ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

সংসারের হাল ধরতে ডিম বিক্রি করছে এইচএসসি পরীক্ষার্থী

পাবনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৬:৪৫, ২৫ আগস্ট ২০২০
সংসারের হাল ধরতে ডিম বিক্রি করছে এইচএসসি পরীক্ষার্থী
ডিম বিক্রি করছে রায়হান আলী (ছবি: সংগৃহীত)

বয়সের ছাপ এখনো পড়েনি। হালকা পাতলা গড়নের ছিপছিপে ফর্সা ও লম্বা রায়হান। ইচ্ছে ছিল ক্রিকেটার হবে। সেই লক্ষ্যে চালিয়ে যাচ্ছিল নিজের পড়াশোনা। কিন্তু হঠাৎ করে মাস ছয়েক আগে না ফেরার দেশে চলে যান তার বাবা। এরপর অন্ধকার নেমে আসে পরিবারে। 

রায়হান বলে, আব্বা (বাবা)  হঠাৎ করে মারা যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছি অভাব কী। ঘরে খাবার নেই। দুই বোন আর মাকে নিয়ে যখন না খেয়ে থাকা শুরু হলো, যেন কারো মুখের দিকে তাকানো যায় না। তখন নিজের কথা ভুলে গিয়েছিলাম, ছোট দুই বোনের কথা বলার ধরণ তাদের করুণ চাহনি দেখে নিজের স্বাদ-আহ্লাদ ভুলে নামতে হয়েছে রোজগারের পথে। আর কয়েকদিন পর হয়তো এইচএসসি পরীক্ষা। কিন্তু সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে থাকলে সংসারটি কে দেখবে?

আরো পড়ুন: চোখের সামনে মাকে ১৮ আঘাতে খুন, পাশে পড়েছিল শিশুর লাশও

ঈশ্বরদী-পাবনা মহাসড়কের ঈশ্বরদী শহরের রেলওয়ের লেবেল ক্রসিং রেলগেট এলাকায় রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে ঝুপড়ি একটি দোকানের ভেতর বসে সিদ্ধ ডিম বিক্রি করতে করতে কথাগুলো সে।  

রায়হান জানে না শেষ পর্যন্ত সে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা? কারণ পরীক্ষা শুরু হলে তার দোকানটি বন্ধ থাকবে। দোকান বন্ধ থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যাবে। সংসারটা চলবে কিভাবে।  

ভাগ্যবিড়ম্বিত রায়হান আলী পাবনার ঈশ্বরদী পৌর এলাকার পূর্বটেংরী মহল্লার মসলেম উদ্দিনের বড় ছেলে। গৃহিণী মা রেহেনা বেগম ও দুই বোনকে নিয়ে সংসার তার। থাকে অন্যের বাসা ভাড়া করে। মেধাবী শিক্ষার্থী রায়হান, ২০২০ সালে ঈশ্বরদী সরকারি অনার্স কলেজ থেকে, এইচএসসি পরীক্ষায় (বাণিজ্য বিভাগ) অংশগ্রহণ করবে।

তার কথা বলার ধরণ আর করুণ চাহনি দেখে বোঝা যায়, পরিবারের কথা ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত চলে আসে রায়হানের। ছোট্ট দোকান, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাস্তায় দাঁড়ানো বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের মুখের দিক তাকিয়ে থাকে সে। দোকানে কেউ এসে দাঁড়াতেই, ছলছল চোখে বলে ওঠে, আধা সিদ্ধ না কোয়ার্টার। দেশি মুরগি নাকি হাঁস!

 ডিম বিক্রি করছে রায়হান আলী (ছবি: সংগৃহীত)রায়হান আক্ষেপ করে বলে, সংসারে প্রচণ্ড অভাব। তার মধ্যে প্রায় ছয় মাস হতে চললো আব্বা মারা গেছেন। তাই অভাবের তাড়নায় বাড়ির বড় ছেলে বলেই কাজে আসতে বাধ্য হয়েছি। সঙ্গে চলছে নিজের লেখাপড়া, কিন্তু কতদিন লেখাপড়া হবে জানি না।

সে জানায়, বোনের মধ্যে বড়টা নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছে। আর ছোট বোন স্হানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। রয়েছে নিজের পড়াশোনা এবং পরিবারের খরচ। সবই আসে ডিম বিক্রির টাকা থেকে। প্রতিদিন আয় প্রায় দুই থেকে আড়াইশো টাকা। একদিন ডিম বিক্রি করতে না এলে হাড়িতে ভাত চড়ে না। পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজ করি। তবে শীতের সময়ই ডিম বিক্রি বেশি হয়। লাভও বেশি হয় বলে জানায় রায়হান।

আরো পড়ুন: আমড়ার ভরা মৌসুমেও ভালো নেই চাষিরা  

সে জানায়, বাবা এই ব্যবসাটা করতো। মাস ছয়েক আগে হঠাৎ করে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকেই।  

হঠাৎ করে মুখের কোনে এক চিলতে হাসি দিয়ে রায়হান বলেন, ইচ্ছে ছিল ভালো ক্রিকেটার হবো। যেন গর্ব করেই বলে উঠলো, লেখাপড়ার পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে অনেক ভালো খেলতাম আমি। ভালো খেলাধুলা করে অনেক পুরস্কারও পেয়েছি ছোটবেলা থেকে। এখন আর সে স্বপ্ন আর দেখি না। নিজের জন্য তো আর কিছু হলো না। এখন শুধু স্বপ্ন দেখি ছোট দুটি বোনকে নিয়ে। তারা দুজনে মানুষ হবে। তাহলে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!