ডিসেম্বর মাস এলেই এই সমাধিতে জ্বলে ওঠে আলো
সমাধিস্থল বা কবরস্থান সবার শেষ আশ্রয় হলেও জীবিত অবস্থায় এখানে যাওয়া মানেই সাহসের পরিচয় দেয়া। সাধারণত সন্ধ্যা হলেই চারদিকে ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। আর সমাধিস্থলে যেন একটু গাঢ়ই থাকে অন্ধকার। চারদিকে বিরাজ করে শুনশান স্তব্ধতা। পাতার শব্দও শোনায় নূপুরের ঝুমঝুম শব্দের মতো।
সাধারণত সমাধিস্থলগুলো অন্ধকারই থাকে। কিছু কিছু জায়গায় নিয়ন আলো থাকলে তা যেন অন্ধকারকে আরো খানিকটা গাঢ় করে ফেলে। তবে এর একেবারে উল্টো রূপ দেখতে পাবেন আইসল্যান্ডের এক সমাধিস্থলে। যেখানে সন্ধ্যা হলেই আলো ঝলমল করতে থাকে পুরো এলাকা। সমাধির ফলকগুলো জলজল করতে থাকে নানা রকম আলোয়। এটা কিন্তু সারা বছর হয় না। ডিসেম্বরের কয়েক সপ্তাহেই শুধু এমনটা দেখা যায়।
নাহ কোনো ভুতুড়ে কাণ্ড নয়। সেখানকার মানুষেরা রীতি অনুযায়ী এই কয়েকটা দিন সমাধিস্থলে আলো জ্বেলে উৎসবে মেতে ওঠে। ডিসেম্বরের কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোয় আলোয় সেজে ওঠে আইসল্যান্ডের সমাধিক্ষেত্র। বিশেষ করে রেজকাজিকের লাগাফেলস্কির্জা গির্জায়। হঠাৎ করে খ্রিস্টমাসের আগে-পরের সময়ে এইসব কবরস্থানে চলে গেলেও, বিন্দুমাত্র দুঃখের আভাস পাবেন না। বরং পাবেন উৎসবের আমেজ।
আরো পড়ুন: ধোঁয়া ওঠা মটকাতে চা খেয়েই তৃপ্ত বাঙালি
এর পেছনে রয়েছে এক কাহিনী, আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে শুরু হয়েছিল এই প্রথার। মনে করা হয় সময়টা ছিল ১৮৩৩ সাল। হোলাভাল্লার্গারদুর গির্জার সমাধিক্ষেত্রকে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল মোমের আলোয়। চারিদিক বরফে সাদায় সাদা। তার মধ্যে মাথা উঁচু করে রয়েছে ক্রস, সমাধিফলক। আর তার খাঁজে খাঁজেই মোমবাতি।
ধীরে ধীরে সেই রীতিই আইসল্যান্ডের অধিকাংশ জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। শতাব্দী পেরিয়ে এসেও আজ যা অমলিন। ইউলেটাইড মৌসুমে আলোর মাধ্যমে স্মৃতিফলক সাজানো আইসল্যান্ডের সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। জমায়েত হন পরিবারের লোকজন, আত্মীয়রা। মৃত প্রিয়জনদের প্রতি জানানো হয় শ্রদ্ধা। তবে বেদনায় ভেঙে পড়া নয় বরং এই দিনগুলোয় তাদের সঙ্গেই আনন্দ ভাগ করে নেন পরিবারের সদস্যরা।
আরো পড়ুন: স্ত্রীর হাত থেকে বাঁচতে নিজেকেই অপহরণ করেন এই ব্যক্তি
বছর পেরিয়ে শতাব্দী পার হয়েছে, এগিয়েছে প্রযুক্তিও। আর তাই রীতি মেনেই এখনো উৎসব চলছে তবে মোমের আলোয় নয় বৈদ্যুতিন বিভিন্ন আলোর সমারোহ সেখানে। আর সেই আলোতেই ঝলমল করে আইসল্যান্ডের সমাধিক্ষেত্রগুলো। হাজারো রঙ খেলা করে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় তুষারপাতের মধ্যে।
উত্তরমেরু ঘেঁষা আইসল্যান্ডে এমনিতেই দিনের দৈর্ঘ্য ছোট হয়। ডিসেম্বরের আরো ছোটো হয়ে আসে সময়সীমা। আর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর রাত জুড়েই চলতে থাকে এই আলোর খেলা। আইসল্যান্ডের এই অলৌকিক দৃশ্য দেখতেই প্রতিবছর হাজির হন হাজার হাজার পর্যটক। এমনকি শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য নিষিদ্ধ হয় গাড়ির পার্কিংও। আসলে এই দৃশ্য না দেখতে পাওয়ার মানে তো একটা দেশ, তার সংস্কৃতিকে চিনতে না পারা। তাই বিশেষ খ্রিস্টমাসের সময়ই পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে রহস্যময়ী আইসল্যান্ড।