ঢাকা,  শুক্রবার   ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

দু’টি মহান নেয়ামত এবং তার প্রতি উদাসীনতা (পর্ব- ২)

মাওলানা ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ২০:২৬, ৫ আগস্ট ২০১৯
দু’টি মহান নেয়ামত এবং তার প্রতি উদাসীনতা (পর্ব- ২)
ফাইল ফটো

হাফেয ইবনে হাজার এবং সময়ের কদর:
হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) ছিলেন শীর্ষস্থানীয় ও প্রসিদ্ধ একজন মুহাদ্দিস। বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার এবং ইলমের পাহাড়। আমলের যে অবস্থানে আল্লাহ তায়ালা তাকে পৌঁছিয়েছেন, আজমের (অনারব) মানুষ এই মর্যাদায় পৌঁছার কল্পনাও করতে পারে না।

আলেম গ্রন্থকার এবং মুহাদ্দিস নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। তার অবস্থার বিবরণে লেখা আছে যে, তিনি যখন গ্রন্থ লেখার কাজ করতেন, তখন লিখতে লিখতে তার কলমের কালি খারাপ হয়ে যেত। কেননা তখনকার সময়ে লাকড়ীর কলমের সাহায্যে লেখা হত এবং বার বার তা চাকু দিয়ে ঠিক করতে হত। এতে বেশ কিছু সময় ব্যয় হত। তাই এই সময়টুকুও বেকার কাটানো তার মনোপুত ছিল না। তাই যে সময় ঠিক করতে ব্যয় হত, সেই সময়টুকু কালিমা পড়তে থাকতেন। যেন এ সময়টাও নষ্ট না হয়ে যায়। কেননা যে সময়টুকু লেখার মাঝে অতিবাহিত হয় তাতো আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের মাঝেই অতিবাহিত হয়। কিন্তু ফাঁকে যে কয়েক মিনিট পেলাম তা কেন নষ্ট করব? তাই তিনি এই সুযোগে তিনটি কালিমা পড়ে নিতেন। যেন এই মুহূর্তটাও বিফলে না যায়। তাই রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  বক্তব্যের সারকথা এই যে, সময়ের মর্যাদা দাও।

আরো পড়ুন>>> দু’টি মহান নেয়ামত এবং তার প্রতি উদাসীনতা (পর্ব-১)

Advertisement

হজরত মুফতী মুহাম্মদ শফী সাহেব এবং সময়ের কদর: 
আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি মর্যাদা ও গুরুত্বহীন বস্তু হচ্ছে সময়। এটাকে যেভাবে ইচ্ছা নষ্ট করা, গল্পগুজবে ব্যয় করা, বেহুদা কাজে কাটানো, বিনা কারণে এমন কাজের মাঝে কাটানো যাতে দুনিয়া ও দ্বীন কোনটারই উপকার নেই। হজরত মুফতী মুহাম্মদ শফী সাহেব (রহ.) বলতেন, আমি আমার সময়কে মেপে মেপে ব্যয় করি। যেন কোনো মুহূর্ত বেকার না কাটে। হয়ত দ্বীনের কাজে কাটবে অথবা দুনিয়ার কাজে কাটবে। আবার দুনিয়ার কাজেও যদি নিয়ত সহীহ হয় তাহলে তাও পরিশেষে দ্বীনের কাজ হয়ে যায়।

তিনি উপদেশ দিয়ে বলতেন যে, এ কথাটা যদিও একটু শরমের কথা কিন্তু তোমাদের বুঝানোর জন্য বলছি যখন মানুষ বাথরুমে বসে থাকে, তখন ওই সময়টা এমন যে, তখন মানুষ জিকির করতে পারবে না। কেননা তখন জিকির করা নিষেধ। অন্য কোনো কাজও তখন করা যায় না। আমার স্বভাবটা এমন হয়ে গেছে যে, যতক্ষণ সেখানে বেকার থাকি তখন বড়ই দুর্বিসহ মনে হয়। কারণ এ সময়টাতে কোনো কাজই করা হচ্ছে না। এজন্য সে সময় বাথরুমের লোটা ধুয়ে নেই, যেন সে সময়টাও কোনো কাজে লেগে যায় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য লোক এসে ওই লোটা ব্যবহার করবে, তখন তাকে দুর্গন্ধময় এবং ময়লাযুক্ত হিসেবে পাবে না।

তিনি বলতেন যে, প্রথমেই চিন্তা করি অমুক সময় আমি পাঁচ মিনিট সময় পাব। সে পাঁচ মিনিটে আমি কী কাজ করব? অথবা খাবারের পর তৎক্ষণাত পড়া-লেখা যথার্থ নয়; বরং দশ মিনিট বিরতির প্রয়োজন। তখন আমি শুরুতে চিন্তা করতাম যে, খানার পর এই দশ মিনিট অমুক কাজটি সারতে হবে। তাই সে সময় ওই কাজটা সেরে নিতাম। 

আজ আমরা নিজেকে নিজে আলসেমী এবং চিন্তাহীন অবস্থার মাঝে লিপ্ত করেছি। চব্বিশ ঘন্টার চিন্তা চেতনায় আখেরাতের চিন্তা অনেক কমই আছে। অলসতা বৃদ্ধি করেই চলেছি। এ বিষয়কে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘আমর ইবনে মায়মুন আওদী (রাযি.) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, পাঁচটি বস্তুতে পাঁচটি বস্তুর পূর্বে মূল্যবান মনে করবে, বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে মূল্যবান মনে করবে, অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে মূল্যবান মনে করবে, সম্পদকে মুখাপেক্ষীতার পূর্বে মূল্যবান মনে করবে, অবসর সময়কে ব্যস্ততার পূর্বে মূল্যবান মনে করবে এবং স্বীয় জিন্দেগীকে মৃত্যুর পূর্বে মূল্যবান মনে করবে।’

যৌবনের মূল্যায়ন কর:
এর অর্থ হলো এই যে, পাঁচটি জিনিস এমন যা পরিসমাপ্তি অবিসম্ভাবী। এখন যৌবনকাল চলছে, যৌবনের পরেই বার্ধক্য আসন্ন। এ যৌবন সর্বদা বিদ্যমান থাকবে না বরং হয়ত এরপরই বার্ধক্য আসবে বা মৃত্যু আসবে। তৃতীয় কনো পথ নেই। এজন্য এ বার্ধক্যের পূর্বে ওই যৌবনকে মূল্যবান মনে কর। এই শক্তি সামর্থ এবং সুস্থতা আল্লাহ তায়ালা এ সময় দান করেছেন। তাকে মূল্যবান মনে করে ভালো কাজে ব্যয় কর। বার্ধক্য  অবস্থায় তো এই হয়ে যায় যে, ‘মুখে থাকে না দাঁত আর পেটে থাকে না আ’ত।’ তখন কী করবে যখন হাত পা নাড়াতে পারবে না। শেখ সাদী (রহ.) বলেন, ‘বৃদ্ধকাল তো জালেম বাঘও পরহেযগার হয়ে যায়, কেন? এজন্য যে, খেতেই পারে না। শক্তিই থাকে না, এখন কাকে খাবে। আরে! যৌবনে তাওবা করা পয়গম্বরগণের অভ্যাস। এজন্য বলেন যে, বৃদ্ধাবস্থার পূর্বে যৌবনকে মূল্যবান মনে কর।

সুস্থতা, সম্পদ ও অবসর সময়ের মূল্যায়ন কর:
এখন সুস্থ আছ। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে, কোনো মানুষ পৃথিবীর মাঝে এমন নেই যে, সুস্থতার পর তার অসুস্থতা আসে না। অসুস্থতা অবশ্যই আসবে, কিন্তু কখন আসবে তা জানা নেই। এজন্য এর পূর্বে বিদ্যমান সুস্থতাকে মূল্যবান মনে করবে।

প্রভাতে এই দোয়া করো:
এই জিন্দেগীর সময়কে কাজে লাগানোর পদ্ধতি এই যে, নিজের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জিন্দেগীর নিযামুল আওকাত (দিনের কার্যসূচী) বানিয়ে নাও এবং ফের তাকে যাঁচাই করে নাও যে, কী কী করছ এবং উত্তম আমলের মাঝে কী কী বৃদ্ধি করতে পার। তাকে বৃদ্ধি কর এবং তুমি কোনো গুনাহে লিপ্ত আছ কী না তা ছেড়ে দাও এবং সকালে নামাজ পড়ে এই দোয়া কর, হে আল্লাহ! এই দিন আসছে, আমি বাইরে বেরুব। আপনিই জানেন, কী অবস্থা সামনে আসবে, হে আল্লাহ! আমি ইচ্ছা করেছি যে, আজকের দিনকে আখেরাতের জন্য সম্পদ বানাব। হে আল্লাহ! আমাকে তার তাওফীক দান করুন। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকাল বেলা দোয়া করতেন। সেসব দোয়া মুখস্থ করে নেয়া চাই। 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এমন দোয়া শিখিয়েছেন যে, তাতে দ্বীন এবং দুনিয়ার কোনো প্রয়োজন ছাড়েননি। যার এ দোয়াগুলো স্মরণ থাকবে, সে সকালে দোয়াগুলো পড়ে নেবে আর যাদের এ দোয়াগুলো মুখস্ত নেই, সে নিজ ভাষায় আল্লাহ তায়ালার দরবারে এই দোয়া করবে, হে আল্লাহ! এই যে দিন শুরু করছি এবং এই ইচ্ছা করেছি যে, এই দিনের চব্বিশটি ঘণ্টাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করব। ভুল ব্যবহার এবং বেহুদা সময় নষ্ট করা থেকে বাঁচাব, আমি তো ইচ্ছা করেছি, কিন্তু হে আল্লাহ! আমি কী, আর আমার ইচ্ছাই কী, আমার প্রতিজ্ঞা কী, আমার সাহস এবং আমার উদ্দেশ্যের কী কোনো বাস্তবতা আছে? প্রতিজ্ঞার মালিকও আপনি, সাহস যোগানদাতাও আপনি। বীরত্বের মালিক আপনি। আপনি আপনার মেহেরবাণীতে আমাকে এমন পথে লাগিয়ে দিন, এমন অবস্থা সৃষ্টি করে দিন যেন আমি এ দিনের চব্বিশ ঘণ্টাকে আপনার মর্জি মোতাবেক ব্যয় করতে পারি। তাই সকালে উঠে প্রতিদিন এই দোয়া চাইতে থাক। ইনশাআল্লাহ তার বরকতের দ্বারা আল্লাহ তায়ালা ওই দিনের সময়কে নষ্টের হাত থেকে বাঁচাবেন। 

দুই রাকাত নফলের মূল্য:
একবার রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক কবরের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সেখানে যেসব সাহাবা সঙ্গে ছিলেন, তাদের সম্বোধন করে বললেন যে, এই যে, দুই রাকাত নফল কখনো জলদি জলদি আমি এবং তোমরা পড়ে নিচ্ছ। আর তাকে তোমরা মামুলি মনে করছ। কিন্তু এই ব্যক্তি যে কবরে শুয়ে আছে। তার কাছে এই দুই রাকাত নফল গোটা দুনিয়া ও তার মাঝে যা আছে তা থেকে উত্তম। কেননা এই কবরের ব্যক্তি তাতে আক্ষেপ করছে যে, হায়! আমার জীবনের যদি দুইটি মিনিট পেতাম, তাহলে তাতে দুই রাকাত নফল পড়ে আমার আমলনামায় তা বৃদ্ধি করে নিতাম।

শুধু আমলই সঙ্গে যাবে:
রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বুঝানোর কেমন বিস্ময়কর ও বিরল পদ্ধতি। কীভাবে স্বীয় উম্মতকে বুঝিয়েছেন তিনি। এক হাদিসে রাসূলে করিমম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন মুরদাকে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনটি জিনিস তার সঙ্গে যায়। এক. তার আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জন, যারা তাকে রেখে দেয়ার জন্য কবর পর্যন্ত নিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত তার মাল, যেমন খাট কাফন ইত্যাদি। আর তৃতীয় হলো তার আমল। তারপর প্রথমোক্ত দু’টি বস্তু অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন ও সম্পদ কবর পর্যন্ত তাকে পৌঁছিয়ে দিয়ে ফিরে আসে। কিন্তু সঙ্গে যে জিনিসটি যায় তা শুধু আমল। (বুখারী, কিতাবুর রিকাক)। 

হজরত আলী (রাযি.) এই শিক্ষা দিয়েছেন যে, যখনই কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাবে, সামান্য সময়ের জন্য হলে একটু চিন্তা কর যে, এরাও আমাদেরই মত মানুষ ছিল এবং আমাদের মত তাদেরও জীবন জিন্দেগী ছিল। তাদেরও সম্পদ ছিল, দৌলত ছিল, তাদের প্রিয়জন, আত্মীয়-স্বজন ছিল। তাদেরও চাহিদা ছিল, তাদের বাসনাও ছিল, তাদেরও আবেগ অনুভূতি ছিল। কিন্তু আজ সেসব বিদায় হয়ে গেল। হ্যাঁ, যদি কোনো জিনিস তার সঙ্গে থাকে তা হলো তার আমল এবং এখন এই কয়েকটি মুহূর্তকে খুঁজে ফিরি যে, যদি সামান্য কিছু সময় আমি পেতাম, তাহলে আমি আমার নেকীর মাঝে বৃদ্ধি করে নিতাম।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!