কোথায় গেল সিঁধেল চোর?
একদা সিঁধেল চোরদের গল্প ছিল মানুষের মুখে মুখে। সিঁধ কেটে চুরি করা ছিল রীতিমত একটি শিল্পকর্ম। তবে এখন তার ছিটেফোঁটাও পাওয়া না। সেইসব সময় চলে গিয়েছে, যখন চুরি ছিল রোমাঞ্চকর একটি ঘটনা। শুধু পেটের খিদেতে না, তখন চুরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত মনের খিদেও। আর সেকারণেই বিভিন্ন সময়ে চৌর্যবৃত্তি হয়ে উঠত শিল্প-সাহিত্যের রসদ। সাহিত্যে, সিনেমায়, টেলিভিশনে বারবার নজর কেড়েছে ‘সিঁধেল চোর’।
‘সিঁধেল চোর’ হল সিঁধকাঠি দিয়ে সিঁধ কেটে চুরি করে এমন চোর। এটা সবচেয়ে কঠিন এবং সূক্ষ চুরিবিদ্যা। অনেক দিন ধরে ভক্তি সহকারে একজন গুরুর কছে এ বিদ্যা অর্জন করতে হয়। খুবই বুদ্ধিমত্তার কাজ। চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা, কথাটা তো আর এমনি এমনি আসেনি। চুরিবিদ্যা দশ মহাবিদ্যার অন্তর্গত অন্যতম এক বৃত্তি। সাহস এবং শিল্প দুটোই খুব বেশি পরিমান লাগে এই কাজে।
সিঁধ (সংস্কৃত ভাষায় সন্ধি) কাটা আবার যেমন তেমন ব্যাপার নয়। খন্তায় করে ধীরে ধীরে শুরু করতে হবে মাটি কাটা-অত্যন্ত নরম হাতের কাজ। সঙ্গী লোক দু-হাতে অঞ্জলি পেতে সিঁধের নিচে ধরে থাকবে। মাটি যা পড়বে সব হাতের উপর। সঙ্গে হাড়ি থাকলে ভাল। হাত ভর্তি মাটি হাড়িতে করে ফেলে আসতে হবে দূরে। সিঁধ কেটে দেয়াল একেবারেই ফাঁক করতে নেই, কিছু বাকি রেখে দিতে হয়। মুরুব্বিদের অভিমত হল মাটির দেয়াল হলে চার-পাঁচ ইঞ্চির মতো, ইটের গাঁথনি হলে একখানা ইট বাকি রেখে দেবে।
উৎকৃষ্ট সিঁধেল চোর হতে দেহের মাপজোক সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা চাই, যাতে সিঁধের মধ্যে দিয়ে নিজের পুরো শরীর নিয়ে যাওয়া যায়। সিঁধকাঠি ছাড়াও সঙ্গে রাখতে হবে সুতো। সুতোর অনেক কাজ। হয়তো দরজায় খিল দেওয়া আছে- সুতোর মাথায় বড়শি গেঁথে তা নামানো লাগতে পারে।
সিঁধ কেটে প্রথমে পাততে হয় কান। নিশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝে নিতে হয় অন্দরের বাসিন্দাদের গতিবিধি। ব্যাপারটা এককথায় অসাধারণ। যদি মনে হয় কেউ হাল্কা জেগে আছে তার জন্য আছে ঘুমপাড়ানি মন্ত্র,যাকে চলতি ভাষায় বলে ‘নিদালী মন্ত্র’, বেদের কালে একে বলা হতো ‘অবস্বপনিকা’। এই মন্ত্রে হাল্কা ঘুম গভীর হয়, আর জেগে থাকা মানুষ ঘুমে অচেতন হয়ে যায়।
মন্ত্র চলতি ভাষায় এমন শুনতে:
‘নিদ্রাউলি নিদ্রাউলি,নাকের শোয়াসে তুললাম মঞ্চপের ধূলি
ঘরে ঘুমোয় কুকুর-বিড়ালি
জলে ঘুমায় বউ,
নিদালি-মন্তোরের গুণে
ঘুমাইয়া এক গিরস্তর বেটা-বউ।’
রয়েছে হরেক রকমের গাছ-গুল্ম। ঘরে ঢুকে কিছু পাতা যে খাটে গৃহস্বামীর শুয়ে আছে তার খাটের তলায় রেখে আগুন ধরিয়ে দাও। আগুনটা নিভিয়ে দিলে ধোঁয়া বের হবে। ধোঁয়া নাকের ভিতর গেলে সমস্ত শরীর আচ্ছন্ন হয়ে আসবে। আরও আছে-সেই পাতার বিড়ি থাকবে চোরের মুখে। একদিকে চলবে নিপুণ হাতের কাজ, অন্যদিকে কান থাকবে মক্কেলের নিঃশ্বাস ওঠা-নামার উপর। উসখুস শুনলেই বিড়িতে টান দিয়ে পরিমাণ মতো ধোঁয়া ছাড়বে নাকে।
সিঁধ কাটা আর ভিতরে ঢোকার আগে ভেতরে কেউ জেগে বসে আছে কিনা বোঝার জন্য ছিল নকল মানুষ প্রবেশ করানোর রীতি। এর নাম প্রতিপুরুষ। ঘরে ঢুকে প্রথম কাজ দরজা খুলে রাখা, যাতে পালাতে কোনো অসুবিধা না হয়। আর পুরনো দরজা খুলতে গিয়ে যদি শব্দ হয়? তারও উপায় আছে– দরজার জোড়গুলো জল দিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া।
ঘরে ঢুকে অন্ধকারে মালের হদিশ পাবার উপায়? এর জন্য ছিল এক রকমের শেকড়। বাক্স পেঁটরায় শেকড় ঝুলিয়ে দিলে মালের হদিশ পাওয়া যায়। রয়েছে যোগবর্তিকা জ্বালানোর কথা, যা জ্বালিয়ে দিলে গৃহস্থের চোখে ধাঁধাঁ লাগবে, চোরকে দেখতে পাবে না। কিন্তু সেই আলোয় সব কিছু চোরের নজরে পড়বে।
তারাপদ রায় তার ‘কাণ্ডজ্ঞান’ বইতে লিখেছেন খাঁটি চোরেদের কথা। আসল ও আদি চোরেদের দুঃখের কথা। চোর দুই রকমের, এক পুরুষের নতুন চোর অথবা বংশানুক্রমে বনেদি চোর-বংশের সন্তান। এর মধ্যে নতুন চোরদের কষ্ট বেশি। সিঁধকাঠি দুর্লভ, যা দু-একটা গভীর রাতের অন্ধকারে কামারশালার পেছনের ঝোপে লুকিয়ে থেকে মশার কামড় খেয়ে কিনতে হয়। কিন্তু যাঁদের বাপ ঠাকুরদা চোর ছিলেন, তাঁরা উত্তরাধিকারসূত্রে সিঁধকাঠি পেতেন। পাকা ইঁটের দেওয়াল ফুটো করতে কাঁচা লোহার সিঁধকাঠির উপর নির্ভর করা যেত না।
সিঁধেল চোরদের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেছেন, এই ধরণের চোরেদের মূল সমস্যা হল দুটি। চুরি করার পোষাক ও সিঁধকাঠি।
এ ছাড়া গায়ে তেল মাখার একটা ব্যাপার ছিল। চুরি করার আগে শরীরের ওপরের অংশে ভালো করে তেল মেখে নিতে হত। তেলের আগে বিলিতি গ্রীজ মাখার চল ছিল। তারপর গ্রীজের চল উঠে গিয়ে তার জায়গায় আসে পোড়া মবিল-অয়েল। দাম বেশি, সাংঘাতিক কুটকুটে এবং বিষাক্ত। এই পোড়া মবিলের কারণে চর্মরোগের ডাক্তারদের বিশাল রমরমাও হয়েছিল। শৌখন বা বড়লোক চোরেরা একটু বেশি দাম দিয়ে হোয়াইট ভেসলিন মাখত। আগেকার দিনে চোরেরা কদমছাঁট দিত, যাদের চুল মুঠো করে ধরার মতো দৈর্ঘ্যের ছিল তারা চুলেও ভালো করে তেল মেখে চুরি করতে যেত।
এরপর জল গড়িয়েছে অনেক দূর। অধুনিকতার নিয়মে পৌঁছেছে আধুনিক চুরির রীতি। সেইসঙ্গে শেষ হয়েছে অরগ্যানিক এই চৌর্য নীতিও। এখন আর ততটা নেই সিঁধেল চুরি। সমাজ আজ অনেকটেই নিরাপদ। বেশ ভালো। তবে, কোথায় হাড়িয়ে গেল সেই সিঁধেল চোরগুলো? হয়ত ঠগ-জোচ্চোর এবং সাধুদের যুগে ক্রমে কুল-মান হারিয়েছে ‘গুণী’ সিঁধেল চোরেরা।