ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ সাতরং ]

পোভেগ্লিয়া আইল্যান্ড : অপরূপ একটি মৃত্যুপুরী

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৪, ১৩ ডিসেম্বর ২০২১
পোভেগ্লিয়া আইল্যান্ড : অপরূপ একটি মৃত্যুপুরী
প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত পোভেগ্লিয়া আইল্যান্ড। ছবি : সংগৃহীত

অপরূপ মায়াবী এক দ্বীপ। নীল জলরাশির মধ্যেই এক সবুজ ভূখণ্ড। প্রথম দেখাতেই চোখ জুড়াতে বাধ্য। মনে হবে, এ যেন কোনো কল্পনার রাজ্য। কিন্তু এ দ্বীপটি ভয়ঙ্কর দ্বীপ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। দ্বীপটির নাম পোভেগ্লিয়া আইল্যান্ড। চর দিকে জলবেষ্টিত এই দ্বীপটির একটু মধ্যে এগিয়ে গেলেই সৌন্দর্যের বদলে আপনার নজর কাড়বে এর ভয়ার্ত আর্তনাদ। এখানে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে আতঙ্ক আর ভয়। কিভাবে এই দ্বীপটি সবার কাছে অভিশপ্ত হয়ে উঠল?

ইতালির ভেনিস এবং লিডো অঞ্চলের মধ্যে অবস্থান ছোট্ট দ্বীপ পোভেগ্লিয়ার। লেগুন সেইন্ট মার্ক্স স্কয়ারে অবস্থিত এই দ্বীপ ‘পোভেগ্লিয়া ভেনিস’ হিসেবেও পরিচিত। এই দ্বীপে রয়েছে মাত্র ১৭ একর জায়গা। যার পুরোটা জুড়েই রয়েছে নানা ভৌতিক কাহিনী।

প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত পোভেগ্লিয়া আইল্যান্ডে ৪২১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে। তখন থেকেই দ্বীপে ছিল না কোনো শাসকদের কড়াকড়ি। করের বোঝা বা আইন আদালতের ঝামেলাও তেমন একটা ছিল না। ফলে বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে দ্বীপের অধিবাসীরা সুখে, শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। নবম শতকের দিকে দ্বীপের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে বাড়তে থাকে দ্বীপের গুরুত্বও। এই সময়টায় দ্বীপটি ছিল পোদেস্টা শাসকদের অধীনে।

দ্বীপের দখলকে কেন্দ্র করে ভেনেটিয়ানস ও জেনোইসদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ছবি : সংগৃহীত

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের কারণেই এই দ্বীপ দখল নিতে চায় একাধিক শাসক গোষ্ঠী। এ নিয়ে চতুর্দশ শতকে ভেনেটিয়ানস ও জেনোইসদের মধ্যে বাঁধে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে দ্বীপের বাসিন্দারা অশ্রুজল মুছতে মুছতে দ্বীপ ত্যাগ করে। সেদিনের যুদ্ধে জয়ী হয় ভেনেটিয়ানস সরকার। তবে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় প্রচুর কামান ও গুলি। সেই গোলাগুলির শব্দ আজও রাতের অন্ধকারে দ্বীপটিতে প্রতিধ্বনিত হয়।

দ্বীপটি জনশুন্য হয়ে পড়ে। ভেনিস সরকার ক্যামান্ডলিসের সন্ন্যাসীদের এই দ্বীপে থাকার প্রস্তাব জানায়। তবে সন্ন্যাসীরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরে দ্বীপটির চারপাশে পাঁচটি অষ্টভুজাকৃতির খাল নির্মাণ করা হয়। দ্বীপের প্রবেশদ্বারকে সৈন্য দিয়ে রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করা শুরু হয়।

অষ্টাদশ শতকে দ্বীপটিতে একটি অস্থায়ী বন্দর নির্মাণ করা হয়। তখন এটি ব্যবহার হতে থাকে জাহাজ বন্দর হিসেবে। দ্বীপটি বিভিন্ন দেশের জাহাজের মালপত্র ওঠা-নামার জন্য ব্যবহার হতে থাকে। এরপর থেকেই সূচিত হতে থাকে দ্বীপটির অভিশপ্ততার গল্প।

জাহাজ থেকে মালামাল উঠানামার জন্য দ্বীপে তৈরি করা হয় অস্থায়ী বন্দর। ছবি : সংগৃহীত

১৩৪৮ সালটি পোভেগ্লিয়া দ্বীপের জন্য এক আতঙ্কের বছর।  কারণ এ সময় দ্বীপের নোঙর ফেলা দুইটি জাহাজে বিউবোনিক প্লেগ দেখা দেয় এবং এই রোগে আক্রান্ত দুইজন মারা যায়। কিন্তু এখানে কাজ করা শ্রমিক ও অতিথিদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়নি। এতে প্লেগের মহামারী আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। শয়ে শয়ে মানুষ মারা যেতে থাকে। চিকিৎসা করেও লাভ কোনো লাভ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত বন্দরটি সিল করে দেওয়া হয়। জনশুন্য হয়ে পড়ে পভেগ্লিয়া।

পরবর্তীতে ইতালির বিভিন্ন শহরে প্লেগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্লেগ রোগে আক্রান্তদের ওই জনমানবশূন্য দ্বীপে পাঠানো হত। রোগীরা মৃত্যুর প্রহরের অপেক্ষা করতেন সেই নির্জন দ্বীপে। ফলে এই দ্বীপটি ক্রমান্বয়ে পরিণত হয় সংক্রামিত রোগীর নির্বাসন কেন্দ্রে।

ক্রমেই বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যায। এতে দিশেহারা হয়ে ওঠে উদ্বিগ্ন ইটালি সরকার। সরকারি এক নির্মম নির্দেশে ওই দ্বীপে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিলে এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ। সেই থেকে মৃত মানুষের হাজারো কঙ্কাল ছড়িয়ে পড়ে দ্বীপের চারপাশে। মৃত মানুষের কঙ্কালে ভরে উঠে পভেগ্লিয়া দ্বীপ। এরপর থেকে মৃত্যুপুরী বা Island of Dead নামেই পরিচিতি পেতে থাকে পভেগ্লিয়া। এত মানুষকে একসঙ্গে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্মম ঘটনা দ্বীপটিকে রহস্যময় করে তোলে। অনেকেরই বিশ্বাস করতে থাকেন, মারা যাওয়া সেই মানুষগুলোর অতৃপ্ত আত্মাই ঘুরে ফেরে এই দ্বীপে।

প্লেগের মহামারীতে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় পভেগ্লিয়া দ্বীপ। ছবি : সংগৃহীত

বিংশ শতাব্দীতে এসে দ্বীপটিতে আবার জাহাজ খালাসের ব্যবস্থা করা হলেও দ্বীপটি আগের মতো আর জমে ওঠেনি। ১৯২২ সালে ইটালি সরকার ওই এলাকায় একটি মানসিক হাসপাতাল গড়ে তোলে। কিন্তু খুব বেশিদিন সেই হাসপাতাল চালু রাখা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসক, সেবিকা ও অন্যান্য কর্মরত লোকজন চাকুরি করতে চাইতেন না। কিছুদিন কাজ করার পরেই তারা হাসপাতাল ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতেন।

কয়েকজন চিকিৎসক এবং সেবিকাদের কথায় জানা যায়, তারা প্রতিনিয়ত অদৃশ্য কারো অনুভূতি পেতেন। প্রতিমুহূর্ত চাপা আতঙ্ক ও ভয় কাজ করত তাদের মনে। এ ধরনের ভৌতিক পরিবেশে কাজ করতে তারা নারাজ ছিলেন। এ ছাড়াও হাসপাতালে থাকা রোগীরা সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়তে থাকে।

স্থানীয় লোকমুখে শোনা যায়, প্লেগে মৃতদের অতৃপ্ত আত্মা এখনো দ্বীপে ঘুরে বেড়ায়। তাদের দীর্ঘশ্বাস আজও ধ্বনিত হয়। অনেকের বিশ্বাস, এসব আত্মা অন্যের আধিপত্য মেনে নিতে পারে না।

পভেগ্লিয়া দ্বীপে তৈরি হওয়া মানসিক হাসপাতাল। ছবি : সংগৃহীত

জানা গেছে ‌ওই হাসপাতালের পরিচালক হাসপাতালেরই ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এতে লোকের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়। ফলে দ্বীপে হাসপাতালটি দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব হয়নি। ১৯৬৮ সালের পর দ্বীপের এই মানসিক হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয় ইটালি সরকার। ফলে জনশূন্য দ্বীপটি আরো রোমহর্ষক গল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

লোকশুন্য এই দ্বীপটি পর্যটকদের জন্যও বন্ধ হয়ে যায়। দ্বীপটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও একজন মার্কিন উপস্থাপক দ্বীপটিতে ভ্রমণে আসেন। তিনি মার্কিন টেলিভিশনের জন্য দ্বীপটি আর নিষিদ্ধ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে একটি রোমাঞ্চকর সিরিজ তৈরি করেন। যেখানে তিনি তুলে ধরেন দ্বীপের নানা ভয়ঙ্কর ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা।

এখন নির্জন দ্বীপটিতে রয়েছে কেবলমাত্র একটি মঠ ও গোয়াল ঘর। আর রয়েছে অদৃশ্য অতৃপ্ত আত্মারা। এই দ্বীপে আর কোনো জাহাজ নোঙর ফেলে না। ইটালির ট্যুরিজম কর্তৃপক্ষ এই দ্বীপে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এখনো জারি রেখেছে। যদি কেউ এই দ্বীপে ভ্রমণে যেতে ইচ্ছা পোষণ করেন, তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। তা এক বিশাল প্রস্তুতির ব্যাপার।

মৃত মানুষের কঙ্কালে ভরে উঠে পভেগ্লিয়া দ্বীপ। ছবি : সংগৃহীত

আজও দ্বীপে পরিত্যক্ত হাসপাতালটির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত সব ভয়ের গল্প। শতাব্দীর অগণিত মানুষের জমে থাকা কান্না সর্বক্ষণ প্রতিধ্বনিত হয় নির্জন, নিঃশব্দ পোভেগ্লিয়া দ্বীপের চারপাশে। জঙ্গলে, রাস্তায়, এখানে-সেখানে পড়ে রয়েছে মৃত মানুষের কঙ্কাল বা টুকরো টুকরো হাড়গোড়। রাতে দ্বীপের দিকে তাকাতেই বুক কেঁপে ওঠে পোড় খাওয়া জাহাজের ক্যাপ্টেনেরও। সবারই মনে ভয় জাগায় একটি প্রশ্ন-আসলে এখানে এখন কারা থাকে? মৃত্যুর দ্বীপ হাতছানি দিয়ে ডাকে সবাইকে। মৃত্যুর ইচ্ছা নিয়ে কেউ কেউ যায় সেই আত্মাদের দেখা পেতে। হয়তো সেই অতৃপ্ত আত্মাদের সান্নিধ্যে চিরদিনের মতো শান্তি মেলে নতুন আত্মাদেরও।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!