ছবি তুলতে গিয়ে কেউবা কাটা পড়ল ট্রেনে কেউবা হাতির পদতলে
একটি ছবি হলো হাজারটি শব্দের প্রতিরূপ। কোনো কিছু বলে বা লিখে যত সহজে বোঝানো যায়, ছবির মাধ্যমে তা আরো সহজে ফুটিয়ে তোলা যায়। মানুষের মনে কথার থেকে ছবি অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। আজ বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস। ছবি তোলা কারো কাছে নেশা আর কারো বা পেশা। ছবি তোলার নেশায় শহর থেকে শহরতলি সর্বত্রই ক্যামেরা হাতে ছুটে বেড়ান তারা। ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে অনেক না বলা গল্পকে।
একেকটি ছবি তুলতে ফটোগ্রাফারকে জীবনের ঝুঁকিও নিতে হয়। ছবির আড়ালে থাকে একেকজন ফটোগ্রাফারের নিরলস অনুসন্ধানী মন। কিছু ছবি জীবন পর্যন্ত কেড়ে নেয়। তাদের বেশিরভাগের কথাই অবশ্য শেষ পর্যন্ত জানা যায় না। তবে অনেকে আবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার গল্পও শুনিয়েছেন। আবার অনেকের মৃত্যুর কথা জানা যায় পারিপার্শিক প্রমাণ থেকে। তাদের এই ত্যাগকে সম্মান দিতে প্রতিবছরই ১৯ আগস্ট পালন করা হয় বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস। সারা পৃথিবীতে সবাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করে এই দিনটি।
১৮৩৯ সাল থেকে আগস্ট মাসের ১৯ তারিখকে আলোকচিত্রের দিন হিসেবে উদযাপন করে আসছে পুরো পৃথিবী। আজ তেমনই কিছু বিখ্যাত ফটোগ্রাফারের কথা জানবো। যারা ছবি তুলতে গিয়ে নিজের প্রাণটা হারিয়েছেন। চলুন জেনে নেয়া যাক তাদের কথা-
আশিষ শিট
এটি বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস। করোনা ভাইরাস তখনো সারা পৃথিবীতে রাজত্ব শুরু করেনি। বনে-জঙ্গলে বন্য প্রাণীর খোঁজে ঘুরে বেড়াতেন অনেক ওয়াইল্ড-লাইফ ফটোগ্রাফার। বাংলার আশিষ শিট ছিলেন তেমনই একজন। এক হাতির সন্ধানে ভারতের ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে পৌঁছে গেলেন তিনি। দেখাও পেলেন। দূর থেকে কিছু ছবি তুললেন হাতির দলের। কিন্তু সেসব ছবি পুরোপুরি পছন্দ হয়নি। তিনি চাইলেন খুব কাছ থেকে হাতির দলের ছবি তুলতে। তবে ৩৫ বছরের এই যুবকটির এমন দুঃসাহস পছন্দ হয়নি হাতির দলের। তাদের আক্রমণে পদপৃষ্ঠ হয়ে আহত হলেন আশিষ শিট। এরপর হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। সেই একটি মনের মতো ছবি তোলার পরিতৃপ্তি নিয়েই শেষ হল তার জীবন।
আরো পড়ুন: বিশ্বের প্রথম সেলফি তোলা হয় ১৭৬ বছর আগে
ভিক্টোরিয়া স্ক্যাফার
এই ফটোগ্রাফার অবশ্য ওয়াইল্ড-লাইফ ফটোগ্রাফার নন। তিনি নাগরিক জীবনের ছবি তোলেন। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার লোডি শহরের ফটোগ্রাফারের মতো দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়নি। পুলিশের ধারণা, স্ক্যাফারের মৃত্যু আসলে একটি খুন। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে আসন্ন শ্রমিক দিবস উপলক্ষে ছবি তুলছিলেন স্ক্যাফার। ওহিও শহরের ওল্ড-ম্যান্স কেভের সামনে একদল স্কুল পড়ুয়াকে নিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন স্ক্যাফার। এমন সময় তার মাথায় এসে পড়ল একটি গাছের মোটা ডাল। আর তারপরেই মারা যান তিনি। পুলিশ প্রথমে একে দুর্ঘটনা বলে মনে করলেও তদন্তে নেমে দেখা যায় সেখানে কোনো গাছ থেকে ডাল ভেঙে পড়ার কোনো সম্ভবনাই নেই। তারপর প্রায় ছয় মাস তদন্তের পর পুলিশ দুজন স্কুল পড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করে। জানা যায়, তাদের কিছু অসামাজিক কাজের ছবি তুলে ফেলেছিলেন স্ক্যাফার। আর ফটোগ্রাফারের পাশাপাশি শেফার্ড একজন সমাজকর্মী। তিনি যে এই ছবি তুলেই চুপ করে থাকবেন না, সেটাও বেশ বুঝেছিল তারা। আর তাই স্ক্যাফারকে ক্যামেরা হাতেই প্রাণ হারাতে হল।
ক্রিস্টোফার গুইন
ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেসনো শহরে ৫ বছর আগেই ঘটেছিল একটি দুর্ঘটনা। ডাউনটাউন রেললাইনের উপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন একজন ফ্যাশান ফটোগ্রাফার। তিনি ক্রিস্টোফার গুইন। তার পেছনে ছিল ট্রেনের ব্যাকগ্রাউন্ড। কিন্তু কেউই খেয়াল করেননি, পাশের লাইন দিয়ে এগিয়ে আসছে আরেকটি ট্রেন। আর ছবি তুলতে তুলতে ফটোগ্রাফার এসে পড়লেন সেই লাইনেই। সঙ্গে সঙ্গে ঘটল দুর্ঘটনা। হাসপাতাল পর্যন্ত আর নিয়ে যাওয়া যায়নি।
আরো পড়ুন: স্বামীসহ ৩০০ পুরুষকে হত্যা করেন এই নারী
কেভিন কার্টার
তবে শেষ যে আলোক-শিল্পীর কথা বলব, তিনি দুর্ঘটনায় মারা যাননি। খুনও হননি। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। নিজের তোলা ছবি দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি। চিত্রসাংবাদিক কেভিন কার্টার আবেগী হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আলোক-শিল্পের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ছবি ছিল সেটি। নিউ-ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল দ্য ভালচার অ্যান্ড দ্য লিটল গার্ল নামে। ছবিতে দেখা যায় দুর্ভিক্ষ-পীড়িত আফ্রিকান এক শিশু। পাশেই একটি শকুন তার মৃত্যুর অপেক্ষা কড়ছে। মাঠের মধ্যে বসে থাকা শিশুটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে শকুনিটি। যেন অপেক্ষায় আছে কখন শিশুটি মারা যাবে। আর এই ছবিটিই ফ্রেমবন্দি করেছিলেন কেভিন কার্টার।
মানুষের এমন দুর্দশাগ্রস্ত সময়ের ছবি তোলার জন্যই বিখ্যাত ছিলেন তিনি। তবে এই শেষ ছবির অভিঘাত সহ্য করতে পারলেন না কেভিন। আর তাই এই ছবি বিখ্যাত হওয়ার, এমনকি পুরস্কৃত হওয়ার পরেও কেভিনের মনে হতে থাকে তিনি যেন অর্থের বিনিময়ে দারিদ্র্যকে বিক্রি করছেন। আর তাই ১৯৯৪ সালের ২৭ জুলাই নাকের সামনে কার্বন-মনোক্সাইড পাইপ ধরে রেখে নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলেন বিষ। আর রেখে গেলেন তার শেষ সময়ের অনুভুতির কথা। একটি সুইসাইড নোট লিখে আত্মহুতি দেন এই চিত্রসাংবাদিক।