ঢাকা,  বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

[ লাইফস্টাইল ]

সম্পর্কের মুকুলে সময়ের জলসিঞ্চন

রাজু আহমেদ
প্রকাশিত: ১০:২১, ২১ অক্টোবর ২০২৬
সম্পর্কের মুকুলে সময়ের জলসিঞ্চন
সে ভবিষ্যত ডেকে নেয়, বার্ধক্যে সাজিয়ে দেয়। জীবনের যে দিনগুলো রঙিন হলো না সেদিনগুলো জীবনের আপন হলো না। গোঁ ধরে থাকলে অগোচরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে। এতে কার ক্ষতি হবে

জীবনের একটা সময় অতীতের জন্য আফসোস হবে। জেদের প্রতি ঘৃণা জমবে। অতীতের মান-অভিমানে সুন্দর সময় অপচয়ের জন্য মাথা ঠুকতে ইচ্ছা করবে। আমাদের হতাশা, আমাদের আফসোসের অন্যতম সোর্স হবে পরিবারকে সময় না দেওয়া। 

দুনিয়ার জন্য, দেশের জন্য কিংবা দশের জন্য অনেককিছু করার চেষ্টা করেছি, নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি কিংবা নির্ভরশীলদের মন বুঝতে চাইনি- এসব একদিন ব্যর্থতার ইতিহাস জানান দেবে। ভুলপথে ঘুরে, বিপথে সময় নষ্ট করে আমরা আসলে সুন্দর সম্পর্ক আর সুসময়কে বলিদান করেছি। 

ঘরের চেয়ে পরের প্রাধান্যতে সময় একদিন আমাদের সামনে ভয়ঙ্কর ক্ষতিপূরণের ফিরিস্তি নিয়ে হাজির হবে। আসলে সময় সুদ-আসলে আচরণের বদলা নেবে। 

যেদিন অতীতের জন্য আফসোস হবে, কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা জাগবে কিংবা মনে হবে পাছে ভুল ছিল- সেদিন আর সূর্য মাথার ওপরে থাকবে না। বেলা হেলে পড়ার পরে আত্মোপলব্ধি জাগলে, অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আগে ভুলের খেসারত দিয়ে কষ্ট কমানোর সুযোগ থাকবে না। 

  • যে জীবনের গোটা টা-ই ভুল, পচন ধরেছে মূলে সেখানেও সমাধান আছে যদি পূর্বাহ্ণে ভুল ধরা পড়ে। কিন্তু জেদ জাহির ও জারি রাখলে, ভুল স্বীকার না করলে কিংবা অন্যদের অধিকার আমলে না নিলে অন্ধকারের অসুখে সকল সুখ গ্রাস করে নেয়। তখন আফসোস-উপলব্ধি নতুন যন্ত্রণার সূচনা করে। 

কৃতকর্মের জন্য তীব্র অনুশোচনা জাগলেও ক্ষত সারানোর মলমে আর ব্যথার ব্যাপ্তি কমায় না। বরং সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। মরণ পর্যন্ত মরণ খেলা চলে!

বৃক্ষ যেমন চারা অবস্থায় যত্ন চায়, সম্পর্কও তেমনি মুকুলেই খেয়াল পেয়ে ফুল হয়ে ফুটতে চায়। অথচ আমরা ভুলে ভুলে ফুলের সম্ভাবনা মুকুলেই শেষ করে ফেলি। বিশ্বাসকে ভিত্তিমূল করে যে সম্পর্কের গোড়াপত্তন তা অনাদর পেলে কষ্টে শুকিয়ে নেতিয়ে যায়। মন থেকে মন উঠে গেলে আর টান থাকে না। যৌবনের আকাঙ্ক্ষায় বৃদ্ধ বয়সে তথা অসময়ে পানি ঢাললে শখ মিটবে না। 

পূর্ণিমার ভরা জ্যোছনা উপভোগ করার নির্দিষ্ট ক্ষণ আছে। সাগরে ঝাঁপাঝাপি, পাহাড়ে হাঁটাহাঁটি কিংবা বুকে দাপাদাপির বেলা ক্ষয়ে এলে তখন কেবল কথাই ভালো লাগে। ঝর্ণার কাছাকাছি হওয়া, তুফানের মাথাতে নাচানাচি করা- এসব সময়ের চিত্র। 

  • অথচ জেদ দেখিয়ে, অভিমান করে কিংবা অহংকার পুষে দূরত্ব ধরে রাখলে- আয়ুর অল্পদিনেই অনেককিছু থেকে বঞ্চিত হতে হবে। হাতে হাত রেখে বৃষ্টির ফোঁটা অঙ্গে মাখাতে না পারলে একজীবনের অনেকখানি মিছে। 

কিছু কিছু ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ থাকে না। বয়সের ২২ বর্ষীয় ক্ষতিপূরণ বয়সের ফ্রেমের ৫২ বছরের কাছে নাই। জেদ করে যা করি সব যদি ঠিক থাকতো তবে প্রেম এবং ভালোবাসা আলাদা হয়ে সৃষ্টি হতো না। ঘরের চেয়ে যার কাছে পরের প্রাধান্য বেশি তাকে আফসোস করতেই হবে। 

সময়ের হেরফেরে হতাশায় নিমজ্জিত হতেই হবে। প্রত্যেকটি বসন্তের, ঋতুর হেমন্তের আলাদা আলাদা গল্প আছে। প্রত্যেক রাতের কাছে আছে মিলনের মহাকাব্য। 

অহংকার-দম্ভে যদি সেসব ভেসে যায় রাগে তবে পরস্পরের প্রতি ক্ষোভ বাড়বে; কমবে না। সম্পর্কে দূরত্ব, সম্পর্কের শূন্যতা ভয়ঙ্কর। কাজেই দূরে ফেলে রাখা এবং দূরে সরে থাকা- এসব ভালোর সাথে আলোর দেখা করায় না। মিটায় না প্রেম-পিপাসা। বরং মনের ব্যাধি বৃদ্ধি করে।

  • আয়ুর তাবিজ কতদিন স্থায়ী হয়? কাজেই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা গর্বের। ভুল ঠিকানায় গড়াগড়ি খেলে আসল ঠিকানায় বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস বইবে।  

দূরের আকাশও রোজ রাতে মাটিকে শিশির উপহার দেয়, চাঁদের আলো কাছে পাঠায় গল্প। যখন খুব মন খারাপ হয় তখন পাঠায় ঝমঝমে টাপুরটুপুর বৃষ্টি। অথচ মানুষ জেদ ধরলে অতীত মনে রাখে না। ভবিষ্যতে একসাথে পথচলার সুযোগ নষ্ট করে দেয়। 

যে সময় অতীতে পাড়ি জমায় সে সময়ের কাছে রঙিন স্মৃতি লেপে দিতে না পারলে সময় আবর্তনে আফসোস নিয়ে হাজির হবে। তখন মনে হবে- এইসব ভুল না করলেও পারতাম। প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ থাকবে না অথচ ভুল চিহ্নিত হয়েছে- তখন যে মনঃকষ্ট সৃষ্টি হবে তা মৃত্যুকে আহ্বান করবে। অথচ সময় কত সুন্দর হতে পারতো! সময়কে রাঙিয়ে তোলার কত-শত সুযোগ ছিল। হেলায় বেলা খোয়ানোর কৈফিয়ত যৌক্তিক হবে?

  • পরস্পরকে বঞ্চিত করা মানে গোটা পরিবারকে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত করা। কেবল একজনের দায়ে এ সমস্যার সৃষ্টি হয় না। আবার কেবল একজনের চেষ্টায় এমন ক্ষত সারানোও যায় না। ছাড় দিয়ে, জেদ ছেড়ে সুখের তালাশে দু'জনকেই এগিয় আসতে হয়। দু'জন দু'দিকে মুখ করে থাকলেও সময় বসে থাকে না। 

সে ভবিষ্যত ডেকে নেয়, বার্ধক্যে সাজিয়ে দেয়। জীবনের যে দিনগুলো রঙিন হলো না সেদিনগুলো জীবনের আপন হলো না। গোঁ ধরে থাকলে অগোচরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে। এতে কার ক্ষতি হবে? সুখের জন্য সন্ধি হওয়া জরুরি। 

ভালো কাজের জন্য এগিয়ে আসলে কেউ ছোট হয় না বরং গুরুত্ব বাড়ে। কথা ধরে রাখলে, খারাপ সময় সামনে আনলে তাতে শীতের ক্ষতি হয় না বরং শরীরের ক্ষতি হয়। মিলেমিশে থাকার মধ্যে জাগতিক কল্যাণ আছে। নিশ্চয়ই নিজেকে নিজের দ্বারা বঞ্চিত করা বুদ্ধিদীপ্ত কাজ নয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!