রাসূলের (সা.) বহুবিবাহের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই হজরত মুহাম্মদ (সা.) মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম ও অনুপম আদর্শ। অর্থাৎ রাসূল (সা.) যা করেছেন বা করতে বলেছেন, তা পালন করা এবং যা থেকে বিরত থেকেছেন বা থাকতে বলেছেন, তা থেকে বিরত থাকা। এর মধ্যেই রয়েছে উম্মতের কল্যাণ ও সফলতা।
কিন্তু কিছু বিষয় এমন রয়েছে যা রাসূলের (সা.) সঙ্গে খাস। যে সকল বৈশিষ্ট্য হুজুর (সা.) এর সঙ্গে নির্দিষ্ট, তা উম্মতের জন্য পালনীয় বা করণীয় পর্যায়ে পড়ে না। যেমন, আসরের নামাজের পর চার রাকাত নফল নামাজ, যা শুধু রাসূল (সা.) আদায় করতে পারতেন। (হানাফী মতে)
অনুরূপভাবে চারের অধিক স্ত্রী গ্রহণ রাসুলের (সা.) বৈশিষ্ট। অন্য কোনো কারো জন্য একত্রে চারে অধিক স্ত্রী রাখার অধিকার ও বৈধতা নেই। ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন বিধর্মীরা নবী করীম (সা.) এর দোষ শুনতে শুনতে ক্লান্ত। কোনো দোষ পায়নি। অবশেষে রাসূলের বহু বিবাহ নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু করেছে। তাদের অসার অভিযোগ রাসূল (সা.) প্রবৃত্তির তাড়নায় একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। নাউযুবিল্লাহ। কিন্তু আফসোস, যখন, মুসলমান নামধারী অনেকে ইসলামের দুশমনদের সুরে সুর মিলায়। বক্ষমান প্রবন্ধে নবীজির বহু বিবাহের তাৎপর্য বিষয়ক কিঞ্চিত আলোকপাত করা হবে।
ইসলামের শাশ্বত বিধান
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলামের পূর্বে বহু বিবাহের কোনো সীমারেখা ছিল না। একজন পুরুষ হাজার হাজার নারী গ্রহণ করতো। পাদ্রীগণ রীতিমত বহু বিবাহে অভ্যস্থ ছিলেন। কনোষ্টান্টি নেপলেন সম্রাট ও তার বংশধরেরা বহু স্ত্রী ছিল। বৈদিক শাস্ত্রেও বহু বিবাহের বৈধ ছিল। এতে একই সময় দশজন, তেরজন, সাতাশজন স্ত্রী রাখারও অনুমতি ছিল। এরকম সীমাহীন স্ত্রী রাখার অনুমতি ইসলামের প্রাথমিক যুগ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।
ইসলাম সাম্যের ধর্ম, সমাজ ইনসাফ প্রতিষ্ঠাই যার মূল লক্ষ্য। ইসলামে কোনো বিধানের মধ্যে না আছে কঠোরতা ও আছে শিথিলতা। যখন দেখা গেল যে, সীমাহীন বহু বিবাহের দ্বারা মহিলাদের অধিকার ক্ষুন্ন হতে লাগলো এবং মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে বহু বিবাহ করতে লাগলো; তখন ইসলাম এর সীমা রেখা টেনে দিলেন। আবার প্রয়োজনীয়তার প্রতি লক্ষ্য রেখে বহু বিবাহের একেবারে অবৈধও ঘোষণা করলেন না। তাই আল্লাহ ঘোষণা করলেন, তোমার তোমাদের পছন্দসই দুইজন দুইজন তিনজন তিনজন অথবা চারজন চারজন মহিলাকে বিবাহ করতে পারো। তবে এই শর্তে যে স্ত্রীদের যথাযথ হক আদায় করতে হবে। অন্যথায় একটির বেশি বিবাহ করার অনুমতি নেই।
বহুবিবাহের ইতিকথা
প্রাচীন ইতিহাসে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম আগমনের পূর্বে পৃথিবীর মধ্যে সকল জাতির স্বীকৃতি একটি বিষয় ছিল বহু বিবাহ। আরব, পাকিস্তান, ভারত, ইরান, মিসর, গ্রীস, ব্যাবিলন, অষ্ট্রিয়াসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে বহু বিবাহ প্রচলন ছিল। এর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে নবীরাও এই বিধান রহিত করেননি। বরং তারা একাধিক বিবাহ করেছেন। হজরত ইবরাহীম (আ.) এর দুই স্ত্রী ছিল। হজরত মুসার (আ.) কয়েকজন স্ত্রী ছিল। হজরত সুলাইমান (আ.) এরও বহু স্ত্রী ছিল। হজরত দাউদ (আ.) এর একশ স্ত্রী ছিল। একাধিক স্ত্রী ছিলো হজরত ইসাহাক (আ.)-এর।
তাওরাত, ইঞ্জিল শরীফেও বহু বিবাহের উল্লেখ রয়েছে। প্রসিদ্ধ খ্রিষ্টান পাদ্রীর মি. ডিন ও পেটে বহু বিবাহের স্বপক্ষে ইঞ্জিলের বহু আয়াতে উল্লেখ করার পর লিখেন যে, বহু বিবাহ শুধু পছন্দনীয় নয় বরং এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ বরকত। (জন ডিন ওন পোট জীবনী-১৫৮) এভাবেই বিশিষ্ট পাদ্রীয়ান বিশেষ গবেষণার পর এই ফতোয়া দিয়েছেন যে একাধিক স্ত্রী বনী ইসলাইলের মাঝে ছিল। আল্লাহ তাকে নিষেধ করেনি। বরং বরকতের ওয়াদা করেছেন। (ইসলাহে সাহু-আমেরিকান মিশন প্রেস-এডিশন-১৮৭১)
এ আলোচনা থেকে আমরা একথা নির্দিধায় বলতে পারি যে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে বহু বিবাহ সম্পর্কে আপত্তি করার কোনো অবকাশ নেই। আধুনিক ইউরোপিয়ানরা বহু বিবাহের বিপক্ষে অনেক চেষ্ঠা করেছে। কিন্তু তার সফল হয়নি। অবশেষে সহজাত কামুলেরই বিজয় হয়েছে।
রাসূলের (সা.) বহুবিবাহের আদর্শিক ভাবনা
উপরোক্ত সাধারণ বিধান মতে রাসূল (সা.) চারের অধিক স্ত্রী হওয়া উচিত নয়। তথাপি রাসূল (সা.) এগারজন স্ত্রী কেনো রাখলেন? প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণেই কী এর উদ্দেশ্যে? যেমনটি ইসলাম বিদ্বেষীরা বলে থাকে! না কি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে আছে? এ সম্পর্কে দু-চারটি যুক্তি ভিত্তিক কথা নিম্নে প্রদান করা হলো-
এক. প্রতিটি মানুষের জীবনে দুটি দিক রয়েছে। এক. প্রকাশ্য, দুই. অভ্যন্তরীণ। একজন ব্যক্তি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে হলে জীবনের উভয় দিক উম্মোচিত হওয়া আবশ্যক। প্রকাশ্য জীবন হচ্ছে সকলের সামনে যাপিত জীবন, যা সকলের মাঝে সুবিবেচিত ও পূর্ণ প্রকাশিত। আর অভ্যন্তরীণ জীবন হচ্ছে, পারিবারিক জীবন তথা চার দেয়ালের মাঝে জীবন। চার দেয়ালের মাঝের জীবন দ্বারাই একজন মানুষের চারিত্রিক নির্মলতা ও কুশলতা নির্ণয় করা যায়। কারণ, নিজ পরিবার স্ত্রী-সন্তানদের মাঝে তার আচরণ হয় খোলামেলা। রাসূলের জীবনে দুটি দিক রয়েছে। তার বাইরের প্রকাশ্য জীবন কেমন ছিল, তার সাহবায়ে কেরামগণ লক্ষ লক্ষ বর্ণনার দ্বারা জগৎবাসীর সামনে উম্মোচন করেছেন। অপর দিকে রাসূলের পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন উম্মুল মুমিনগণ।
নবীজি ঘরে এসে গার্হস্থলী কাজ-কর্ম কীভাবে করছেন, স্ত্রী পরিজনের সাথে তার আচরণ কেমন ছিলো? রাতের আঁধারে রাসূল কি রকম ইবাদত বন্দেগী করতেন, ইত্যাদি বা স্ত্রী ছাড়া কারো জানা সম্ভব নয়। এ বিষয়গুলো যেনো জগৎবাসী বিশ্বাসযোগ্যভাবে জানতে পারে, সে জন্য তার একাধিক স্ত্রী থাকা প্রয়োজন । কারণ, রাসূলের জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ অনুকরণীয় । তাই রাসূল একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। যেনো একদল মহিলার বর্ণনার পর তাতে জগৎবাসী কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ না থাকে।
সকল শরীয়া বিধান মহিলাদের জন্য একান্ত নিজস্ব, যেগুলো পুরুষের নিকট আলোচনা করা বা পুরুষের মাধ্যমে মহিলাদের জানান লজ্জাজনক, সে সকল বিষয় মহিলাদের নিকট মহিলারাই বর্ণনা করবেন এবং এর যথাযথ প্রচার-প্রকাশ করবেন।
উপরের আলোচনা থেকে বুঝা গেলো যে, রাসূলের বহু বিবাহের অন্যতম একটি কারণ হলো তাবলীগ দীন বা দীনের প্রচার, যা দুচার জন স্ত্রী দ্বারা পূর্ণ করা সম্ভব নয়।
দুই. নবীজির প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ একটি বিবাহ করেননি। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো রাসূল (সা.) যখন ২৫ বছরের টগবগে যুবক তখন তিনি ৪০ বছর বয়সী সত্বী স্বাবধী সর্বগুণ সম্পন্ন মহীয়সী এক বৃদ্ধা নারী হজরত খাদিজা (রা.) কে বিবাহ করেন। যা বতর্মানে যুগে কল্পনাও করা যায় না। শুধু কি তাই? তিনি যৌবনের স্বর্ণালী দিনসহ পঁচিশটি বসন্ত হযরত খাদিজার সঙ্গেই কাটিয়ে দিয়েছেন। যখন খাদিজা ইন্তেকাল করেন তখন রাসূলের বয়স পঞ্চাশ বছর। তারপর রাসূল (সা.) দুনিয়াতে ছিলেন মাত্র তের বছর। এই তের বছরে রাসূল (সা.) দশজন স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণেই যদি রাসূলের উদ্দেশ্যে হতো তাহলে যৌবনের সেই স্বর্ণালী দিনগুলোতেই একাধিক বিবাহ করতেন। একজন বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে যৌবন পার করতেন না।
তিন. প্রবৃত্তির চাহিদা পুরণই রাসূলের বহু বিবাহের উদ্দেশ্য ছিল না। তার আর একটি প্রমাণ হলো রাসূলের এগারজন স্ত্রীর মধ্যে একমাত্র হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বাদে কেউই কুমারী ছিলেন না।