ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

সিলেট-ঢাকার ‘রাজ-সিমরান’, স্টেশনের প্রেম হার মানাবে সিনেমাকেও!

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:৫২, ১৩ নভেম্বর ২০২২
সিলেট-ঢাকার ‘রাজ-সিমরান’, স্টেশনের প্রেম হার মানাবে সিনেমাকেও!
ছবি: সংগৃহীত

৯০ শতকে বলিউডের চলচ্চিত্র ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ দেখেননি এমন সিনেমাপ্রেমী দর্শক খোঁজে পাওয়া মুশকিল। সিনেমার সেই দৃশ্য আজও সবার চোখের সামনে ভেসে উঠে। সিনেমার সেই দৃশগুলোকে আবার নতুন মোড়কে জীবন্ত করলেন সিলেট-ঢাকার ‘রাজ-সিমরান’। তাদের প্রেমকাহিনী শাহরুখ খান ও কাজলের সিনেমাকেও হার মানাবে!

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমির হামজা ও ফাতেমা নামের দম্পতির বিয়ের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। তারপর ছবির পেছনের গল্প উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে।

ছবি: সংগৃহীত

বলিউডের সিনেমায় নায়ক শাহরুখ খান তথা রাজ হলেও বাংলাদেশের বাস্তব গল্পের নায়ক সিলেটের আমির হামজা। আর সিমরানের বাস্তব চরিত্রে রয়েছেন ঢাকার মেয়ে ফাতেমা তুজ জোহরা। ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’ সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো দুজনের প্রেমের বাঁধন শুরু হয় রেলস্টেশনে।

২০১৮ সালে একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল আমির-ফাতেমার। পরিচয়ের কয়েক দিন পর ফাতেমা জানতে পারেন, আমির আত্মহত্যা করবেন।

বিষয়টি ভারী অদ্ভুত লেগেছিল ফাতেমার। যার সঙ্গে তার পরিচয় হলো আর সেই পরিচয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই জানতে পারলেন, সেই ব্যক্তি আত্মহত্যা করতে চাইছেন! কৌতূহলবশত আমিরের সঙ্গে যোগাযোগ আরো বাড়ান ফাতেমা। সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে এমন নানা সমস্যার সমাধান করেছেন ফাতেমা। তাই আমিরের আত্মহত্যার কারণ জানতে ফাতেমা যোগাযোগ বাড়িয়ে দেন।

ফাতেমা বলেন, আমিরের সঙ্গে একটি মেয়ের ভালবাসার সম্পর্ক ছিল বলে জানতে পেরেছিলাম। তারপর তাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। মেয়েটি অন্য একটি ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এটা মানতে পারেননি আমির। তারপর আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন আমির। ঘটনাটি শোনার পর আমিরকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করি। তাকে বোঝাতে হবে, আত্মহত্যাই সব কিছু নয়।

ছবি: সংগৃহীতফাতেমা বলেন, এক সময় আমির ধীরে ধীরে আমার উপর ভরসা করতে শুরু করেন। একদিন তো বলেই বসলেন, আমাকে ভালবেসে ফেলেছেন। বিয়ে করতে চান। সেই থেকে প্রেমের পথ চলা শুরু। 

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন ফাতেমা। পরে চাকরি সূত্রে যান সিলেটে। থাকতেন শমশেরনগরে মামার বাড়িতে। কাজ শেষে রাতের ট্রেনে বাড়িতে ফিরতেন।

অফিস থেকে সিলেট স্টেশনে আসা, ফাতেমাকে ট্রেনে তুলে দেওয়া, সব সময়েই তার সঙ্গী ছিলেন আমির। ধীরে ধীরে সিলেট স্টেশনই হয়ে উঠেছিল তাদের প্রেমের আশ্রয়স্থল। তাদের বেশির ভাগ কথাই হতো সিলেট স্টেশনে।

ট্রেনে আমির আগে চড়তেন। তারপর ফাতেমাকে হাত ধরে ট্রেনে তুলে দিয়ে নেমে পড়তেন। দীর্ঘদিন এটাই ছিল তাদের দু’জনের রুটিন। ততদিনে আমিরও ফাতেমার অফিসে কাজ জুটিয়ে নেন।

ফাতেমা বলেন, গল্প করতে করতে সময়ে শেষ হত টের পেতাম না। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, রাত ৯টার ট্রেনের টিকিট কাটা রয়েছে। গল্প করার জন্য সেই টিকিট বাতিল করে আবার ১০টার টিকিট কেটেছি।

ছবি: সংগৃহীত

ফাতেমা আরো জানান, প্রতিদিনই রেলের গার্ড, চালক দেখতেন এক তরুণ এবং তরুণী শেষ মুহূর্তে ট্রেন ধরার জন্য ছুটছেন। ফলে তারা দু’জনেই রেলকর্মীদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেন। 

প্রেমের সম্পর্ক মধুর হলেও বিয়ের প্রসঙ্গ আসতে আমিরের বাড়ির লোক বেঁকে বসেন। ফাতেমা সিলেটি নন, তাই বিয়ে করা যাবে না, এমনটাই জানিয়ে দেন আমিরের বাড়ির সদস্যরা। তবে তার মা এ বিয়েতে মত দেন। কিন্তু আমির-ফাতেমা স্থির করেন, তারা বিয়ে করবেন। তাই ২০২০ সালে ঢাকায় ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে গোপনে বিয়ে করেন।

বিয়ের একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেন ফাতেমা। বিষয়টি জানাজানি হতে আর এক দফা ঝামেলা শুরু হয়। যদিও দুই পরিবারের মতেই সামাজিকভাবে আমির-ফাতেমার বিয়ে হয়েছিল।

ফাতেমা বলেন, সামাজিকভাবে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর সিলেট স্টেশনে ফটোশুট করতে দু’জনে ছুটে গিয়েছিলাম। যেভাবে ট্রেন ধরতাম, যেভাবে আমির আমাকে ট্রেনে তুলে দিত, সেই দৃশ্য রিক্রিয়েট করে ছবি তুলিয়েছিলাম বর-কনের সাজে।

ছবি: সংগৃহীত

দু’বছর আগের পুরনো সেই ছবি ভাইরাল হতে তা নজরে পড়ে ফাতেমার। তিনি বলেন, নেটমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বেশ চর্চা হচ্ছিল। কারণ এটি একটি ভাললাগার মতো বিষয়। কিন্তু ছবিটি যে এভাবে ভাইরাল হবে তিনি ভাবতে পারেননি। ফাতেমা এখন পুরোদমে সংসার করছেন। বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দেন। তবে ফাতেমার ভাললাগার একটা অন্য বিষয়ও রয়েছে। যে মানুষটি তার জীবনসঙ্গী, সেই মানুষটি তাঁকে সব সময় বলেন, তোমার জন্যই আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।

সবশেষে ফাতেমা বলেন, এক দিন স্টেশনে বসেই আমিরের প্রাক্তন প্রেমিকাকে ফোন করেছিলাম। চেয়েছিলাম, ওরা দু’জন এক হোক। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে সব মিলিয়ে আমরা দু’জনে ভালই আছি। দু’জন দু’জনকে আপনি বলেই সম্বোধন করি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকেএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!