পড়ে না যাওয়া পর্যন্ত নাচ, ড্যান্স ম্যানিয়ার রহস্যময় ঘটনা
পৃথিবীর অনেক ঘটনাই আছে যার সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এসব রহস্যময় ঘটনা সম্পর্কে সকলের মাঝেই কৌতূহল সৃষ্টি হয়। তেমনই একটি রহস্যময় ঘটনা হলো ড্যান্স ম্যানিয়া। এর ফলে দলে দলে মানুষ ক্রমাগত নাচতে থাকতো। অদ্ভুত এই ড্যান্স ম্যানিয়া নিয়েই এই লেখা।
ড্যান্স ম্যানিয়া এক ধরনের নৃত্যের উন্মাদনাকে বোঝায়। ১৪ থেকে ১৭ শতকের মধ্যে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাবে দেখা দিয়েছিল। এতে আক্রান্তরা ততক্ষণ পর্যন্ত নাচতেন যতক্ষণ না ক্লান্তির কারণে তারা পড়ে যেতেন। এমনকি অনেকে নাচতে নাচতে স্ট্রোকে মারাও যেতেন। ড্যান্স ম্যানিয়ার প্রাদুর্ভাবে এক সঙ্গে হাজার হাজার মানুষও নাচতেন। ঘণ্টা, দিন এমনকি আরো বেশি সময়েও তারা ক্রমাগত নাচতে থাকতেন।
আধুনিক অনেক বর্ণনায় ড্যান্স ম্যানিয়ায় শিকারদের প্রায়ই নারী হিসাবে চিত্রিত করা হয়। তবে মধ্যযুগীয় বিবরণগুলো থেকে জানা যায় যে, পুরুষ, মহিলা এমনকি শিশুরাও সমানভাবে এর প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার কয়েক দশক পরে ১৩৭৪ সালের ২৪শে জুন জার্মানির আচেনে এর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল।
কেন মানুষ ডান্স ম্যানিয়ায় আক্রান্ত হতো? এমন সবার মনেই জাগবে। প্রাথমিকভাবে অনেকেই মনে করতেন যে, এটি একজন সাধুর অভিশাপের কারণে হয়েছিল। সাধারণত সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট বা সেন্ট ভিটাস বলে মনে করা হয়, তাই ডান্স ম্যানিয়া সেন্ট ভিটাস ড্যান্স নামেও পরিচিত নাম। এ কারণে, নাচের উন্মাদনায় ভুগছেন এমন লোকেরা মুক্তির জন্য প্রার্থনা করার জন্য সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্টকে উৎসর্গীকৃত স্থানে যেতেন।
সেন্ট ভিটাসের সাথে এই ঘটনার যোগসূত্রটি ১২৭৮ সালে জার্মানিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে শনাক্ত করা যেতে পারে। সেই বছর, ২০০ জনের একটি দল মাস নদীর (Maas River) উপর একটি সেতুতে এত জোরে নাচছিল যে সেতুটি ভেঙে পড়ে, এতে অনেকের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদের সেন্ট ভিটাসের কাছে নিবেদিত একটি চ্যাপেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে অনেকেই সুস্থ হয়।
মজার ব্যাপার হল, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, তবে মধ্যযুগীয় ইউরোপ জুড়ে অসংখ্যবার এমন ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী তিন শতাব্দীতে ইতালি, লুক্সেমবার্গ, ফ্রান্স, জার্মানি, হল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এই ঘটনাটি ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কয়েকটি হাইপোথিসিস সামনে রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সেন্ট জনস ড্যান্সের সাথে যে হ্যালুসিনেশন এবং খিঁচুনি হয়েছিল তার জন্য কেউ কেউ এরগট (ergot) নামক একপ্রকার ছত্রাকের বিষক্রিয়াকে দায়ী করেছেন।
এরগট বিষক্রিয়ার এই রূপটি বন্যা এবং ক্রমাগত আর্দ্র ঋতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ স্যাঁতসেঁতে অবস্থা ক্ল্যাভিসেপ পুরপুরা (claviceps purpura) ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত ছিল। ছত্রাকটিতে বিষাক্ত ও সাইকোঅ্যাকটিভ রাসায়নিক রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে লাইসারজিক অ্যাসিড এবং এরগোটামিন। এটি সাধারণত রাইয়ের মতো চাষ করা শস্যে পাওয়া যায়। ছত্রাকটি সেন্ট জনস ড্যান্সের কিছু লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে যার মধ্যে স্নায়বিক খিঁচুনি, মানসিক বিভ্রান্তির মতো কিছু লক্ষণ রয়েছে।
তবে ড্যান্স ম্যানিয়ার প্রাদুর্ভাব সাধারণত বন্যার সময় বা আর্দ্র ঋতুতে ঘটেনি। এছাড়া ড্যান্স ম্যানিয়ার সব উপসর্গের জন্য এরগটকে দায়ী করা যায় না।
সেন্ট জনস ড্যান্সের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, এতে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তারা ব্ল্যাক ডেথের পরের বছরগুলোতে ঐশ্বরিক অনুগ্রহ লাভের জন্য ইউরোপ জুড়ে তীর্থযাত্রা করেছিল বলে পরিচিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা সংখ্যায় বাড়তে থাকে। যেহেতু তারা দীর্ঘক্ষণ নাচ, উপবাস এবং আবেগপূর্ণ উপাসনার সাথে জড়িত ছিল, তাই তাদের মধ্যে হ্যালুসিনেটিং, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপার মতো লক্ষণগুলো ছিল।
অনেকে মনে করেন, সেন্ট জনস ড্যান্সের কিছু অংশগ্রহণকারী প্রকৃতপক্ষে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এছাড়া এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছে যে, ড্যান্স ম্যানিয়ায় আক্রান্তদের বেশিরভাগই উল্লিখিত উপসর্গগুলোর কোনটিতেই ভোগেননি। সে কারণে এটিকে মানসিক ব্যাধির রূপ হিসাবে দেখার পরিবর্তে একটি সামাজিক ঘটনা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। কখনো কখনো এটিকে ‘গণ মানসিক অসুস্থতা’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
এই ধরনের সামাজিক ঘটনা, অসুস্থতা বা অনুরূপ শারীরিক উপসর্গগুলোর ঘটনাকে জড়িত করে। কোনো অজ্ঞাত কারণ ছাড়াই, যা সামাজিক প্রভাবের একটি রূপ হিসাবে মানুষের একটি বৃহৎ গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে। সম্ভবত এটি পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে যে, সেন্ট জনস ড্যান্স ম্যানিয়ায় জড়িতদের মধ্যে কেউ কেউ ভয়ের কারণে এটি করেছিল, অন্যরা ভিড়ের সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য নাচ করেছিল। ড্যান্স ম্যানিয়াকে গণ হিস্টিরিয়ার একটি রূপ বলে মনে করেন অনেকে।
সূত্র- অ্যানসিয়েন্ট অরিজিন