ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ শিল্প ও সাহিত্য ]
অস্থির বিশ্বের গল্প: আফগানিস্তান

একজন অনুবাদকের গল্প

মূল: খোদাদাদ মোহাম্মদি
অনুবাদ: ফজল হাসান
প্রকাশিত: ১২:৩৮, ১৩ জানুয়ারি ২০২৩
একজন অনুবাদকের গল্প
অস্থির বিশ্বের গল্প: আফগানিস্তান (ছবি: অন্তর্জাল)

***শুরু ***
আমার নাম খোদাদাদ মোহাম্মদি। আমি আফগানিস্তান থেকে এসেছি। সেপ্টেম্বর ২০১৭ থেকে অক্টোবর ২০২০ সাল পর্যন্ত আমি গ্রীসে ছিলাম।
আপনারা হয়তো মোরিয়া শরণার্থী শিবিরের নাম শুনেছেন; খুবই নাজুক অবস্থা, সব জায়গায় দীর্ঘ লাইন, আতঙ্কিত লোকজন—কিন্তু সেখানে আমার নিজস্ব জগত ছিল। আমি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় অবৈতনিক কর্মচারী হিসাবে কাজ করতাম। আমার কাজ ছিল অনুবাদকের। আমি স্বেচ্ছাসেবক এবং শরণার্থীদর সাহায্য করতাম। শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের কোনো ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, অথবা সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। সুতরাং আমি মনোস্থির করেছিলাম যে, যারা ইংরেজি শিখতে ইচ্ছুক, আমি তাদের ইংরেজি শেখাব; যদিও পড়ানোর জন্য আমার কোনো শ্রেনীকক্ষ বা সরঞ্জাম ছিল না, কিন্তু আমার প্রতি ছাত্র-ছাত্রীরা অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিল এবং আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি।

কিছু সময়ের জন্য আমি দুটি ছেলেমেয়েকে ইংরেজি শিখিয়েছি; তা করার জন্য আমি নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করেছি এবং ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য আমি প্রতিদিন বিকেলে একই সময়ে আমার তাবুতে ফিরতে চেষ্টা করতাম। শরণার্থী শিবির নিরাপদ ছিল না। তাই পড়ানোর কাজ শেষ হলে আমি প্রতিদিন ওদের শিবিরে পৌঁছে দিতাম। সুন্দরভাবে বাড়ির কাজ সম্পন্ন করা এবং ভালো করে পড়াশুনা করার জন্য ওরা প্রতিটি পাঠ নেওয়ার আগে আমার কাছে চকোলেট চাইত। ওরা মজার ছিল এবং আমাদের সম্পর্ক গাঢ় হয়ে উঠেছিল—অবশ্যই, ওরা আমার রুমমেটদের সঙ্গে এত চঞ্চল ছিল না। শরণার্থী শিবিরে আমার সহকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শিবিরে থাকাকালীন আমার জীবনে কী ঘটেছে, তা আমাকে ভুলে যেতে সাহায্য করেছিল।
সামনে এবং পেছনে

স্বদেশ ছাড়ার পর থেকে আমি নিজেই আমার জীবন পরিচালনা করছি এবং আমার নিজস্ব পথ খুঁজে বের করেছি। তখন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার অন্যতম উপায় ছিল প্রতি বছর একটি করে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা। আমি আরো এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ২০১৯ সালে এবং একই বছরের অক্টোবরে আমি লেসভোসের মোরিয়া শরণার্থী শিবির ছেড়ে এথেন্সের পথে যাত্রা করি। ইতোমধ্যে আমি দ্বীপে দু’বছর অবস্থান করেছি, দীর্ঘ সময় এমন এক জায়গায় অপেক্ষা করেছি যার কালো ইতিহাস রয়েছে; আরও সময় থাকতে আমি ভয় পাচ্ছিলাম । এছাড়া সময় নষ্ট করার বিয়ষটিও ছিল। সুতরাং ধাপে ধাপে আমি গ্রীস ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এথেন্সে কিছু সময় কাটানোর পর অবশেষে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আমি একজন চোরাকারবারীর সন্ধান পেয়েছি। সে আমাকে গ্রীস ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করবে। তখন শরণার্থীদের জন্য ভালো সময় ছিল না, অর্থাৎ চোরাকারবারীদের জন্য অবশ্যই ভালো ব্যবসার সুযোগ ছিল। সব জায়গায় গুজব রটেছিল যে, শরণার্থীরা সহজেই ধরা পড়ছে । তাই আগের তুলনায় চোরাকারবারীদের সংখ্যা কমে গিয়েছিল । যেসব চোরাকারবারী সক্রিয় ছিল, তারা বেশি পরিমানে অর্থ দাবি করে (চার থেকে সাত হাজার ইউরো) এবং প্রত্যেকেই বলছিল:
‘আমিই সেরা; কে আপনাকে সাহায্য করতে পারে? আমি!’
একজন বলছিল, ‘বিমানবন্দরে আমার সহযোগী পুলিশ আছে এবং সে আপনাকে কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়া প্লেনে ওঠা পর্যন্ত সাহায্য করবে …’ কিন্তু সে সাত হাজার ইউরো চেয়েছিল । 
আমি জাহাজে করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং একজন চোরাকারবারীর ফোন নম্বর সংগ্রহ করেছি।

আমি চোরাকারবারীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি এবং তাকে রাজি করিয়েছি যে, আমি কোনো গুপ্তচর নই এবং আমি একজন সাধারণ শরণার্থী এবং অন্য কোথাও কোনো জায়গায় শান্তি খুঁজছি। একজন তৃতীয় ব্যক্তি, যে চোরাকারবারী এবং শরণার্থীর মধ্যে সংযোগকারী হিসাবে কাজ করে, দু’পক্ষের সুবিধার্থে ব্যাঙ্কে একাউন্ট খোলে। আমরা যখন গন্তব্যে পৌঁছি, তখন অর্থকড়ি চোরাকারবারীর, শরণার্থীর নয়। যেমন আমি ইতালিতে যেতে চাই এবং তারা বলেছে যে, আমি যখন ইতালিতে পৌঁছব, তখন ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া টাকাপয়সা আমার নয়। কিন্তু যদি ধরা পড়ি, তাহলে টাকাপয়সা ব্যাঙ্কের একাউন্টে জমা থাকবে এবং সেই টাকা দিয়ে কি করা হবে, তার নিয়ন্ত্রণ আমারই থাকবে। আমি তৃতীয় ব্যক্তির কাছ থেকে একটা সঙ্কেত পেয়েছি, যে লোক আমার টাকা রেখেছিল। সুতরাং সেই সঙ্কেত ছাড়া আমি ব্যতীত অন্য কেউ টাকা পাবে না, যদি না আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রচন্ড বিশ্বাস জড়িত ছিল। (চলবে)
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!