্য নিয়ে পালানোর সময় নাৎসিদের হাতে গ্রেফতার হন। তবে তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।

১৯৪১ সালে একবার শত্রুর হাতে ধরা পড়েন ক্রিস্টিনা। সে সময় আটককারীকে জানান তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত। তিনি নিজের জিহ্বা কামড়ে রক্ত বের করে দেখান তাদের। বোঝান যে, কাশির সঙ্গে রক্ত বের হয়েছে।  নানা সময় নানাভাবে বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করে গেছেন ক্রিস্টিনা। যুদ্ধের আগে একটি গাড়ির কারখানায় কাজ করার সময় তার ফুসফুসে কিছু কাটা দাগ পড়ে। তার এক্স-রে রিপোর্টও দেখান তিনি।

আরো পড়ুন: ছবি তুলতে গিয়ে কেউবা কাটা পড়ল ট্রেনে কেউবা হাতির পদতলে

এই কৌশল ভালো কাজ দেয়। ছাড়া পেয়ে যান ক্রিস্টিনা। ছাড়া পেয়েই সোজা ইংল্যান্ড চলে যান। নিজের নাম বদলে ক্রিস্টিনা গ্র্যানভিল করে নেন। ১৯৪৪ সালে তাকে পাঠানো হয় ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। দায়িত্ব পড়ে ফরাসি ও ইতালীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মধ্যে লিয়াজোঁ করার। এখানে তিনি অনেক কৃতিত্ব দেখান। এরমধ্যে একটি হচ্ছে ৬০০ মিটার উঁচু পথ পাড়ি দিয়ে একটি দুর্গে পৌঁছা এবং সেখানকার ২০০ সেনাকে আত্মসমর্পণে রাজি করানো। আরেকবার তিনি ফিল্ড মার্শাল মন্টোগোমারির ভাতিজি সেজে এক জার্মান গেস্টাপো অফিসারকে রাজি করিয়ে তিন সহকর্মীকে মুক্ত করে আনেন। ঠিক সময়ে কাজটি না করতে পারলে ফাঁসি হয়ে যেত তাদের।

জেমস বন্ড ক্রিস্টিনা স্কারবেকের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করেন ভেসপার লিন্ড একসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। যুদ্ধের পর তার সাহসিকতার জন্য জর্জ মেডেল ও ওবিই দেয়া হয় তাকে। কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেতে দেরি হওয়ায় তিনি হয়ে পড়েন দেশহীন। তার হাতে তখন অর্থও তেমন ছিল না। নানান কারণে তিনি বেশ এলোমেলো জীবনযাপন করছিলেন। একপর্যায়ে একটি সমুদ্রগামী জাহাজে স্টুয়ার্ডসের চাকরি পান। চাকরিতে প্রবেশের আগের রাতে তিনি ছিলেন লন্ডনের একটি হোটেলের কক্ষে। সকালে হোটেল কক্ষ থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। কেউ বলেন, তিনি নিজে আত্মহত্যা করেছিলেন। কেউ বলে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে।    
 
আপনাদের বিখ্যাত জেমস বন্ড সিরিজের কথা মনে আছে? বলা হয় সিরিজের স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং নাকি তার প্রথম বইয়ের একটি চরিত্র ক্রিস্টিনার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে করেছিলেন। বিখ্যাত সেই চরিত্র হচ্ছে ভেসপার লিন্ড। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেএসকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!