সত্যিই কি সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় রানি ক্লিওপেট্রার?

ঢাকা, সোমবার   ০৬ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৪ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪১

Akash

সত্যিই কি সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় রানি ক্লিওপেট্রার?

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৫৩ ১৬ মার্চ ২০২০  

ছবি: রানি ক্লিওপেট্রা (প্রতীকী)

ছবি: রানি ক্লিওপেট্রা (প্রতীকী)

ক্লিওপেট্রা নামটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে অনিন্দ্য সুন্দরী এবং দাপুটে এক রানির প্রতিচ্ছবি। যে শুধু তার রূপেই নয় বরং গুণ দিয়েও সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। তার রূপে হাবুডুবু খেতেন সে সময়ের রাজা-বাদশাহ, অধিপতিরা। ক্লিওপেট্রার জীবন-ধারণ এমনকি তার মৃত্যু নিয়েও অনেক রহস্য রয়েছে। অনেকের ধারণা, তার মৃত্যু হয়েছিল সাপের কামড়ে। তবে এর সত্যতা কতটুকু?

ইতিহাসের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর নারী ছিলেন ক্লিওপেট্রা। তার রূপের প্রশংসা আজো বিশ্ববাসী করে। যুগের পর যুগ ধরে ইতিহাসবিদরা রানির রূপ, গুণ এমনকি তার মৃত্যু নিয়ে চর্চা করেছেন। প্রাচীন রোমান ইতিহাসে কথিত রয়েছে, রানি ক্লিওপেট্রা খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সালের আগস্টে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে সর্পদংশনে মারা যান। ৩৯ বছরের জীবনকালে ২১ বছরই তিনি মিশরের রানি হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন।

ক্লিওপেট্রা একসময় রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এজন্য অনেকে মনে করেন, রোমান সম্রাট অক্টাভিয়ানই তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছেন। তার পাঠানো ডুমুর ফলের ঝুড়িতে গোখরা সাপ ছিল। আর সেই সাপের দংশনেই ক্লিওপেট্রা এবং তার দুই দাসীর মৃত্যু হয়।    

মিশরের রানি ক্লিওপেট্রার মৃত্যু রহস্য নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা কাহিনী। রয়েছে নানা বিতর্ক। শত শত বছর ধরে চলমান এসব কল্পকাহিনী রীতিমত মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে। তার কল্পিত জীবন আর মৃত্যু কাহিনী নিয়ে হলিউডে সিনেমা থেকে শুরু করে রচিত হয়েছে নানা উপাখ্যান। তবে এর সত্যতা কতটুকু? তা যাচাই করেছেন কি কেউ? 

রানি ক্লিওপেট্রাবিশেষ করে রানি বিষয়ক সব ধরনের কল্পকাহিনীর মধ্যে সাপের কামড়ে তার মৃত্যুর বিষয়টি গৃহীত হয়েছে। কারণ রানি সাপ ভালোবাসতেন। এমনকি রাজপ্রাসাদে বিষমুক্ত পাইথনও রাখতেন তিনি। এছাড়াও সাপ ছিল মিশরের রাজকীয় প্রতীক। এসব ঘটনাই সাপের কামড়ে রানির মৃত্যুর গুজবকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তবে গবেষকরা সাপের কামড়ে রানির মৃত্যুর তত্ত্বকে অবাস্তব বলেই উড়িয়ে দিয়েছেন।      

মিশরের এ রানির মৃত্যু নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল রোমান রাজার পাঠানো ফলের ঝুড়ির মধ্যে লুকানো সাপের কামড়েই রানির মৃত্যু হয়েছে। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশর বিষয়ক গবেষকরা সর্প বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে একটি গবেষণা কাজ সম্পন্ন করেন। ম্যানচেষ্টার যাদুঘরের সর্পবিদ্যা বিশারদ এন্ড্রু গ্রে বলেন, সাপের কারণে রানি মারা গেছেন এই তত্ত্বটি, অসম্ভব। 

কারণ মিশরে যে ধরনের গোখরা সাপ রয়েছে সেগুলো সাধারণত ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা হয়ে থাকে। এমনকি এগুলো ৮ ফুট পর্যন্তও লম্বা হয়ে থাকে। এত বিশাল একটি সাপের একটি ঝুড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যদিও মিশরীয় গোখরোগুলো তুলনামূলক ছোট। তারপরও এটা অসম্ভব। কাজেই রানির মৃত্যুর এই প্রচলিত ব্যাখ্যা তারা অবাস্তব বলে নাকচ করে দিয়েছেন।

এ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, গোখরা সাপ শুধু আকারেই বিশাল নয়, এর আচরণও ভিন্ন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু ওই একই সাপের ছোবলে হতেই পারে না। গোখরা অবশ্যই বিষধর সাপ এবং এর ছোবলে মৃত্যুও সম্ভব। তবে সেই মৃত্যু আরো ধীরে ঘটে থাকে। কাজেই একের পর এক ক্লিওপেট্রা ও তার দুই দাসী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল তাও আবার সাপের কামড়ে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।  রানি ও তার দাসীরা পড়ে আছেক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেছিলেন?
 
ক্লিওপেট্রা ওই সাপকে নিজের গায়ে ছোবল মারিয়ে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। তবে মিশরের ইতিহাস বিশারদ ড.জয়েস টিলডেসলি অপরাধ বিশেষজ্ঞ প্যাট ব্রাউন বলেন, ক্লিওপেট্রারর চরিত্রে আত্মহত্যার কোনো প্রবণতা ছিল না। তার ধারণা, ক্লিওপেট্রাকে অক্টাভিয়ানই হত্যা করেছে। আবার অন্য একটি তত্ত্বে প্রচলিত আছে, রোমান সম্রাট অক্টাভিয়াস অগাস্টাস সিজারের কাছে মার্ক অ্যান্টনির পরাজয় ও ছুরি দিয়ে আত্মহত্যার বিষয়টি রোমের ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা। 

অ্যান্টনির পরাজয়ের খবর পেয়েই নাকি ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার ধারণা করা হয়, নিজেই নিজের বুকে বিষাক্ত সাপের দংশন নিয়েছিলেন। আর এতেই ক্লিওপেট্রা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আবার কেউ বলেছেন, ক্লিওপেট্রার সঙ্গে সেনানায়কের প্রেমের কারণেই দু’জনকেই হত্যা করা হয়েছিল। 

যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর অক্টাভিয়াস ক্লিওপেট্রার একটি চিঠি পেয়েছিলেন। যেখানে ক্লিওপেট্রা তাকে অ্যান্টনির পাশে কবর দিতে বলেছিলেন। এটি দেখে ততক্ষণাৎ অক্টাভিয়াস ক্লিওপেট্রার খোঁজে লোক প্রেরণ করেন। প্রহরীরা দরজা ভেঙে দেখতে পান ক্লিওপেট্রা তার সোনার পালঙ্কের উপর মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। আর তার দুই দাসী পড়ে আছেন মাটিতে। তারাও মৃত।   

মার্ক অ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রা২০১০ সালে, জার্মান ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফ শ্যাফার তার গবেষণায় জানান, ক্লিওপেট্রা মারাত্মক কোনো ভেষজের রস পান করেছিলেন। যা ছিল অত্যন্ত বিষাক্ত। সেটি হতে পারে নেকড়ের বাচ্চা এবং আফিম দিয়ে তৈরি পানীয়। যা পান করেই আত্মহত্যা করেন ক্লিওপেট্রা।    

২০৫০ বছর আগের এ মৃত্যু রহস্য এখনো ভাবাচ্ছে গবেষকদের। বিশ্বসেরা সুন্দরী খ্যাত ক্লিওপেট্রা সুশাসকও ছিলেন বটে। তিনি খাল কেটে মিশরে জল সেচের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি ক্লিওপেট্রা সপ্তম হিসেবেই পরিচিত। মেসিডোনিয়ান   বংশোদ্ভূত সপ্তম মিশরীয় রানি হওয়ায় তাকে এই পরিচিতি বহন করতে হয়। তার আগে আরো ছয়জন ক্লিওপেট্রা ছিলেন। রানি ক্লিওপেট্রা ছিলেন টলেমি দ্বাদশের তৃতীয় মেয়ে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। 

অক্টাভিয়াস অগাস্টাস জুলিয়াস সিজারের প্রেমিকা ও মার্ক অ্যান্টনির স্ত্রী হিসেবেই বেশ খ্যাত ছিলেন রানি ক্লিওপেট্রা। তার পূর্বপুরুষ টলেমি ছিলেন মহামতি আলেক্সান্ডারের একজন সেনাপতি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেক্সান্ডার মারা গেলে তার অন্যতম সেনাপতি টলেমি মিশরে স্বাধীন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ক্লিওপেট্রা এই বংশেরই শেষ শাসক। 

তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিশরে প্রায় ৩০০ বছরের মেসিডোনিয়ান শাসনের অবসান ঘটে। ক্লিওপেট্রার ঐতিহাসিক জীবনকাল বিশ্বের কবি, নাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বেশ আকৃষ্ট করে। তৈরি হয় মিসরের ক্ষমতাধর রানি ক্লিওপেট্রার নাটক, সিনেমা থেকে শুরু করে কবিতা,গল্প, উপন্যাস। যা সবসময়ই আকৃষ্ট করছে ইতিহাসপ্রেমীদের।

সূত্র: হিস্টোরিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস