হত্যাকাণ্ডের আগে ইউপি কার্যালয়ে যেভাবে অবরুদ্ধ ছিলেন জুয়েল
সুলতান যোবাইয়ের আব্দার নামে একজন সঙ্গীসহ বৃহস্পতিবার বিকেলে বুড়িমারী বেড়াতে আসেন শহিদুন্নবী জুয়েল। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা। এরপরই জুয়েলকে জীবন্ত পুড়িয়ে লাশ ভস্মীভূত করার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনাকে বীভৎস ও মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে আখ্যা দিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই জুয়েলের পায়ে পড়ে যায়। এ সময় জুয়েল বইগুলো তুলে চুম্বনও করেন।
আরো পড়ুন: ভারসাম্যহীন শিক্ষককে পুড়িয়ে মারল আমজনতা, পিতৃহারা হলো শিশুটি
এ সময় জুয়েল অসংলগ্ন কথাবার্তা বলায় খাদেম জাবেদ আলী মসজিদের পাশে থাকা ডেকোরেটর দোকানের মালিক হোসেন আলীকে ডেকে আনেন। মসজিদের খাদেমের কথা শুনে হোসেন আলী জুয়েলকে মারধর শুরু করেন। এরপর তাদের ইউপি কার্যালয়ের একটি ঘরে আটকে রাখা হয়।
অপরদিকে জাবেদ আলী ও ডেকোরেটর দোকানদার হোসেন আলী প্রচার করতে থাকেন তারা পবিত্র কোরআন অবমাননা করেছেন। মুহূর্তের মধ্যে একথা ছড়িয়ে পড়লে জুয়েলের শার্টের কলার ধরে মারতে মারতে জাবেদ আলী ও হোসেন আলীকে নিয়ে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে যান স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলাম। তারা জুয়েলকে সেখানেও মারধর করেন।
আরো পড়ুন: পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলা সেই ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে
খবর পেয়ে বুড়িমারীতে অবস্থানরত পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান বাবুল, ইউএনও কামরুন্নাহার বেগম এবং পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন কুমার মোহন্ত ঘটনাস্থলে গিয়ে জুয়েল ও তার বন্ধুকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তারা বিক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়েন।
পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। পরে উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদের গেট ও দরজা ভেঙে জুয়েলকে গণপিটুনি দিতে দিতে বাইরে নিয়ে আসে। একপর্যায়ে তার মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেই উত্তপ্ত আগুনে জুয়েলকে নিক্ষেপ করে। ফলে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে দগ্ধ হয়ে তিনি মারা যান।
আরো পড়ুন: লালমনিরহাটে যুবককে পিটিয়ে হত্যার পর আগুনে পোড়ানো হলো লাশ
এরপরও বিক্ষুব্ধ জনতা তার পুরো শরীর জ্বলে অঙ্গার না হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এর মধ্যে কয়েকজন পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করলে, জনতার ধাওয়া খেয়ে পুলিশ ও ওসি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।
প্রায় দুই ঘণ্টার আগুনে জুয়েলের শরীর ভস্মীভূত হয়। পরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে জুয়েলের ২-৩টি হাড় ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমনিরহাটের ডিসি আবু জাফর ও এসপি আবিদা সুলতানা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনে। নিহত জুয়েলের সঙ্গী সুলতান যোবাইয়েরকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ।