ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ভয়ে যে গাছের পাতাও ধরত না কেউ

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) 
প্রকাশিত: ১১:৪৮, ৩১ জানুয়ারি ২০২৪
ভয়ে যে গাছের পাতাও ধরত না কেউ
কালের সাক্ষী শতবর্ষী বটগাছ

সেই চিরচেনা পথ। সবুজ গাছের ছায়া। পাখির কলতান। দূর থেকে চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির একটি বটগাছ। তবে গাছটির বয়স নিয়ে রয়েছে নানান কথা। কেউ বলছেন গাছটির বয়স একশ। কেউবা বলছেন দুইশ আবার কেউবা বলছেন তিনশ বছরের কাছাকাছি। তবে এই বটগাছটির বিশালতা রয়েছে দেখার মতো। গাছের নিচে অন্য কোনো গাছ বা আগাছা নেই। সব মিলিয়ে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া-ধরখার সড়কের গঙ্গাসাগর এলাকায়। এই বিশাল আকৃতির বটগাছটির শাখা-প্রশাখা আর শিকড়ে ছেয়ে আছে বেশ জায়গাজুড়ে। 

গাছটির উচ্চতা আনুমানিক ৮০-৯০ ফুট। চারদিক থেকে অন্তত ১২টি বিশাল আকাড়ের ডালপালা বেরিয়ে অক্টোপাসের মতো মাটি আঁকড়ে ধরে আছে গাছটি। মনে হয় যেন অনেকগুলো বটগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। আজও বটগাছটি রয়েছে চিরসবুজে। যেন বার্ধক্যের ছাপ একটুও পড়েনি তার গায়ে। বর্তমানে এই বিশাল আকৃতির বটগাছটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটিকে শুধু বটগাছ বললে নিতান্তই ভুল হবে কারণ এ গাছ ঘিরে জমা রয়েছে শত বছরের স্মৃতি।

জনশ্রুতি রয়েছে, এক সময় এই বটগাছে পীর, ফকির, সন্নাসীরা নিয়মিত বসতো। অনেক সময় তারা এখানে রাত্রিও যাপন করেছে। পাশাপাশি করা হতো পূজা-অর্চনা। গাছের ডালপালা কাটলে ক্ষতি হতো- এ ভয়ে গাছের ডালপালা কাটতে যেত না কেউ। এমনকি ভয়ে কেউ গাছের পাতাও ধরত না। সেই ভয়ে এখনো গাছের ডালপালা কেউ কাটে না।

স্থানীয়রা জানান, আখাউড়া-ধরখার সড়কের গঙ্গাসাগর এলাকায় বিশাল এলাকাজুড়ে গঙ্গাসাগর দিঘী অবস্থিত। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা বীর বিক্রম ঈশ্বরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর তৎকালীন সময়ে কর আদায় করতে আসতেন কুমিল্লায়। তখন এ অঞ্চলে পানীয় জলের সুব্যবস্থা ছিল না। তখন খনন করা হলো বিশাল এই দীঘি। গঙ্গাসাগরের পূর্বনাম ছিল রাজদরগঞ্জ বাজার। তখন এ বাজারে ত্রিপুরা রাজ্যের ভাটি অঞ্চলের খাজনা আদায়ের মহল অফিসও করা হয়। তখন এ বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ জমজমাট থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনের বেশ সমাগম ছিল। এই দিঘীটির সংলগ্নে রাস্তার পাাশেই রয়েছে এই বটগাছটি।  

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আখাউড়া-ধরখার সড়কের গঙ্গাসাগর রেলগেট সংলগ্ন রাস্তার উত্তর পাশে বিশাল জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটগাছ। এক পাশে রয়েছে বাজার, আরেক পাশে কাচারি ঘর, পুকুর ও মসজিদসহ প্রাচীন স্থাপনা। বটগাছটির শাখা-প্রশাখা আর শিকড়-বাকড়ে ছেয়ে আছে বিশাল জায়গাজুড়ে।  গাছের চারদিক থেকে অন্তত ১৫টি বিশাল আকাড়ের ডালপালা রয়েছে। আসা-যাওয়ার পথে সবার নজর কাড়ছে এই গাছটি।

স্থানীয় আশা মিয়া বলেন, আমার বয়স ৮০ বছর চলছে। আমি ছোট থেকে এই গাছটি যেমন দেখেছি আজও তেমন আছে। আমার বাবা-চাচার কাছ থেকে শুনেছি এই গাছটির বয়স কম করে হলেও দুইশ বছর হবে। এক সময় এখানে কোনো রাস্তাঘাট ছিল না। গঙ্গাসাগরে তৎকালীন সময়ে ভারতের রাজার কাচারি ঘর ছিল। এখানে তারা খাজনা আদায় করতো। ফলে এখানে গড়ে উঠেছিল বিশাল হাট-বাজার। বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসতো। এই গাছের নিচে এসে বসতো। তাছাড়া অনেক পীর, ফকির ও সন্নাসীরা রাত্রি যাপন করতো। হিন্দুরা পুজা-অর্চনা করতে দেখা গেছে। তখন সন্ধ্যার পর এখানে সাধারণ মানুষের চলাচল খুবই কম ছিল।

কালের সাক্ষী শতবর্ষী বটগাছ

গণমাধ্যমকর্মী শেখ মো. নিজাম বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের মুখে এ গাছটির নানান গল্প শুনেছি। এতো বড় গাছ সহসায় দেখা যায় না। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন এই গাছের ছায়ার নিচে বসে থাকেন। বর্তমানে এই বিস্তৃত বটগাছটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে যে কাউকে।

মোগড়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও ব্যবসায়ী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, কাচারী সংলগ্ন রাস্তার পাশে থাকা বটগাছটি সুপ্রাচীন। আমি ছোটবেলা থেকে বটগাছটির এমন আকার-আকৃতি দেখে আসছি। গঙ্গাসাগরে তৎকালীন সময়ে সপ্তাহে দুইদিন হাট বসতো। অনেক লোকের সমাগম ঘটতো। দূর-দূরান্ত থেকে এখানে কেনাবেচা করতে আসতেন মানুষজন। তখন এই গাছের নিচে অনেকে বসতেন। তবে আমার বয়সে দেখিনি কেউকে গাছের ডালা কাটতে।

চিকিৎসক মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমি এখানে ২০ বছরের বেশি ধরে আছি। লোকমুখে শুনেছি গাছটির বয়স ২ দুইশ বছরের বেশি। তাছাড়া গঙ্গাসাগর বাজারে আরো বেশ কয়েকটি পুরোনো বটগাছ রয়েছে। বটগাছের উপকারিতা ব্যাপক এবং এইসব বটগাছ সংরক্ষণ আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।

কৃষক আবু  মিয়া বলেন, প্রচন্ড গরমের সময়ও গাছের নিচের অংশ ঠান্ডা থাকে। পথিক ও কৃষকরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে করে গাছের তলায় বসে বিশ্রাম নেয়। কিন্তু কেউ বলতে পারছে না এর জন্মলগ্নের সঠিক ইতিহাস। এই বটগাছ এখানে নিজস্ব ইতিহাস বহন করে দাঁড়িয়ে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুলাইমান মিয়া বলেন, বাপ-দাদার কাছে শুনেছি এই বটগাছটি খুবই পুরাতন। আমার বয়স প্রায় ৭০ চলছে। ছোটবেলা থেকেই একই অবস্থায় গাছটি দেখছি। লোকমুখে শুনেছি গাছের ডালপালা কাটা যায় না। কেউ কাটলে তার ক্ষতি হয়। এই ভয়ে কেউ গাছের পাতাও ধরে না।

মোগড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মতিন বলেন, মোগড়া বাজারে বেশ কয়েকটি প্রাচীন বটগাছ রয়েছে। এরমধ্যে এটি অন্যতম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সুশীতল ছায়া দান, পশু-পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বটগাছটি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণ করা সকলের দায়িত্ব।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!