ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

আঙ্কেল টম: যিনি বদলে দিয়েছিলেন আমেরিকার ইতিহাস

সাত রঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩:৫৪, ৬ ডিসেম্বর ২০২১
আঙ্কেল টম: যিনি বদলে দিয়েছিলেন আমেরিকার ইতিহাস
আঙ্কেল টম: যিনি বদলে দিয়েছিলেন আমেরিকার ইতিহাস। ছবি: সংগৃহীত

আবহমানকালের সাহিত্যের ইতিহাসে কলম যে তরবারির থেকেও শক্তিশালী সে কথা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকের ইংরেজি অনুবাদ পাঠানো হলে নড়েচড়ে বসেন শ্বেতাঙ্গ ভাগ্যদেবতারা। এরপরই ভারতবর্ষে আইন বলবৎ করে বন্ধ করে দেয়া হয় নীলচাষ। এর ফলে হাজার হাজার গরিব নীলচাষি নীলকর সাহেবদের নির্মম অত্যাচার আর দাসত্ব থেকে মুক্তি পায়। 

এই ঘটনার বেশ কিছু সময় আগে মার্কিন লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টো লিখেছিলেন এক কালজয়ী উপন্যাস 'আঙ্কেল টম’স কেবিন'। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের লেলিহান আগুনে প্রেরণা যুগিয়েছিল এই বইটি। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লেখা এই বই বদলে দিয়েছিল আমেরিকার ইতিহাস । গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আব্রাহাম লিংকন একবার হ্যারিয়েটের সঙ্গে দেখা করেন। সেদিন বিস্ময় হয়ে তিনি বলেছিলেন, 'সো দিস ইস দ্য লিটল লেডি হু স্টার্টেড দিস গ্রেট ওয়ার।'

মার্কিন লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টো লিখেছিলেন এক কালজয়ী উপন্যাস `আঙ্কেল টম’স কেবিন`খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ সালে মেসোপটেমিয়ায় প্রথম ক্রীতদাস প্রথা চালু হয়। ক্রমশ তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকার মতো বিশাল দুটি মহাদেশের লাখ লাখ একর পতিত জমি চাষ করার মতো জনবল সেখানকার সামন্ত প্রভুদের ছিল না। ফলে সেইসব রুক্ষ কৃষিজমিতে শ্রম দানের জন্য আফ্রিকা থেকে লাখ লাখ কৃষ্ণাঙ্গের মানুষ ধরে আনা হলো। শুরু হলো 'ট্রান্স আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড'। সেখানকার দাস ব্যবসার প্রধান কেন্দ্রভূমি ছিল পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল, যার বিস্তার ছিল সেনেগাল থেকে অ্যাঙ্গোলা পর্যন্ত।

দাসদের হাটে গরু ছাগলদের মতো ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেনাবেচা করা হতো। তুলা, তামাক, আখ ও অন্যান্য ফসলের জমিতে তাদের অমানুষিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হতো। কথায় কথায় চলতো অত্যাচার। যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে তার জন্য গলায় আর পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হতো। ক্রীতদাসীদের দিয়ে বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম করানো হতো। সঙ্গে চলতো যৌন নির্যাতন। 

দাসদের হাটে গরু ছাগলদের মতো ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেনাবেচা করা হতোজাহাজে চালান করার সময় বহু দাসীর মৃত্যু ঘটতো। অনাহারে অর্ধাহারে অসুখে ও অত্যাচারে মারা যেতো বহু ক্রীতদাস। পালিয়েও রেহাই ছিল না, পলাতক দাসদের খুঁজে আনার জন্য শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা শিকারি কুকুর নিয়োগ করতো। উত্তর আমেরিকার থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় এই দাসপ্রথা ছিল আরও ভয়াবহ।

হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টোর জন্ম ১৮১১ সালে কানেকটিকাটের লিচফিল্ডে। তাঁর বাবা লাইম্যান বিচার একজন ক্যালভানিস্ট ধর্মযাজক। তিনিও ছিলেন দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে একজন বলিষ্ঠ প্রবক্তা। মা রোক্সানা বিচার ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এক মহিলা। অনেক ভাইবোনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা হ্যারিয়েট ছোটবেলা থেকেই বাবা মায়ের আদর্শকে সামনে রেখেই ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত করে তুলেছিলেন। তিনি আর তাঁর স্বামী রেভারেন্ড কেলভিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু দাসকে মুক্ত করে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

মার্কিন লেখক হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টোসারাজীবনে বিশটিরও বেশি বই লিখেছেন হ্যারিয়েট। তবে 'আঙ্কেল টম’স কেবিন' লিখে তিনি যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, পৃথিবীর মানবিকতার ইতিহাসে তা সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। প্রথম বছর বইটি যুক্তরাষ্ট্রে তিন লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। গ্রেট ব্রিটেনে বিক্রি হয়েছিল এক মিলিয়ন কপি। চল্লিশ বছর বয়সে লেখা এই বইটি প্রথমে 'ন্যাশনাল এরা' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। 

তারপর ১৮৫২ সালের ২০ মার্চ এটি বই হিসেবে প্রকাশ পায়। তার প্রায় দেড় দশক পরে আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে দাসপ্রথার অবসান ঘটান। উইলিয়াম বুথ নামের এক ঘাতক যখন লিংকনকে হত্যা করে, তখন তিনি একটি থিয়েটার হলে বসে ছিলেন। মৃত্যুর সময়ও তাঁর হাতে ছিল একটি উপন্যাস। আর সেই উপন্যাসটি হলো 'আঙ্কেল টম’স কেবিন'।

আব্রাহাম লিংকনএই উপন্যাসের ক্রীতদাস টম স্বপ্ন দেখেছিল এক শোষণমুক্ত সমাজের। যেখানে সবাই সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। যেখানে কোনো দাসপ্রথা থাকবে না। যেখানে মানুষ অর্থ ও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের চেয়ে নিজেকে বড় বলে মনে করবে না। একদা নাস্তিক কবি শেলিও এই স্বপ্ন দেখেছিলেন। 

এই উপন্যাসে একটি শিশুকন্যা রয়েছে, যার নাম ইভা । সে-ই প্রথম টমকে জানায় তার স্বপ্নের কথা। যে স্বপ্নে সে দেখে এক অত্যাচারমুক্ত সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। ইভার সেই স্বপ্নই আসলে হ্যারিয়েট তার বইয়ে তুলে ধরেছেন। আঙ্কেল টম'স কেবিন সেই শাশ্বত স্বপ্ন ও সম্ভাবনার উপন্যাস ৷ যার অন্য নাম 'লাইফ অ্যামং দ্য লোওলি'।

ইভা প্রথমে টমকে জানায় তার স্বপ্নের কথা১৮৪৯ সালে প্রকাশিত জোসিয়াহ হেনসন নামের একজন ক্রীতদাসের লেখা 'দ্য লাইফ অব জোসিয়াহ হেনসন' নামক আত্মজীবনীমূলক বই পড়েই হ্যারিয়েট এরকম একটি বই লেখার অনুপ্রেরণা পান। তিনি পাশাপাশি বহু নিগ্রো ক্রীতদাসদের সঙ্গে কথা বলে নিজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন। তাঁর উপন্যাসের আঙ্কেল টম কোনো ব্যক্তিচরিত্র নয়। সে এক নিপীড়িত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং এক অন্ধকার সময়ের প্রতীক।

টম প্রথমে ছিল কেন্টাকির এক ফার্মমালিক আর্থার শেলবির ক্রীতদাস। টাকার অভাবে শেলবি আর তার স্ত্রী এমিলি একদিন টমকে বিক্রি করে দেয়। সঙ্গে ক্রীতদাসী এলিজার ছেলে হ্যারিকেও। শেলবির ছেলে জর্জ টমকে ভীষণ ভালোবাসতো। সে চায় নি টমকে বিক্রি করা হোক। এলিজা ও হ্যারি রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। টম তাদের পালাতে সাহায্য করে।

জোসিয়াহ হেনসন নামের একজন ক্রীতদাসের লেখা `দ্য লাইফ অব জোসিয়াহ হেনসন` নামক আত্মজীবনীমূলক বইএরপর টমকে দাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সে মিসিসিপি নদীর স্রোতে ভেসে চলে যায় বহু দূরে। এবার তার মালিক হয় ক্লেয়ার নামে একজন। প্রভু হিসেবে ক্লেয়ার অতটা খারাপ ছিলেন না, আর তাঁরই ছোট্ট মেয়ের নাম ইভা। টমের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। অসুস্থ ইভা মৃত্যুর আগে আঙ্কেল টমকে জানায় তার স্বপ্নের কথা।  

সে স্বপ্ন দেখেছে এমন এক আশ্চর্য পৃথিবীর, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। সকলেই সমান এবং সেখানে শোষণ ও অত্যাচার বলে কিছু নেই। এই নিষ্পাপ মেয়েটির স্বপ্নই যেন এই বইয়ের মূল সুরা। ইভা যেন লেখিকা হ্যারিয়েটেরই সহচারী। ক্লেয়ারের মৃত্যুর পর বিপাকে পড়ে তার স্ত্রী টমকে বিক্রি করে দেয় সাইমন লেগ্রি নামে এক নিষ্ঠুর ব্যক্তির কাছে। সাইমন তাকে লুসিয়ানায় নিয়ে যায়। সেখানে আরও অনেক ক্রীতদাসের সঙ্গে দেখা হয় টমের। 

সাইমন চাইতো টম তার হয়ে অন্য দাসদের উপরে অত্যাচার করুকসাইমন চাইতো টম তার হয়ে অন্য দাসদের উপরে অত্যাচার করুক। কিন্তু সেই প্রস্তাবে রাজি হয় না সে। ফলে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সাইমন। সাইমন টমের ঈশ্বর বিশ্বাসকেও পছন্দ করতো না। স্বাভাবিকভাবেই অমানুষিক নিপীড়ন চলতো তার উপরে। সহক্রীতদাসদের বাঁচাতে বাইবেল পড়া বন্ধ করে দেয় সে। এমনকি গোপনে ক্যাসি ও ইমেলিন নামে দুজন ক্রীতদাসকে পালাতে সাহায্য করে। এই অভিযোগে সাইমন টমের উপরে ভয়ংকর নির্যাতন শুরু করে। আর শেষ পর্যন্ত টমকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়।

মৃত্যুর আগে সাইমন জানতে চায়, টম তাকে প্রভু বলে স্বীকার করে কিনা। মার খেতে খেতে মরে যাওয়ার আগেও টম জানায়, 'প্রভু একজনই, তিনি ঈশ্বর। সাইমন মালিক মাত্র, আর কিছু নয়।' এই অনমনীয় জেদ ও গভীর ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে মারা যায় টম। প্রথম মালিক শেলবির ছেলে জর্জ তখন একটু বড়, প্রিয় আঙ্কেল টমকে মুক্ত করার জন্য খুঁজতে খুঁজতে যখন সে ঘটনাস্থলে পৌঁছাই, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার প্রিয় আঙ্কেল টম আর বেঁচে নেই। এ কথা জানতে পেরে মর্মাহত জর্জ ফিরে গিয়ে বাড়ির সমস্ত ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেয়। 

সাইমন শেষ পর্যন্ত টমকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ আমেরিকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এই বইটি। কিন্তু কিছুদিন পর প্রেসিডেন্ট লিংকনের নেতৃত্বে সারা আমেরিকা জুড়েই একদিন কৃতদাস প্রথা রদ করা হয়। শুরু হয় নতুন পর্ব। ১৭০ বছর পরে 'আঙ্কেল টম’স কেবিন' আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আজও এই বই আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। আজও হ্যারিয়েট বিচার স্টো, সেই আশ্চর্য মেয়ে। আর তাঁর সেই বৈপ্লবিক কলম এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের কাছে স্মরণীয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!