ঢাকা,  শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

কেমন আছে সুন্দরবন উপকূলের মুণ্ডারা?

রুবেল মিয়া নাহিদ
প্রকাশিত: ১৭:১৪, ২৩ এপ্রিল ২০২২
কেমন আছে সুন্দরবন উপকূলের মুণ্ডারা?
সুন্দরবনকে ঘিরে বসবাস করা মুণ্ডা সম্প্রদায়। ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় উপজাতি মুণ্ডা। ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ছত্রিশগড় রাজ্যের ছোটনাগপুর অঞ্চল, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গে এদের বাস। এ ছাড়াও বাংলাদেশের সুন্দরবনে রয়েছে আদিবাসী ‘মুণ্ডা’ সম্প্রদায়। প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করতে পারায় তৎকালীন শাসকরা সুন্দরবনের গাছ কেটে বসতি গড়তে মুণ্ডাদের এদেশে এনেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি তাদের। আজও সুন্দরবনকে ঘিরেই তাদের জীবন-মরণ। কেমন আছে সুন্দরবনকে ঘিরে বসবাস করা মুণ্ডা সম্প্রদায়? 

সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি, ভেটখালী, তারানিপুর, সাপখালী, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ, কাশিপুর, কচুখালী এলাকায় বসবাস করে আদিবাসী মুণ্ডারা। জেলার দেবহাটা ও তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে মুণ্ডাদের বসতি রয়েছে। সাতক্ষীরা উপকূলে মুণ্ডা জনগোষ্ঠী রয়েছে আড়াই সহস্রাধিক। এ ছাড়া খুলনা জেলার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় তাদের বসতি রয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন এলাকায়ও এদের আদি বসতির চিহ্ন মিলে। কম্পাট মুণ্ডা, খাঙ্গার মুণ্ডা, খাড়িয়া মুণ্ডা, পাথর মুণ্ডা, দেরগে মুণ্ডা, সাঙ্কা মুণ্ডা এবং মাঙ্কী মুণ্ডাসহ বাংলাদেশে অবস্থিত মুণ্ডাদের সাতটি গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। 

সুন্দরবন এলাকার মুণ্ডাদের জীবন-জীবিকা বনের উপরই নির্ভরশীল। মুণ্ডা পরিবারের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অভাবকে পুঁজি করে সৃষ্টি হয়েছে এ সম্প্রদায়ের কষ্টের জীবন। জমি-জমা যা ছিল তাও হারিয়েছে নানা কারণে। বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হয় অধিকাংশ মুণ্ডাদের।

সুন্দরবনকে ঘিরে বসবাস করা মুণ্ডা সম্প্রদায়। ছবি: সংগৃহীত

আগে মুণ্ডাদের প্রধান জীবিকা ছিল সুন্দরবনের গাছ কাটা। বিশেষ করে তারা গোলপাতা ও গরান কাঠ কাটাই ছিল তাদের অন্যতম কাজ। বর্তমানে তাদের অনেকেই আদি পেশা ছেড়ে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। বাঙালিদের মতো মুণ্ডারা কৃষি কাজে নিয়োজিত হলেও এরা অধিকাংশই ভূমিহীন। তাই এ অঞ্চলের মুণ্ডারা দিনমজুরির ভিত্তিতে মাছ ধরে। অন্যের জমিতে বেতনভুক্ত কাজ, নৌকা নির্মান করা, কাঠ মিস্ত্রির কাজ করে বর্তমান মুণ্ডারা। 

এ ছাড়াও আদিবাসীরা যেহেতু খুব পরিশ্রমী তাই তাদেরকে স্বল্পমূল্যের শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুন্দরবনের বন বিভাগ ও বহিরাগত ব্যবসায়ীরা বনের কাঠকাটা ও অন্যান্য কাজে তাদের নিয়োগ করে থাকে।

এসবের প্রভাব পরেছে মুণ্ডা নারীদের জীবনে। মুণ্ডা নারীরাও আজ ঘরের বাইরে নানা কাজ করে। জাল বোনা, সুন্দরবনের নদী খালে মাছ- কাঁকড়া ধরা ও মৌ সংগ্রহসহ সব ধরনের কাজে দেখা যায় মুণ্ডা নারীদের। এছাড়াও গৃহপালিত পশুর দেখভাল, কৃষি কাজ থেকে শুরু করে নানা কাজে অংশ নেয় নারীরা।  

সুন্দরবনকে ঘিরে বসবাস করা মুণ্ডা সম্প্রদায়। ছবি: সংগৃহীত

‘মুণ্ডারী’ ধর্মের অনুসারী মুণ্ডাদের প্রধান উৎসব ‘করম পূজা’। বাংলা ভাদ্র মাসের একাদশী তিথিতে এই উৎসব পালন করা হয়। আর মুণ্ডাদের নিজস্ব ভাষা ‘সাদরী’ এবং সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক ‘বন্দনা নৃত্য’।  তবে নানাভাবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আজ বিলিনের পথে। বাঙালিদের সঙ্গে ওঠবস ও লেখাপড়ার কারণে নিজেদের ‘শাদ্রী’ ভাষা ভুলতে বসেছে বর্তমান প্রজন্ম। প্রাথমিক পাঠ শেষে শিশুরা ঝরে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় মুণ্ডারা তাদের দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কৃতি চর্চাও করতে পারছে না। জমি ও ভাষার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি আজ বিলুপ্ত প্রায়। 

সাংস্কৃতিক ঐহিত্য ধরে রাখার পাশাপাশি মুণ্ডাদের উদ্যোগে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের কালিঞ্চি গ্রামে গড়ে উঠেছে কালিঞ্চি ক্যারামমুরা ম্যানগ্রোভ ভিলেজ (পর্যটন কেন্দ্র)। এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের থাকা, খাওয়া ও সুন্দরবন ভ্রমণের সুব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে আদিবাসী মুণ্ডাদের নানান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখার সুযোগও।  

তবে মুণ্ডাদের অভিযোগ, এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলেও রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থা পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন বাইরে থেকে পর্যটকরা এখানে আসার জন্য যোগাযোগ করেন, তখন রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থার কথা শুনে অনেকে পিছিয়ে যান। যা আদিবাসী মুণ্ডাদের সংস্কৃতির বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে।  

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!