হরিণের দুধ ও রক্ত খেয়েই বরফাঞ্চলে টিকে থাকে এই নৃগোষ্ঠি
পূর্ব আফ্রিকার জন্মভূমি ছেড়ে আদি মানুষেরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আনুমানিক ৮০ হাজার বছর আগে। এমনই মত নৃ-বিজ্ঞানীদের।
এরপর কালের পরিক্রমায় তাদের উত্তরসূরীরা দক্ষিণ মেরু ছাড়া পৃথিবীর আর সব স্থলভাগেই আধিপত্য বিস্তার করেছিল। মানুষ ছাড়া খুব কম সংখ্যক প্রজাতির প্রাণীই এভাবে পুরো বিশ্বজুড়ে বসতি স্থাপন করেছে।
তবে অনবদ্য এই অর্জনের জন্য আমাদের পূর্বসূরীদের প্রচুর পরিশ্রম, ভোগান্তি এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অতিক্রম করতে হয়েছে খরস্রোতা নদী, দুর্গম পর্বতমালা এবং উত্তাল মহাসাগরের মতো অনতিক্রম্য সব বাধা।
.png)
খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে বরফ জমা শীত এবং ফোস্কা ফেলার মতো উত্তপ্ত আবহাওয়ার সঙ্গে। বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই মানিয়ে নেবার সক্ষমতার এক অনুপম নিদর্শন রেখে চলেছে নেনেট নামক ঐতিহ্যবাহী একটি গোত্রের সদস্যরা।
সুমেরু বৃত্তের অন্তর্ভূক্ত উত্তর পশ্চিম রাশিয়ার তুন্দ্রাভূমিতে বসবাসকারী সেই নেনেট গোত্রের মানুষ সম্পর্কে আজ বিস্তারিত জানাবো। বিশ্ব মানচিত্রে নেনেট গোত্রের আবির্ভাব সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের এখন থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ফিরে যেতে হবে।
ওই সময় প্রায় ২০০০ বছর ধরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যার ফলে এখন থেকে প্রায় সাড়ে ৬০০০ বছর আগে সুচিত্রা এক সংক্ষিপ্ত বরফ যুগের প্রভাব থেকে পৃথিবীর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশের উত্তরাঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকায় জমাট বরফের পুরো স্থল গলে নিচের স্থলভাগ পুনরায় সূর্যের দেখা পায়। ফলে মানুষের জন্যই অঞ্চলটি নতুন করে শিকার চাষাবাদ এবং বসতি স্থাপনের উপযোগী হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির এই উপহারের সুবিধা নিতে উত্তর পূর্ব ইউরোপের কিছু এলাকা থেকে কয়েকটি গোত্র এই তুন্দ্রা এলাকায় বসতি স্থাপন করে। সেখানে অব এবং ইয়েনেসি নদীর অববাহিকায় বসতি স্থাপনকারী।
সেই অভিবাসীদের বংশধররাই বর্তমানে নেনেট হিসেবে পরিচিত। ২০০০ বছরের বেশি সময় ধরে এই মানুষগুলো বংশপরম্পরায় বহির্বৃত্ত এলাকায় বসবাস করছেন।
খ্রিষ্টাব্দ ত্রয়োদশ শতকে এই গোত্র জনপথগুলো, প্রথমে মঙ্গলীয় এবং পরে রুশসাম্রাজ্য প্রভাব বলয় প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। অবশ্য বছরের অধিকাংশ সময় শীতল আবহাওয়ার কারণে জনপদগুলো প্রাকৃতিক দূর্গের মতো সুরক্ষিত থাকে। ফলে মঙ্গলীয় এবং রুশদের সেই সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা খুব একটা সাফল্যের মুখ দেখেনি।
শেষ পর্যন্ত বিংশ শতকে ভারি আগ্নেয়াস্ত্রের সজ্জিত সোভিয়েত গোলন্তাজ বাহিনীর হামলার মুখে নিজেদের পরাধীন হিসেবে মেনে নিয়ে ছিলেন নেনেট গোত্রের সদস্যরা। সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে বিংশ শতকে প্রায় পুরোটা জুড়েই সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনেরও শিকার হয় নেনেটরা।
বংশপরম্পরায় রেইনডিয়ার জাতীয় হরিণ লালন পালনের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনকারী মানুষদের সেই পেশা ছেড়ে যৌথ-খামারে কৃষি কাজ বেছে নিতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে নেনেট গোত্রের কয়েক হাজার সদস্য আরো উত্তরে দুর্গম অরণ্যে চলে গিয়েছিলেন। এদের বংশধররা বর্তমানে ফরেস্ট নেনেট নামে পরিচিত।
আর যারা তুন্দ্রা এলাকায় থেকে গিয়েছিলেন, তাদের নাম দেয়া হয়েছিল তুন্দ্রা নেনেট। এই দুই উপগোত্রের সমাজ ব্যবস্থা এবং সংস্কৃতিতে অসংখ্য মিল থাকলেও, মনের ভাব প্রকাশে ব্যবহৃত ভাষা আলাদা হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার আদিবাসীদের রেইনডিয়ার ইউরোপীয় উপনিবেশিকদের হাতে যে ধ্বংসলীলা শিকার হয়েছিলেন, এই নেনেট রুশ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা প্রায় একই মাত্রায় নিপীড়ন সহ্য করে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার মতো রাশিয়ায় কখনো মত প্রকাশের স্বাধীনতা তেমন না থাকায় গণহত্যার এই বর্বর অধ্যায়টি বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের অজানাই রয়ে গেছে।
নেনেটদের জনপদগুলো গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থা অনুসরণ করে। সাধারণত এক একটি গোত্রের গড়ে ওঠে পাঁচ থেকে ১০টি পুরুষতান্ত্রিক পরিবারের সমন্বয়ে। এই পরিবারগুলো নিজেদের একজন আদি পিতার বংশধর হিসেবে দাবি করেন।
নেনেটদের ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই আদি পিতাকে দেবতুল্য সম্মান দেয় গোত্রের সদস্যরা। এর পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ এবং জীবজগতের সদস্যদের পবিত্র হিসেবে গণ্য করেন নেনেটরা।
প্রতিটি গোত্রে কমপক্ষে একজন সামান বা ওঝা থাকেন। যিনি প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করেন। এছাড়া শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্বের মতো প্রতিকূল বিষয়গুলো মোকাবেলায় গোত্রের কি করণীয় তা নির্ধারণ করাও এই সামানদের দায়িত্ব। স্থানীয় ভাষায় এই ওঝাদের তাদিবাইয়্যা ডাকা হয়।
নেনেটদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থার বিবরণ তো জানা হলো। এবার চলুন বৈরি প্রকৃতির সঙ্গে অবিরত সংগ্রাম করে টিকে থাকা এই গোত্রের মানুষগুলোর রোমাঞ্চকর জীবনযাত্রা সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক-
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গবাদি পশু হিসেবে গরু, ছাগল, ভেড়া বা উটের মতো প্রাণীর ব্যবহারই বেশি হয়ে থাকে। আগে জানিয়েছি, বিশ্বের একমাত্র এই নেনেটরাই গবাদি পশু হিসেবে রেইনডিয়ার নামক এক জাতের হরিণ লালন পালনের মাধ্যমে জীবিকা আহরণ করেন।
এই হরিণগুলো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং রাশিয়ার সুমেরু বৃত্তের অন্তর্ভুক্ত তুন্দ্রা এলাকায় বসবাস করে। যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় এই হরিণগুলো ক্যারিভু নামে পরিচিত।
সাধারণত এক একটি নেনেট পরিবার ৭০ থেকে ১০০টি হরিণের বাণ নিয়ন্ত্রণ করে। এভাবে এক একটি গোত্রের অধীনে ৫০০ থেকে ১০০০ রেইনডিয়ার একত্রে ঘুরে বেড়ায়।
প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় এক একটি পুরুষ রেইনডিয়ার সাত ফুটের বেশি লম্বা হয়। দাঁড়ানো অবস্থায় পায়ের খুঁড় থেকে কাঁধের উচ্চতা থাকে প্রায় ছয় ফুট। আর এর ওজন হয় ২০০ থেকে ৩০০ কেজির মতো।
অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের স্ত্রী রেইনডিয়ারের ওজন এক থেকে ১৫০ কেজির মতো হয়ে থাকে। বিশ্বের একমাত্র রেইনডিয়ার প্রজাতির হরিণের স্ত্রী এবং পুরুষ উভয় ধরনের প্রাণীর মাথায় শিং গজাতে দেখা যায়।
বর্তমানে টিকে থাকা হরিণের প্রজাতিগুলোর মধ্যে এই রেইনডিয়ারের দেহের অনুপাতে শিং এর দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বড়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ রেইনডিয়ারের মাথায় শিং এর প্রস্থ থাকে সাড়ে তিন ফুটের মতো।
আর তা প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা হতে পারে। এক একটি রেইনডিয়ার সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তবে নেনেট পরিবারে রেইনডিয়ার লালন পালনের সূচনা হয় চার থেকে ছয় বছর বয়সী কয়েকটি স্ত্রী এবং পুরুষ বন্য রেইনডিয়ারকে পোষ মানানোর মধ্য দিয়ে।
কারণ এই বয়সে রেইনডিয়ারগুলো প্রজননের সক্ষমতা অর্জন করে। এরপর তাদের বংশ বিস্তারের ফলে ধীরে ধীরে হরিণের দল গড়ে ওঠে। সাধারণত একটি নেনেট পরিবারের বার্ষিক চাহিদা পূরণে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক রেইনডিয়ার লালন-পালনের প্রয়োজন পড়ে।
আগেই জানিয়েছি, এক একটি পরিবারের অধীনে ৭০ থেকে ১০০টির মতো হরিণ থাকে। তাই নেনেট পরিবারগুলো সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী জীবনযাপনে সক্ষম। নেনেটদের খাদ্য তালিকায় আমিষ জাতীয় পদার্থের পরিমাণ থাকে বেশি।
এই আমিষের চাহিদা মেটাতে পালিত রেইনডিয়ারের পাশাপাশি অব এবং ইয়েনেসি নদীর শাখা প্রশাখায় ঘুরে বেড়ানো মাছের উপর নির্ভর করেন তারা। এছাড়া রেইনডিয়ারের দুধ এবং রক্ত পানীয় হিসেবে ব্যবহার করেন নেনেটরা।
রেইনডিয়ার নির্ভর জীবনযাত্রা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই প্রাণীগুলো পরিযায়ী স্বভাবের অধিকারী। প্রতিবছর এপ্রিল মাসে রেইনডিয়ারগুলো দল বেঁধে উত্তর দিকে রওয়ানা দেয়। কারণ তখন শীত কমে যাওয়ায় উত্তরে অপেক্ষাকৃত নতুন ঘাসের দেখা পাওয়া যায়।
আবার অক্টোবর মাসে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ ঘাসের খোঁজে রেইনডিয়ারগুলো দক্ষিণে যাত্রা করে। অন্য রেইনডিয়ারগুলো বছরে সর্বোচ্চ ৫০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেও নেনেটদের পোষা প্রাণীগুলো কয়েকশো কিলোমিটারের মধ্যেই বিচরণ করে।
তবে রাশিয়ার তুন্দ্রা এলাকার বৈরী পরিবেশে সেই কয়েকশো কিলোমিটারের যাত্রাও কম বিপজ্জনক নয়। বিশেষ করে বছরে দু’বার শক্তিশালী ইয়েনেসি নদীর জমাটবদ্ধ জলরাশি পাড়ি দেয়া নেনেটদের জীবনের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ এই অভিযাত্রায় একটি গোত্রের সবগুলো পরিবার অংশ নিয়ে থাকে। এসময় নেনেটরা রেইনডিয়ার হরিণদের টানা স্লেজ গাড়ি ব্যবহার করে। রেইনডিয়ারের চামড়া দিয়ে তৈরি বাসস্থানগুলো গুঁটিয়ে সেই স্লেজ গাড়িতে তোলা হয়।
প্রতিটি গোত্রের স্লেজ বহনে একটি বিশেষ গাড়িতে রাখা হয়। যাত্রাপথে ধর্মীয় কোনো আচার পালনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং সরঞ্জামগুলো বিশেষ এই গাড়িতে রাখা হয়। এই গাড়িতে হাত দেয়ার অধিকার শুধু ওঝাদেরই থাকে।
নেনেট গোত্রের বর্তমান পরিস্থিতি
একবিংশ শতকের আধুনিকতার ছোঁয়া বিশ্বের অন্যান্য জায়গার মতো এই নেনেটদের জীবনেও দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছে। বর্তমানে এসব গোত্রের অনেক সদস্যই অপেক্ষাকৃত সচ্ছল এবং সহজ জীবনের খোঁজে শহরগুলোতে বসবাস করা শুরু করেছেন।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম পূর্বপুরুষের রেইনডিয়ার লালন-পালন করে জীবনধারণের পরিবর্তে পড়ালেখার জন্য স্কুল, কলেজে যাওয়া শুরু করেছেন। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় রাজধানী বা শহরগুলোতেই চাকরি জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
সেই সঙ্গে নেনেটদের রেইনডিয়ার জড়ানোর বিস্তৃত ভূমির কোথাও কোথাও রেললাইন বসানো এবং নিয়মিত ট্রেন চলাচলের কারণে নেনেটদের যাযাবর জীবনেও এর প্রভাব পড়া শুরু করেছে। বিশেষ করে নেনেটদের নিয়মিত অভিযাত্রায় রেললাইন একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের সামনে।
আর এসব প্রতিবন্ধকতার পরও যারা এখনো পূর্বপুরুষের জীবনধারা বজায় রেখেছেন তাদের আশঙ্কা অদূর ভবিষ্যতে হয়তো তাদের এই ব্যতিক্রমী সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মতো কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না।