চুরির অপবাদ দিয়ে ৪ কিশোরকে গাছে বেঁধে নির্যাতন
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় স্বর্ণ চুরির অপবাদ দিয়ে চার কিশোরকে আম গাছে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার রাতে উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর উপসী কমলাপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় ওই তরুণদের পক্ষে আলী আকবর সরদার নামে এক অভিভাবক বাদী হয়ে আজ রোববার বিকেলে নড়িয়া থানায় উপজেলার কমলাপুর উত্তর উপসী এলাকার ইলেক্ট্রিশিয়ান সেলিম ছৈয়াল, হৃদয় ছৈয়াল, কাবিল ছৈয়াল, আশিক ছৈয়াল, সাব্বির ছৈয়াল ও মৃদুল ছৈয়ালের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
নির্যাতনের শিকার চারজন হলেন উপজেলার উপসী কলেজ রোড এলাকার শাহীন সরদার, সাইফুল মোল্লা, সাইদুল কাজী ও ছাব্বির হাওলাদার। তবে হৃদয় শেখ নামের এক কিশোরকে নির্যাতনের শিকার হয়নি। তারা সবাই রাজমিস্ত্রীর কাজ করে।
জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উত্তর উপসী কমলাপুর এলাকার সেলিম ছৈয়ালদের নারকেল গাছে পাঁচ কিশোর নারকেল চুরি করতে যায়। এ সময় কয়েকটি টর্চ লাইট দেখে তরুণরা পালাতে চেষ্টা করে। এ সময় চার কিশোরকে আটক করে সেলিম ছৈয়াল ও তার লোকজন। সেলিম ছৈয়ালের ঘরের সামনে একটি আম গাছের সঙ্গে তাদের রশ্মি দিয়ে পিঠমোড়া বাঁধ দেয়। পরে তাদের সেলিম, আশিক, হৃদয় ছৈয়াল, কাবিলরা মিলে লাঠি দিয়ে বেধড়ক প্রহার করে এবং কিল-ঘুষি মারে। তবে হৃদয় শেখকে পরে আটক করে তারা। এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে এলাকার ২০০-২৫০ জন মানুষের উপস্থিতিতে স্থানীয় মাতাব্বররা দরবার সালিশ বসিয়ে ওই পাঁচ কিশোর প্রত্যেককে ১২ হাজার টাকা করে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। তবে নগদ ১২ হাজার টাকা দিয়ে সাইদুল ছৈয়ালকে ছাড়িয়ে নেয় তার পরিবার। আর অন্য চারজন পরিবারকে বাকি টাকা পরিশোধ করতে আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। তাই মাতব্বররা সাদা স্ট্যাম্পে চারপরিবারের স্বাক্ষর নিয়েছেন। তরুণদের কাজ থেকে একটি নারকেল পেলেও কোনো স্বর্ণ পাওয়া যায়নি। ওই কিশোরদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার শাহীন সরদার বলে, আমরা পাঁচজন প্রতিবেশী দাদির গাছের নারকেল পাড়তে ওঠি। তখন দেখি কয়েকটি টর্চ লাইট জ্বলছে। তাই আমরা গাছের থেকে নেমে যাই এবং পাশের সবুজ ভাইয়ের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। পরে আমাদের ধরে নেয়া হয়। নিয়ে আমাদের চারজনকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ইচ্ছেমতো লাঠি দিয়ে পেটায় ও কিল-ঘুষি মারে। আমরা গাছ থেকে নারকেল পেরেছি, কিন্তু স্বর্ণ চুরি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।
নির্যাতনের শিকার সাইদুল কাজীর মা সাহিদা বেগম বলেন, ছেলেকে মারছে শুনতে পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। গিয়ে দেখি আমার ছেলেসহ চারজনকে পিঠমোড়া বাঁধ দিয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে। পরে পাঁচজনকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ছেলেকে বাঁচাতে নগদ ১২ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনি। আমাদের সামাজিকভাবে হেয় করেছে সেলিমরা। তাই বিচার পেতে থানায় অভিযোগ করেছি।
অভিযুক্ত সেলিম ছৈয়ালের স্ত্রী জাহানারা বেগম নির্যাতনের কথা শিকার করে বলেন, আমার ছেলের বউয়ের ব্যাগ জানালার পাশে ছিল। আর ব্যাগে কানের দুল, পায়ের নুপুর ও দুই হাজার টাকা ছিল। সেই ব্যাগ চুরি হয়। তাই স্বর্ণ চুরির দায়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে ওই পাঁচজনকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিভাবকরা টাকা দিতে শিকার করেছে। জরিমানার টাকা এখনো পাইনি।
স্থানীয় মাতাব্বর মিয়া চান ছৈয়াল বলেন, গিয়ে দেখি চার কিশোরকে একটি গাছের সঙ্গে গোল করে বেঁধে রাখা হয়েছে। উপস্থিত সবাইকে বলেছি ওদের অভিভাবকদের খবর দেন। পরে একজনকে একপাশে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তোরা কি করেছিস। সে বলে নারকেল খাওয়ার জন্য আসছি। তারপর কি হয়েছে বলতে পারে না বলে জানান মিয়া চান।
নড়িয়া থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, চুরির অভিযোগে চার কিশোরকে মারধর করা হয়। কিন্তু তারা পাঁচজন ছিল। এ ঘটনায় সেলিম ছৈয়াল, হৃদয় ছৈয়াল, কাবিল ছৈয়াল, আশিক ছৈয়াল, সাব্বির ছৈয়াল ও মৃদুল ছৈয়ালের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করছি। প্রকৃতপক্ষে তাদের ওপর কোনো অন্যায় করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।