ঢাকা,  শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

কদর বাড়ছে অরুণের হাতের তৈরি মুড়ি 

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া 
প্রকাশিত: ১৫:৩৪, ২৮ মার্চ ২০২৩
কদর বাড়ছে অরুণের হাতের তৈরি মুড়ি 
কদর বাড়ছে অরুণের হাতের তৈরি মুড়ি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পবিত্র মাহে রমজান শুরু হয়েছে। রমজান মাসে শুরু থেকেই বেড়ে যায় মুড়ির চাহিদা। ইফতারে রকমারি উপাদানের মধ্যে ছোট বড় সবার কাছে মুড়ির কদর রয়েছে অন্য রকম। এরমধ্যে হাতের তৈরি মুড়ির কদর ও রয়েছে বেশ। তবে মেশিনে ভাজা মুড়ি সহজে পাওয়া গেলেও হাতের তৈরি ভাজা মুড়ি সুস্বাদু হওয়ার এর কদর এখনও কমেনি। সারা বছরই সর্বত্র কমবেশি হাতের তৈরির মুড়ির চাহিদা আছে। 

এদিকে রমজান আসায় হাতে মুড়ি তৈরির কারিগররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। এরমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের রাধানগর এলাকায় অরুণ সাহা নামে একজন রয়েছে। তিনি প্রায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে নিজের হাতের তৈরি করা মুড়ি ভেজে নিজেই আবার বিক্রি করছেন। 

তবে এ পাড়াসহ অন্য জায়গাতে অনেক পরিবারের লোকজন হাতের মুড়ি তৈরির কাজে জড়িত থাকলেও বর্তমানে তারা নানা প্রতিকূলতায় মুড়ি তৈরি কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি এ পেশা আজো ধরে রেখে জীবিকা নির্বাহ করছেন।  

রমজান শুরুর আগ থেকে তার হাতের তৈরির মুড়ির চাহিদা আগের চাইতে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি দিন রাত কাজ করে চাহিদা পূরণে চেষ্টা করছেন। 

এদিকে তার হাতের তৈরি মুড়ি পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ী তার কাছ থেকে ক্রয় করে বিক্রি করছেন। স্থানীয় বাজারে হাতের ভাজা প্রতি কেজি মুড়ি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা। তার এখানে বিক্রি হচ্ছে ১শ টাকায়। অরুণ সাহা ওই এলাকার  হরিষন সাহার ছেলে। 

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মাটির চুলায় লোহার কড়াইয়ের মধ্যে কোনো রকম রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াই দেশীয় পদ্ধতিতে লবণ পানি আর বালু দিয়ে নারীরা ঘাম ঝড়ানো পরিশ্রম করে মুড়ি তৈরি করছেন। এক চুলায় চলছে শুকনো বালু গরম করা, অপর চুলায় চলে হালকা করে চাল ভাজার কাজ। নারিকেল পাতার শলা দিয়ে নাড়াচাড়ার পর ভাজা চাল হালকা হলদে-বাদামি বর্ণের হলে উত্তপ্ত বালুর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়। এরপর কড়াই নাড়াচাড়া দিতেই পট পট শব্দে ফুটে সাদা মুড়ি। 

অরুণ সাহা জানান, ছোট থেকেই জীবিকার প্রয়োজনে তিনি মুড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত হয়ে আছেন। পরিবারের সদস্যরা এ কাজে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন। 

হাতে ভাজা মুড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগ করা হয় না। শুধু চালে সামান্য লবণ পানি মিশিয়ে তা ভেজে গরম বালুতে ছেড়ে দেয়া হয়। 

বর্তমানে তার এখানে ৩ জন নারী শ্রমিকসহ পরিবারের সদস্যরা এ কাজ করছেন। সারা বছরই স্থানীয়ভাবে এ মুড়ির চাহিদা থাকলেও  শ্রমিকের অভাবে চাহিদানুযায়ী মুড়ি তৈরি করতে পারছেন না। 

তিনি আরো জানান, রমজান ছাড়া দৈনিক ৩০ কেজি চালের মুড়ি ভাজা হয়। মুড়ি ভেজে স্থানীয় দোকান ও পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি চাল কেনা হয় ৬৫ টাকায়। প্রতিদিন একজন গড়ে ৩০ কেজি চাল ভাজতে পারে। তার হাতের তৈরি মুড়ি ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। 

অরুণ সাহা বলেন, অন্য কোনো কাজের সুযোগ না থাকায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি এ পেশা ধরে রেখেছেন। পরিবারে স্ত্রী ও ২ মেয়ে রয়েছে।
 
নারী শ্রমিক সবিতা রানী সুত্রধর জানান, ৭ বছর ধরে এখানে মুড়ি তৈরির কাজ করছেন। মূলত কাজের ওপর নির্ভর হয়ে থাকে তাদের মজুরি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত করছেন এ কাজ। এখানে মেশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। তবে রমজান মাস এলে তাদের কাজের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
 
ক্রেতা হাবিবুর রহমান বলেন, আসলে সব সময় চেষ্টা করি দেশীয় হাতের তৈরি মুড়ি খাওয়ার জন্য। এখনতো সব জায়গাতে পাওয়া যায় না। অনেক খোঁজ নিয়ে এখানে আসা। গত কয়েক মাস ধরে এখান থেকে মুড়ি ক্রয় করছেন বলে জানায়।
 
গৃহিণী আসমা আক্তার জানান, হাতের তৈরি মুড়ি সুস্বাধু হওয়ায় এখান থেকে সব সময় মুড়ি ক্রয় করে নেন। রমজান মাস আসায় এক সঙ্গে ৩ কেজি দেশীয় হাতের তৈরি মুড়ি কেনা হয়েছে।
  
মো. রফিকুল ইসলাম জানান, এক সময় পাড়া মহল্লায় দেশীয় পদ্ধতিতে হাতের তৈরির মুড়ি ভাজতো। এখন আর ওই সব নেই বললেই চলে। তবে একটি পরিবার দীর্ঘ বছর ধরে হাতের তৈরি মুড়ি ভেজে বিক্রয় করে আসছেন। রমজান শুরু হওয়ায় এখান থেকে এক সঙ্গে ৩ কেজি মুড়ি ক্রয় করা হয়েছে।

মো. ফারুক মিয়া বলেন, বাজারে অনেক দোকান খোঁজে হাতের ভাজা মুড়ি পাইনি। লোকমুখে শুনে এখান থেকে মুড়ি কেনা হয়েছে। প্রতি কেজি বিক্রি করেছে ১শ টাকায়।
 
ব্যবসায়ী মনোরঞ্জন দাস জানান, রমজান মাস ছাড়াও তার এখানে হাতের তৈরি মুড়ির ভালো চাহিদা রয়েছে। 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার হিমেল খান বলেন, হাতের তৈরি মুড়ির চাইতে মেশিনে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি, দামও কম। এক সময় ঘরে ঘরে মুড়ি ভেজে খাওয়ার প্রচলন থাকলেও তা এখন নেই। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মুড়ি পাওয়া গেলেও হাতের তৈরির ভাজা মুড়ির কদরই অন্য রকম। তবে পরামর্শ থাকবে মেশিনে ভাজা মুড়ি না খাওয়া ভালো।   

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: আখাউড়া
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!