৯০ টনের একেকটি পাথর টেনে পিরামিড তৈরির রহস্য আজো অজানা
পিরামিডের নাম শুনলেই নিশ্চয় মনে পড়ে মমি, নীলনদ, আর বড় বড় মূর্তির কথা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা কাপড় ও মাথায় অদ্ভূত মুকুট কিংবা কাপড় পরা ব্যক্তিদেরকে। তবে সেসব কিছু ছাপিয়ে বিশ্ববাসীর সবচেয়ে আগ্রহের জায়গা মিশরের পিরামিড নিয়ে। যার রহস্য হাজারো বছর পেরিয়ে এসে আজো ধোঁয়াশা।
মিশরের রহস্যাবৃত পিরামিড প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে প্রাচীন এবং অন্যতম একটি। যেটি তার রূপ ধরে রেখেছে হাজারো বছর ধরে একইভাবে। মিশরীয়দের মধ্যে মৃত্যু নিয়ে নানা কুসংস্কার ছিল। তারা মৃত্যুর পরের জীবনকে উপভোগ করতে তৈরি করত পিরামিড। দেহ যাতে পচে না যায় এজন্য মমি করে পিরামিডে রাখা হত। সেসব তো জানা কথা সবারই।
এর আগের পর্বগুলোতে নিশ্চয় পড়েছেন প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা ও তাদের জীবন ধারণ নিয়ে। আজ মিশরের পিরামিডের অজানা সব তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে ষষ্ঠ পর্ব। মিশরের সবচেয়ে আশ্চর্য ও রহস্যময় পিরামিড তৈরির প্রচলন ও কীভাবে তৈরি হত সে সম্পর্কেই বিস্তর ধারণা থাকছে-
পিরামিড তৈরির রহস্য
কীভাবে পিরামিড তৈরি হয়েছিল, কেন তৈরি করা হয়েছিল আর কতদিন ধরেই বা তৈরি করা হয়েছিল পিরামিড? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বছরের পর বছর পার করে ফেলছেন বিজ্ঞানীরা। আজ থেকে প্রায় ৪৭০০ বছর আগে নির্মিত হলেও তা বিজ্ঞানীদের মাথা ঘোরাচ্ছে এখনো। কীভাবে মিশরীয়রা এই অদ্ভুত সুন্দর, রহস্যময় জিনিস তৈরি করল? ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন জট পাকাচ্ছে।
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অনেক কিছুই পিরামিডের মধ্যে লিখিত রয়েছে। তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, সমাজ সবকিছুই গিজার পিরামিডের দেয়ালে ছবি আকারে বা হায়রোগ্লিফিক বর্ণে লিপিবদ্ধ। এখান থেকেই অতীতের মিশর সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাচীন মিশরকে জানার জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে এর থেকে বড় উৎস আর কিছু হতে পারেনা।
তবে একটি বিষয়ে মিশরীয়রা বরাবরই চুপ থেকেছে। সেটি হলো কীভাবে পিরামিড তৈরি হলো? এ বিষয়ে কোথাও স্পষ্ট করে কোনো প্রমাণ তারা রেখে যায়নি। এটি এমন এক রহস্য যা হাজার বছর ধরে ইতিহাসবিদদের ভাবিয়েছে। অনেক বছরের বিতর্কের পর কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। তবে তা সবই প্রায় অনুমান নির্ভর।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, পিরামিড তৈরির জন্য মিশরের মরুভূমিতে পাথর কীভাবে আনা হয়েছিল? যেখানে একেকটি পাথরের ওজন প্রায় ৯০ টন। এত বিশাল পাথরগুলো কীভাবে দূর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল? গবেষকরা ধারণা করেন, হয়তো বা আদি মিশরীয়রা এগুলোকে মরুভূমির মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে আসেন। যদিও তখন কোনো চাকার মতো স্লেজজাতীয় গাড়ি সেখানে ব্যবহৃত হতো না।
গবেষকরা অনুমান করেন, হয়তো গাছের শাখা কেটে সেগুলোতে রেখে টেনে নিয়ে এসেছে। মোটামুটি ছোটো বা মাঝারি আকৃতির পাথরের ব্লকের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকম ব্যাখ্যা করা যায়। তবে বড় আকৃতির কিছু পাথরের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই অসম্ভব! তবে এই থিওরির আদৌ কোনো প্রমাণ আসলে নেই। অন্যদিকে চিত্রকর্ম থেকেও পাথর টানার কোনো হদিস মেলেনি।
এরপরের প্রশ্ন, এত ভারী পাথর নিরবচ্ছিন্নভাবে পিরামিডের উপরে তোলা হয়েছিল কীভাবে? প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদের মধ্যে যারা জন্মগ্রহণ করেন পিরামিড নির্মাণের শেষকালে তাদের ধারণা ছিল, মিশরীয়রা এক্ষেত্রে ঢালু কোনো তল ব্যবহার করত। যেটা সিঁড়ির মতো, একে বলা হতো র্যাম্প। তবে গবেষকরা দেয়ালের ভেতর বাতাসের জন্য ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা দেখে ভাবলেন, যদি র্যাম্পই ব্যবহার হবে তাহলে তা ছিল ভেতরের দিকে তাই বাহিরে সেটার অস্তিত্ব প্রমাণের মেলেনি।
পিরামিডের সংখ্যা
পিরামিড দেখলেই সবার মাথায় আসে কীভাবে জ্যামিতিক সূক্ষ্ম নির্ভুল মাপে এগুলো তৈরি করা হয়েছে? পাথরগুলোই বা কাটা হলো কীভাবে? আবার ভেতরেই বা কেন এত অভিশাপে মুড়ানো প্রতিটি ফারাও রাজার শয়নকক্ষ? প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবেন অনেক, তবে বিজ্ঞানীরাও এখনো ওসেই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারেনি। ছোট-বড় মিলিয়ে মিশরে প্রায় ৭৫টি পিরামিড রয়েছে। সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় হচ্ছে গিজা’র পিরামিড। এটি খুফু’র পিরামিড হিসেবেও পরিচিত।
খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে এই পিরামিডের সৃষ্টি বলে ধারণা করা হয়। এর উচ্চতায় প্রায় ৪৮১ ফুট এবং এটি ৭৫৫ বর্গফুট জমির উপর অবস্থিত। প্রায় ২০ বছর ধরে এক লাখ শ্রমিকের দ্বারা এটি তৈরি করা হয়। এটি তৈরি করা হয়েছিল বিশাল বিশাল পাথর খণ্ড দিয়ে। পাথর খণ্ডের ওজন ছিল প্রায় ৬০ টন, দৈর্ঘ্য ছিল ৪০ ফুটের মতো।
জানা যায়, মিশরের প্রথম পিরামিডের স্থপতি ইমোটেপ ছিলেন প্রচুর প্রতিভাসম্পন্ন। তিনি একাধারে ছিলেন স্থপতি, মহাযাজক, গণিতবিদ সেই সঙ্গে মিশরীয় চ্যান্সেলর ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকতে তার প্রতিভার তেমন সমাদর পাননি। তবে ইমোটেপের মৃত্যুর তিন হাজার বছর পর থেকে তার সুনাম ও প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
পিরামিডের উচ্চতা
পিরামিডগুলো কবে নাগাদ তৈরি হয়েছিল তার সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬০ থেকে ২৫৪০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এর কাজ সমাপ্ত হয়েছিল। মিশরের সবচেয়ে প্রাচীনতম পিরামিডের এর বয়স ৪৭০০ বছর। ফারাও রাজা জাসোর এই পিরামিডটি নির্মাণ করেন।
ধারণা করা হয়, খীষ্টপূর্ব ২৬৪৮ থেকে ২৬৬৭ সালের মধ্যেই এটি নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি, এই পিরামিডটির পুনর্নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। এটিই পৃথিবীর একমাত্র স্টেপ (ধাপ আকারের) পিরামিড। জাসোর পিরামিডটি লম্বায় ৬৩ মিটার (২০৭ ফুট)। বিশ্বের একেবারেই আদি পিরামিড এটি। প্রথম দিকে এমন উচ্চতাতেই পিরামিড নির্মিত হতে। দিনকে দিন এর উচ্চতা আরো বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় পিরামিডের খুফু’র উচ্চতা ৪৮১ ফুট ছিল। এটিই বিশ্বের দীর্ঘতম উঁচু স্থাপনা হিসেবে স্বকৃতি পায়। বর্তমানে ক্ষয় হতে হতে এখন এর উচ্চতা প্রায় ৪৫৫ ফুটে দাঁড়িয়েছে। ১৩ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই স্মৃতিস্তম্ভটি কম্পাসের পয়েন্টগুলোর সঙ্গে কাটায় কাটায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি তৈরিতে প্রায় দুই দশমিক তিন মিলিয়ন পাথর লেগেছিল বলে ধারণা গবেষকদের। যার একেকটি গড়ে এক টন বা তারও বেশি ওজনের।
সেসময় হাজারো দক্ষ ও বেতনভুক্ত শ্রমিকদের দিয়ে এটি তৈরি করানো হয়। ধারণা করা হয়, খুফু’র পিরামিড প্রকল্পটি শেষ হতে প্রায় দুই দশক লেগেছিল। খুফু’র পিরামিড ছাড়াও সেখানে ফেরাউনের জন্য আরো দুটি বড় পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল। একটি তার ছেলে খুফুরের জন্য। যার উচ্চতা ৪৭১ ফুট। যিনি খ্রিস্টপূর্ব ২৫৮৯ থেকে ২৫৬৬ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এই পিরামিডটিকে প্রাচীন বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি ধরা হয়।
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস মনে করেন, এিই পিরামিডটি এক লাখ শ্রমিক ২০ বছর ধরে তৈরি করেছিলেন। খুফুরের পিরামিডের সামনেই রয়েছে বিখ্যাত গ্রেট স্ফিংস মূর্তি। যেটি অর্ধেক মানুষ আর বাকিটা সিংহের আকৃতির। এটি ২৪১ ফুট দীর্ঘ এবং প্রায় ৬৬ ফুট উচ্চতার। অন্যটি খুফুর পুত্র মেনকাউরের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। যেটির উচ্চতা ২১৮ ফুট। মেনকাউর খ্রিস্টপূর্ব ২৫৫৮ থেকে ২৫৩২ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
যুগে যুগে তিনটি পিরামিড থেকেই সম্ভবত ডাকাতরা এর বাইরের সাদা চুনাপাথরগুলো চুরি করেছে। তৃতীয় ও চতুর্থ রাজবংশের সময় মিশর শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ কাটিয়েছে। ফেরাউন ও তার পরবর্তীরা ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছে। সেসময় তাদের সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। আশেপাশের দেশ দখল ও লুটপাটে বেশ অর্থ উপার্জন করেছিল। তাই দিয়েই পিরামিড তৈরি করেন তারা।
এমনই ধারণা মিশরীয় গবেষকদের। তবে পঞ্চম এবং ষষ্ঠ রাজবংশের সময়কালে, সম্পদ ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছিল। আংশিকভাবে পিরামিড সংস্করণ ব্যয় বহন করতে না পারায় এতে নিয়োজিত থাকা পুরোহিত এবং সৈন্যদের অব্যাহতি দেয়া হয়।
পিরামিড সম্পর্কে সবচেয়ে চমকপ্রদ দুটি অনুমান
একদল ডাচ গবেষক মিশরীয় চিত্রকর্ম পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান, শ্রমিকরা স্লেজের মতো করে কিছু টানছেন। আর সামনের আরেকজন কিছু একটা ঢেলে দিচ্ছেন মাটিতে। এই চিত্র দেখে গবেষকদের ধারণা, এটা কোনো আচার- ঐতিহ্য নয় বরং বালুতে পানি ঢালা হত যাতে ওই পথ দিয়ে পাথরগুলো নিয়ে যাওয়া যায়।
ফ্লুইড মেকানিক্সের নীতি অনুযায়ী তরল ঘর্ষণ কমায়। পানি ঢাললে বালু পিচ্ছিল হবে এবং খুব সহজেই বিশাল পাথরের ব্লক সামনে নিয়ে যাওয়া যাবে। সেই দল এই থিওরির সাপেক্ষে নিজেদের রেপ্লিকা বা মডেল তৈরি করে ব্যাপারটা বাস্তবে প্রয়োগ করেন। এমনিতে পিরামিড কায়রো শহরের মধ্যে বিশাল মরুভূমিতে অবস্থিত। তবে প্রাচীনকালে নীলনদের শাখা উপশাখা শহর জুড়ে বিস্তৃত ছিল।
এমনই কোনো গতিপথ নিশ্চয়ই ছিল পিরামিডের পাশ দিয়ে। হয়ত মিশরীয়রা নৌকাতে করে পাথরগুলো আনা নেয়া করত এবং সেখানে বন্দর ছিল যেখানে পাথর নৌকা থেকে রাখা হত। ১৯৯৯ সালে পিরামিডের আশেপাশে খননকালে পাওয়া যায় পিরামিড সিটি। যেখানে শ্রমিকদের বাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হয়েছিল। পাশে পাওয়া গিয়েছিল একটা কবরস্থান। যেখানে পিরামিড তৈরি করতে গিয়ে নিহত হওয়া শ্রমিকদের কবর দেয়া হতো। জানা গেছে, মিশরীয় উঁচু শ্রেণির মানুষেরা নিচু শ্রেণিদেরকে দিয়ে পিরামিড নির্মাণে কাজ করতে বাধ্য করত।
পিরামিড তৈরির কারণ
পিরামিডের ভেতরে মিশরের ফারাও এবং রাজবংশের অনেকের মমি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, মমি সংরক্ষণের জন্যই তারা পিরামিড তৈরি করেছিল। ভাবছেন মমি সংরক্ষণের জন্য এতো বিশাল আয়োজনের কি দরকার ছিল? অন্যভাবেও তো সংরক্ষণ করা যেত। প্রাচীনকালে মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, মানুষ মারা গেলেই জীবন শেষ হয়ে যায় না বরং এরপরও জীবন আছে। এজন্য মিশরের ফারাওরা মারা গেলে তাদের বংশধরেরা মৃত্যুর পর যাতে তাদের কোনো কষ্ট বা অসুবিধা না হয় তার জন্য তাদের দেহকে মমি করে পিরামিডে রাখত।
এছাড়া মমির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য-দ্রব্য, মূল্যবান অলংকার, দেবতাদের মূর্তি, পোষা প্রাণী বা পাখিও মমি করে দিত। মমির তত্ত্বাবধানের জন্য লোক নিয়োজিত থাকত। ধারণা করা হয়, পিরামিড ফারাওদের মমি সংরক্ষণের জন্যই তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে এর ভেতরে রয়েছে অনেক কক্ষ। কেন এত কক্ষের প্রয়োজন ছিল সে সম্পর্কেও আজো জানতে পারেনি গবেষকরা। পরের পর্বে মিশরীয়দের মমি তৈরির রহস্য জানানো হবে। ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকুন।