Alexa নারীর অর্থ উপার্জন ও ইসলাম

ঢাকা, বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৩ ১৪২৬,   ১৮ মুহররম ১৪৪১

Akash

নারীর অর্থ উপার্জন ও ইসলাম

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০৫ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৮:৪১ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

অর্থবিহীন মানুষের জীবন সচলের বিপরীত। অর্থের মাধ্যমেই মানুষের জীবনে স্বাভাবিক ভারসাম্যতা থাকে। মানবজীবনে অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। 

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। এগুলোর প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন অর্থ আর অর্থ এবং অর্থ। একারণে অর্থ উপার্জনের পন্থা বেছে নিতে হয় সকল জাতের মানুষের। 

অঞ্চলভেদে অর্থ উপার্জনের সংজ্ঞা ভিন্ন। আমাজান জঙ্গলের গভীর অরণ্যে বাসবাসরত কিছু মানুষ আছে। তার অর্থ উপার্জন মানে প্রতিদিন শিকারে বের হওয়া। অর্থ উপার্জন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য সাধারণত মানুষ দু-ধরনের পেশা অবলম্বন করে। চাকরি বা ব্যবসা। ইসলাম এখানেই একটু কথা বলে- উপার্জনের মাধ্যম যা-ই হোক না কেন? তা হালাল হতে হবে। হারাম থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। 

অর্থ উপার্জন ছাড়া কারো পক্ষেই মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। মোটকথা অর্থনীতি মানবজীবনের জীবিন নির্বাহের অন্যতম চালিকা শক্তি। তাই, আমরা কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালার স্পষ্ট ঘোষণা দেখতে পাই। তিনি ইরশাদ করেন,

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

অর্থাৎ: ‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো, এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সূরাতুল জুমুআ : আয়াত: ১০)

প্রশ্ন হলো নারী কি জীবিকা নির্বাহ করার জন্য চাকুরি ব্যবসা করতে পারবে? ইসলাম বলে- নারী তার নির্ধারিত নিয়মকানুনের গণ্ডির মধ্যে থেকে অবশ্যই শিক্ষা অর্জনসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এখানে একটি কথা বলে রাখি ইসলাম চায়; নারী সবসময় নিরাপদ ও মার্জিত আসনে ও স্থানে থাকুক। ইসলাম কোথাও নারীকে বন্দি করে রাখার কথা বলেনি। ইসলাম নারীশিক্ষার প্রতি যেমন গুরুত্বারোপ করেছে তেমনি নারী-সাক্ষী প্রমাণেরও কোনো ধরনের পার্থক্য সৃষ্টি করেনি। তবে হ্যা, সাক্ষী হওয়ার ক্ষেত্রে নারীকে নিষেধ করেনি তবে, এতটুকু যে, দুইজন নারীর সাক্ষীর মান একজন পুরুষের সমান। 

ইসলাম নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমতি দিচ্ছে। সূরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ

অর্থাৎ: ‘আমি ব্যবসাকে হালাল করেছি এবং সুদকে হারাম করেছি।’ 

উক্ত আয়াতে ব্যবসা হালাল হওয়া এবং সুদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে নারী-পুরুষের তারতম্য নেই। এই থেকে বুঝা যায় একজন পুরুষ হালাল পন্থায় যেসব ব্যবসা করতে পারবে; একজন নারীও হালাল পন্থায় সে ধরনের ব্যবসা করতে পারবে। এখানে বিবাহের প্রশ্ন অবান্তর। চাই সে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত! সে তার অর্জিত সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী। সে ইচ্ছেমাফিক তার সম্পত্তিতে আবর্তন পরিবর্তন করতে পারবে। সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে, যেমনিভাবে একজন পুরুষ তার মালে বা সম্পত্তিতে আবর্তন পরিবর্তন করার জন্য কারো অনুমতির প্রয়োজন হয় না। 

শরিয়তের কোথাও নারীর ব্যবসা বাণিজ্যের ওপর কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করেনি। তবে ইসলাম সকল ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দিয়েছে; যেগুলোর ভেতর থেকে নারী তার ব্যবসায়িক বা চাকরি পরিচালনা করবে। শরিয়ত যে দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে তা হলো প্রথমত; ব্যবসা হতে হবে হালাল পদ্ধতিতে ও শরিয়ত নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে। দ্বিতীয়ত, নারীর যে পর্দার বিধান রয়েছে তা পুক্সক্ষানুপুক্সক্ষ মেনে। 

তাছাড়া ইসলাম নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী কোনো পেশায় নিয়োজিত হতেও নিষেধ করেছে। আধুনিক যুগ এটাকেও কিন্তু ব্যবসা বলে। তাই বলে এটাতে কোনো নারী নামতে পারে না। এই সময় অর্থনীতির সময়, অর্থের প্রয়োজন ও প্রয়োজন আজ যেন পূর্বাপেক্ষা অনেক গুণ বেশি বেড়ে গেছে। অর্থ ছাড়া এ সময়ের জীবন ধারণ হাতের মাঝে কয়লা নিয়ে বসবাস করা। এমনই এক কঠিন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে জীবন সমাজ ও রাষ্ঠ্রের সর্বক্ষেত্রে। আমাদের এই সময়ে একজন লোকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া, একই ব্যক্তির উপার্জনের ওপর গোটা পরিবার চলা। সংসারের সব ঝামেলা একজন পুরুষকর্তার ওপর কঠিন। শুধু কঠিন নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারে অসম্ভব।

আবার এমন সব পরিবারও আছে যাদের কোনো পুরুষ কর্তাও নেই। কোনো দৈব দুর্ঘটনার কর্তাপুরুষটি জীবনলীলা সাঙ্গ হয়েছে। তাই, একান্ত বাধ্য উপার্জনের দিকে পা বাড়াতে হচ্চে একজন গৃহবধূ একজন মা বা একজন নারীকে। চার দেয়ালে বাইরে তাকে যেতে হচ্ছে জীবন নির্বাহ করার জন্য। শুধু সে উপার্জনের পথে পা না বাড়ায় তার সন্তানের ভালো থাকা খাওয়া হবে না, ভালো পড়া-লেখার ব্যবস্থা হবে না। হয়তো তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার দুবেলা কিংবা ওষুধপত্র ব্যবস্থা হবে না। তাই, হাতপা গুটিয়ে বসে না থেকে বা একজন পুরুষের ওপর নির্ভর না করে ঘরের নারীরাও উপার্জনে সক্ষম হয়। 

এতে করে একদিকে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে স্বামী বাবা ভাইয়ের সঙ্গে সহযোগিতা করা হয়, জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। বেকারত্বের হার কমে। অন্যথায় পুরুষ কর্তাহীন পরিবার বা অল্প আয়ের স্বামীর একার পক্ষে সংসার সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে নেয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। এই পথ অবলম্বনে নারীরাও কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের কর্মক্ষমতার বিকাশ সাধনের সুযোগ পাবে। আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানও এমনটাই বলে। এরই ফলে আজ দেখা যাচ্ছে, দলে দলে মেয়েরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। অফিসে, ব্যবসাকেন্দ্রে, হাসপাতালে, উড়োজাহাজে, রেডিও, টিভি স্টেশনে- সর্বত্রই আজ নারীদের প্রচণ্ড ভিড়। 

আজ নারীরা উপার্জনের সক্ষমতা অর্জণ করছে অপরদিকে নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে সমাজে। এর ফলে যে বাস্তবতা ঘটছে তা কি আমরা ভাবছি! না ভাবছি। যা ঘটছে তা আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। পরিবারের মেয়েরা নিজেদের শিশু সন্তানকে ঘরে রেখে দিয়ে কিংবা চাকর-চাকরানির হাতে সপে দিয়ে অফিসে, বিপণীতে উপস্থিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে দিন রাতের প্রায় সময়ই শিশু সন্তানরা মায়ের স্নেহ বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছে। আর তারা প্রকৃত পক্ষে লালিত-পালিত হচ্ছে, চাকর চাকরানির হতে। 

ধাত্রী আর চাকর চাকরানিরা যে সন্তানের মা নয়, মায়ের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করাও তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়- এ কথা যুক্তি দিয়ে বোঝাবার প্রয়োজন পড়ে না অথচ ছোট ছোট মানব শিশুদের পক্ষে মানুষ হিসেবে লালিত-পালিত হওয়ার সবচাইতে বেশি প্রয়োজনীয় হচ্ছে মায়ের স্নেহ-দরদ ও বাৎসল্যপর্ণ ক্রোড়। 

অপরদিকে স্বামীও উপার্জনের জন্য বের হয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছে স্ত্রীও। স্বামী এক অফিসে, স্ত্রী অপর অফিসে, স্বামী এক কারখানা, স্ত্রী অপর কারখানায়। স্বামী এক দোকানে, স্ত্রী অপর এক দোকানে। স্বামী এক জায়গায় ভিন্ন মেয়েদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে কাজ করছে, আর স্ত্রী অপর এক স্থানে ভিন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে রুজি-রোজগারে ব্যস্ত হয়ে আছে। জীবনে একটি বৃহত্তম ক্ষেত্রে স্বামী আর স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। 

এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের বন্ধনে ফাটল ধরা ছেদ আসা যে অতি স্বাভাবিক তা বলে বোঝাবার অপেক্ষা রাখে না। এতে করে না স্বামীত্ব রক্ষা পায়, না থাকে স্ত্রীর বিশ্বস্ততা। উভয়ই অর্থনৈতিক প্রয়োজনের দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আত্মনির্ভশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজস্ব পদও সুযাগ-সুবিধার বিষয়ে আত্মচিন্তায় মশগুল।  

অতপর বাকী থাকে শুধু যৌন মিলনের প্রয়োজন পূরণ করার কাজটুকু। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভের পর এ সাধারণ কাজে পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল হওয়া কতটুকু সম্ভব- বিশেষত বাইরে যখন সুযোগ সুবিধার কোনো অভাব নেই। বস্তুত এ রূপ অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আকর্ষণ ক্ষীণ হয়ে আসতে বাধ্য। অতপরঃ এমন অবস্থা দেখা দেবে, যখন পরিচয়ের ক্ষেত্রে তারা পরস্পর স্বামী-স্ত্রী হলেও কার্যত তারা এক ঘরে রাত্রি যাপনকারী দুই নারী পুরুষ মাত্র। 
বাস্তবতাও এমনটাই বলছে। বাসায় এসে যে যার মতে করে খাচ্ছে ঘুমাচ্ছে। এভাবে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তাদের ক্ষেত্রে বৈচিত্র কিছু নয়। পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা, সম্প্রীতি, নির্লিপ্ততা, গভীর প্রেম- ভালোবাসা শূন্য হয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে অর্থোপার্জনের যন্ত্র বিশেষে পরিণত হয়ে পড়ে। এ ধরনের জীবনযাপনের এ এক অতি স্বাভাবিক পরিণতি ছাড়া আর কিছু নয়। 
এহেন মুহূর্তে নারীরা কী করবে? কী করবে স্বল্প আয়ের পুরুষ কর্তা। আমাদের ভাবতে হবে গভীরভাবে!। অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে যেন না হারাতে হয় স্বামী সংসার সোহাগ ছেলে মেয়ে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে