ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ সাতরং ]

সেকালের পালকির ইতিকথা

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৬, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১
সেকালের পালকির ইতিকথা
পালকি। ছবি : সংগৃহীত

পালকি চলে! পালকি চলে!
গগন - তলে আগুন জ্বলে।
স্তব্ধ গায়ে আদুল হায়ে
যাচ্ছে কারা রৌদ্র সারা!

এমন ছন্দ রয়েছে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘পালকির গান’ কবিতায়। এ কবিতায় প্রধান আলোচ্য বিষয়টি পালকি। আধুনিককালে সেই পালকির ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবুও সীমিত আকারে ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহ অনুষ্ঠান, তীর্থযাত্রা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে ব্যবহার করতে দেখা যায় পালকি। এই পালকি নিয়ে ব্রিটিশ আমলের বেশ অনেক স্মৃতি জমা রয়েছে। তখনকার বই-পত্র, চিঠি ইত্যাদি অনেক যায়গায় পালকির প্রশংসনীয় আলোচনা করেছেন ব্রিটিশরা।

পালকি এক ধরনের বিলাসবহুল যানবাহন যাতে সাধারণত ধনিকগোষ্ঠী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে থাকে। চাকাবিহীন যানবাহন হওয়ায় কয়েকজন ব্যক্তি ঘাড়ে বহন করে পালকিকে ঝুলন্ত অবস্থায় বহন করে। যিনি পালকির ভার বহন করেন, তিনি পালকি বেহারা নামে অভিহিত। প্রথমদিকে দেব-দেবীকে আরোহণ কিংবা দেবমূর্তি বহনের উদ্দেশ্যে এরূপ যানবাহন তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীকালে এতে করে মুখ্যত ইউরোপীয় উচ্চ শ্রেণির সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও ভদ্রমহিলাগণ চলাফেরা করতেন। ভারতীয় উপমহাদেশে রেলগাড়ি প্রবর্তনের আগ পর্যন্ত পালকি ছিল বেশ জনপ্রিয়। 

প্রাচীন রোমে লেটিকা, চীনে জিয়াও, ভিয়েতনামে কিউ, ইংল্যান্ডে সিড্যান চেয়ার, স্পেনে লিটারা, ফ্রান্সে পালানকুইন, পর্তুগালে লিটেইরা, থাইল্যান্ডে ওহ, কোরিয়ায় গামা, জাপানে নোরিমোনো, তুরস্কে টাহটিরেভান ইত্যাদি নামে পালকি পরিচিত হয়ে আসছে।

পালকি। ছবি : সংগৃহীত

অনেক আগের কথা। তখনও কলকাতা ‘কলকাতা’ হয়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ রাজের কাজে ভারতে এসে তার অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন অগাস্টাস ক্লিভল্যান্ড লিখেছিলেন তার প্রথম পালকি সফরের কথা। ‘কাঠের তৈরি ছোট্ট খাঁচার মত ঘর। দু’পাশে দন্ড। জনা কয়েক পালোয়ান চেহারার পুরুষ সেই যান বয়ে নিয়ে যায়। নাম তার পালকি।’
পালকির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন অনকে ব্রিটিস সাহেবরা। তাদের বৈকালিক ভ্রমণের সঙ্গী ছাড়াও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সব কাজের সঙ্গী হতো পালকি। অফিস করে বাড়ি ফেরায় ভরসা ছিল পালকিই। পালকি নিয়ে আদিখ্যেতার অন্ত ছিল না তাদের।

বিখ্যাত ইউরোপিয়ান সাহিত্যিক স্যামুয়েল জনসনের দেওয়া ডাকের পালকির বর্ণনা অনুয়ায়ী, তীর্থভ্রমণের প্রতি এশীয়দের দুর্বলতা টের পেতে সময় লাগেনি সাগরপারের শাসকদের। অতএব, পোস্টঅফিসগুলোতে ব্যবস্থা করা হলো ডাক-পালকির। কেউ তীর্থভ্রমণে যাবেন কিংবা অন্য কোনো কাজে - ডাক-পালকিতে খবর দিলেই কেল্লা ফতে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির দোরগোড়ায় হাজির হয়ে যেত সরকারি ডাক-পালকি।

পালকি। ছবি : সংগৃহীত

অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকের কথা। কলকাতা থেকে কাশীর ডাক পালকির ভাড়া তখন ৫০০ টাকা। আর মাঝপথে নেমে গেলে মাইল প্রতি এক টাকা দুই আনা কিংবা ক্রোশ প্রতি দুই টাকা চার আনা গুনতে হতো।

তখন এক ধরণের পালকি ছিল,যার নাম ‘মহনা’ বা ‘মিয়ানা’। এই পালকি ছিল যেন ছোটোখাটো বিছানার মতো। পালকির ভেতরে বিছানা-বালিশ সবই মজুত ছিল। শুয়ে শুয়ে যেতেও যাত্রীদের খুব একটা অসুবিধা হতো না। এই পালকি ছিল বিলাসিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে।

বাংলার কারিগররাই শুধু জানতেন মিয়ানা তৈরির কৌশল। কলকাতার বিদেশি কোচ মেকাররা বাংলার কারিগরদের কাছ থেকে শিখে নেন সেই বিদ্যা। নেটিভ রাজা-মহারাজাদের কাছে বিলাসবহুল মিয়ানার চাহিদা তখন আকাশছোঁয়া। তখন মিয়ানা বিক্রি করে বিদেশি কোম্পানিগুলো মুনাফা লুটেছিল ভালোই।

পালকি থেকে উপার্জনের পাশাপাশি পালকির পিছনে বিপুল পরিমান খরচ করতেও পিছুপা হতেন না সাহেবরা। আজকের সমাজে যেমন দেখা মেলে প্রাইভেট কারের, সেসময় ঠিক এমনই অনেকেই প্রাইভেট পালকি রাখতেন।  

কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জর্জ ডব্লিউ জনসন কলকাতায় এসেছিলেন ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে। মাত্র তিন বছর ছিলেন কলকাতায়। প্রাইভেট পালকির প্রতি ইউরোপীয়দের পক্ষপাতিত্ব জনসনের নজর এড়ায়নি। তার মতে, প্রতিদিন ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকলে এই বাহুল্য থেকে দূরে থাকাই ভালো। পালকি পোষার হাঙ্গামা তো আর কম নয়, এ দিকে শহরে ঠিকা পালকিরও অভাব নেই। প্রয়োজনে ডেকে পাঠালেই হল। পাঁচ মিনিটেই বাড়ির দোরগোড়ায় হাজির।

পালকি। ছবি : সংগৃহীত

এদিকে পালকি প্রেমের অন্ত নেই, ওদিকে পালকির ভেতর বসার প্রাচ্য ভঙ্গিটি আর কিছুতেই সাহেবদের রপ্ত হয় না। এই বসা নিয়ে আবার সাতকাণ্ড রামায়ণ করেছিলেন তারা। প্রথমদিকে পর্তুগীজদের মনে হতো পালকি মেয়েলি বাহন। পরে অবশ্য সেই মেয়েলি বাহনই পর্তুগিজ পুরুষদের পছন্দের বাহন হয়ে উঠেছিল। আসলে,বাঙালিরা যেভাবে বসে, তা অনুকরণ করতে গিয়ে সাহেবরা বুঝতে পেরেছিলেন, কাজটি বড়ো সহজ নয়। তবে যতোই অসুবিধা হোক, বাহনটিকে মানিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চলতেই থাকে। তারা বুঝে ফেলেন যে বাহনটিকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ডাক-পালকি, প্রাইভেট পালকি, ঠিকা পালকি, মিয়ানা যাই হোক তা মুগ্ধ করে সাহেবদের। শুধু পালকিই নয়,পালকি বেহারারাও মুগ্ধ করেছিল তাদের।
অনেক আগের কথা, দিল্লির সিংহাসনে তখন বাদশাহ জাহাঙ্গীর। সেই সময় ভারতে এসেছিলেন ইতালিয়ান পর্যটক পিয়েত্রো দেলা ভাল্লে। তিনি সুরকার, সংগীততাত্ত্বিক এবং লেখক হিসেবেও বিখ্যাত। পিয়েত্রোর মনে জায়গা করে নিয়েছিল পালকি। বেহারাদের প্রশংসা করে বলেছিলেন: ‘The men who bear such satisfied with a very small reward.’

অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকেই ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী বালসাজার এসেছিলেন কলকাতায়। তিনি পালকি সম্বন্ধে অনেক কিছুই লিখে গেছেন। লিখেছেন, পালকির গড়নটা বড় ভালো। চারজন বেহারা বয়ে নিয়ে যায় এই পালকি। এদের আগে আগে চলে হরকরা আর পেয়াদার দল। বেহারারা মাইলের পর মাইল পাড়ি দেয়, অথচ ভেতরে বসে বোঝার উপায় নেই যে, কারো ঘাড়ে চেপে যেতে হচ্ছে। চলতে চলতে ওরা কখন যে ঘাড় বদল করে, যাত্রীরা টেরই পায় না। আবার, চলতে চলতেই কী সুন্দর গান গায়, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে। মাইলের পর মাইল হাঁটলেও তারা ক্লান্তিহীন। যেন এই পথ চলাতেই আনন্দ।

গ্রন্থঋণঃ
সাহেবসুবোর পালকিপ্রীতি, জয়তা দাস, গাঙচিল পত্রিকা, ২০১৭

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!