শহরে তিন বাড়ি পিয়নের!
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অডিট চলার সময় অফিসের কোটি টাকার ঘাপলা রেবিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অফিসের পিয়ন (অফিস সহায়ক) ইয়াছিন মিয়ার বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি প্রকাশ হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার থেকে অফিসে চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রার অফিসের বিভাগীয় পরিদর্শক মিতেন্দ্র নাথ শিকদার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অডিট কার্যক্রম শুরু করার পর গা ঢাকা দিয়েছে ইয়াছিন মিয়া। এ ঘটনায় সাব রেজিস্ট্রার মোস্তাফিজ আহমেদ বাদী হয়ে গত শুক্রবার রাতে সদর মডেল থানায় জিডি করেন।
জিডি হওয়ার পর পরই পুলিশ ইয়াছিন মিয়ার খোঁজে মাঠে নামে। এরই মধ্যে ইয়াছিন মিয়ার তিন স্ত্রীর মধ্যে দুই স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার রাতে ইয়াছিনের প্রথম স্ত্রী সাজেদা বেগমকে থানায় ডেকে এনে এবং দ্বিতীয় স্ত্রী আকলিমা বেগমকে তার পশ্চিম পাইকপাড়ার বাসায় গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ইয়াছিন মিয়ার ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ঘটনা এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
ইয়াছিন মিয়ার দুই স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ তার সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য পেয়েছে। জানতে পেরেছে তার বিপুল পরিমাণ ধন সম্পদের তথ্য।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সামান্য পিয়ন পদে চাকরি করেই বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন ইয়াছিন মিয়া। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমেই তিনি বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন। জেলা শহরে রয়েছে ইয়াছিনের তিনটি বাড়ি। এছাড়া নামে-বেনামে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। তার রয়েছে তিন স্ত্রীও।
জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মরিচাকান্দি ইউপির আতুয়াকান্দি গ্রামের মোহন মিয়ার ছেলে ইয়াছিন মিয়া। তার পোস্টিং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলা সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে। তিনি ডেপুটেশনে দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত আছেন।
একজন পিয়নের চাকরি করে তিনি কিভাবে এতো ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন এ প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ২৩ বছর আগে ইয়াছিন মিয়া সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে পিয়ন পদে চাকরি পান। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাকে আশুগঞ্জ ও নাসিরনগর উপজেলায় বদলি করা হলেও ঘুরে ফিরে তিনি সদর উপজেলায়ই চাকরি করছেন।
ইয়াছিন মিয়া সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকল, তল্লাশি ও রেজিস্ট্রেশন ফিসহ চালানের টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা দিতেন।
গত মঙ্গলবার অফিসে অডিট কার্যক্রম শুরু হলে তার বিরুদ্ধে ‘কোটি টাকার ঘাপলা’ প্রকাশ পায়। এর পরপরই গা ঢাকা দেন ইয়াছিন মিয়া। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সোনালী ব্যাংকের ভুয়া চালান রশিদ তৈরি করে তিনি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
ইয়াছিনের প্রথম স্ত্রী সাজেদা বেগম জানান, প্রায় ২৫ বছর আগে ইয়াছিন মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এর দুই বছর পর তিনি (ইয়াছিন) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে পিয়ন পদে চাকরি পান। তার স্বামী ইয়াছিন মিয়া তাকে (সাজেদা) পৌর এলাকার ভাদুঘর গ্রামে চার শতাংশ জায়গার ওপর তিনতলা একটি বাড়ি তৈরি করে দেন। সেই বাড়িতেই তিনি বসবাস করেন। কয়েক মাস আগে তিনি তার বড় ছেলেকে ফ্রান্সে পাঠিয়েছেন।
সাজেদা আরো জানান, তাকে বিয়ে করার ১০ বছর পর ইয়াছিন আকলিমা নামে এক বিধবাকে মেয়েসহ বিয়ে করেন। ওই মেয়ে বড় হওয়ার পর তাকে ইতালি প্রবাসী এক যুবকের কাছে বিয়ে দেয়া হয়েছে। ইয়াছিন মিয়া ওই মেয়ের স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে পৌর এলাকার পাইকপাড়ায় একটি ছয়তলা বাড়ি করেছেন।
আকলিমাকে বিয়ের পাঁচ বছর পর ইয়াছিন এক প্রবাসীর স্ত্রী মকসুরা বেগমের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। পরে মকসুরাকেও বিয়ে করেন ইয়াছিন। পৌর এলাকার মুন্সেফপাড়ার একটি ফ্ল্যাট কিনে সেখানেই তৃতীয় স্ত্রী মকসুরাকে নিয়ে বসবাস করেন ইয়াছিন। গত মঙ্গলবার অফিসের ঘাপলা প্রকাশ হওয়ার পর ইয়াছিন তৃতীয় স্ত্রী মকসুরাকে নিয়েই গা ডাকা দেন।
এ ব্যাপারে ইয়াছিনের বাবা মোহন মিয়া জানান, ইয়াছিনের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই। ইয়াছিন তিনটি বিয়ে করেছে।
এ ব্যাপারে সদর সাব রেজিস্ট্রার মো. মোস্তাফিজ আহমেদ জানান, এ ঘটনায় তদন্ত চলছে, আরো তদন্ত চলবে। অফিস সহায়ক ইয়াছিন মিয়া সোনালী ব্যাংকের ভুয়া চালান কপির মাধ্যমে সরকারি বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অডিট শেষে টাকার পরিমাণ বলা যাবে।
তিনি আরো জানান, ইয়াছিন মিয়া চাকরির সময় তার হাতে সোনালী ব্যাংকে জমা দেয়া সব চালান কপি পরীক্ষা করে দেখা হবে। তিনি ইয়াছিন নিখোঁজের ঘটনায় সদর মডেল থানায় জিডি করেছেন।
এ ব্যাপারে সদর এসআই সুমন চক্রবর্তী বলেন, ইয়াছিনের বিষয়ে জানতে আমরা ইয়াছিনের দুই স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তার তৃতীয় স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। আমরা ধারণা করছি ইয়াছিনের তৃতীয় স্ত্রীও তার সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে সদর মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জানান, সাব রেজিস্ট্রি অফিসের পিয়ন নিখোঁজের ঘটনায় থানায় জিডি হয়েছে। আমরা তার দুই স্ত্রীসহ আত্মীয় স্বজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।