অরণ্য জনপদ: যেখানে রাত্রি নামে সন্ধ্যার আগে

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

অরণ্য জনপদ: যেখানে রাত্রি নামে সন্ধ্যার আগে

আব্দুল হাই আল-হাদী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩৭ ১১ আগস্ট ২০২১  

আমছড়া খাসিয়া পুঞ্জির এলাকার নয়নাভিরাম চা বাগান

আমছড়া খাসিয়া পুঞ্জির এলাকার নয়নাভিরাম চা বাগান

সন্ধ্যা নামার তখনও ঢের বাকি। খোশগল্প আর আড্ডা জমেছে বেশ। একই সঙ্গে চলছে বাগানের নির্ভেজাল চায়ের কাপে দেদারসে চুমুক। বলা নেই কওয়া নেই-সময়ের অনেক আগে হঠাৎ রাত্রির অন্ধকার নেমে আসলো। ঘড়ি দেখলাম, না সময় তো ঠিকই আছে। অরণ্যে ঘেরা পাহাড়ের উপরের সেমি পাকা আসাম’ স্থাপত্যের বাংলোকে যেন ঘিরে ধরল নিকষ কালো অন্ধকার। বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলাম, কী ব্যাপার! ’বনের কাজ কারবার আলাদা, এখানে রাত্রি নামে সন্ধ্যার আগে। আবার দিনের আগেই ফুটে উঠে সূর্যের আলো’ জানতে পারলাম প্রতিত্তোরে। প্রকৃতির বিচিত্র এ লীলাখেলায় সত্যিই অভিভূত হলাম। 

চারিদিকে দুঃসংবাদ আর লকডাউনের বন্দীদশায় মনটা কেমন যেন বিষিয়ে উঠেছিল। ভাবলাম, মনটাকে একটু রিফ্রেশ করা দরকার। সিদ্ধান্ত নিলাম, দু’একটা দিন কোথাও বনবাসে যাব। যেখানে বিষাদের সাইরেন আর সংক্রমণের কোন ভীতি থাকবে না। সে ভাবনা থেকেই চলে গেলাম সুহৃদ সায়েমের নির্জন চা বাগানে। সে ওখানকার ব্যবস্থাপক। বিবি-বাচ্চাকে শহরে রেখে একাই থাকে বিশাল এ বাংলোতে। বড়সাহেবের প্রতি পাইক-পেয়াদা, আর্দালিদের খেদমত দেখে জমিদারদের কথা স্মরণে আসলো। একদিন একরাত থেকে মনটা চাঙা করেই তবেই ফিরে এলাম আপন কর্মস্থলে। সঙ্গী হলেন কলেজ শিক্ষক মাহবুব। প্রাণখোলা আড্ডাবাজ মানুষটি পুরো সফরকে সত্যিই বৈচিত্র্যময় করে তুলেছিল। একইসাথে সঙ্গী করে নিয়ে আসলাম অরণ্যের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।   

যাইহোক, বাংলোর জমিদারী ধাঁচের বিশাল নির্জন ঘরে আড্ডা চলল গভীর রাত পর্যন্ত। খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ-ফুর্তিতে কখন যে ঘুমনোর সময় হল বুঝতেই পারলাম না। কিন্তু প্রকৃতির এরকম মৌনতায় যান্ত্রিক মানুষদের কী ঘুম আসে! বাংলোর নিয়ম-মাফিক ঘণ্টা বাজলো। কান পেতে শুনলাম, কত বিচিত্র প্রাণীর অদ্ভুত সব ডাক। বনমোরগ, পেঁচা, শেয়াল, বনবিড়াল আর কত্ত জাতের নাম না জানা প্রাণীর রাত জাগা আওয়াজ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ’আরণ্যক’ এ হারিয়ে গেলাম। এরইমাঝে কখন যে ঘুমের ঘোরে চলে গেলাম, বুঝতে পারলাম না। 

অরণ্যের সূর্যোদয় দেখার পরিকল্পনা থেকে সেই সাত সকালেই ঘুম থেকে উঠে পরলাম। শীতল কোমল সূর্য বনের ঝোপ-ঝাড় ভেদ করে ঠিক সময়েই জেগে উঠলো। সে সময়য়ের দৃশ্য কেবল অনুভব করা যায়, প্রকাশ করা যায় না। রাতের প্রাণীরা চলে যাচ্ছে নিরাপদ আবাসে, দিনের পাখ-পাখালী কলতান করে বেরিয়ে পড়ছে। স্নিগ্ধ-কোমল বনের বাতাস যেন সমস্ত ক্লান্তি আর বিষণ্ণতাকে নিয়ে গেল। খানিকটা পরে চা পান করেই বেরিয়ে পড়লাম প্রকৃতির রাজ্যে।

বাগানের চা গাছগুলো টিলার উপর ভদ্র ছেলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। টিলার বালুময় রাস্তা দিয়ে আমরা হেঁটে চলছি। চারিদিকে কেবল সবুজ আর সবুজ। শতবর্ষী বাগানটির বেশিরভাগ গাছই অনেক পৌঢ়। অনেক ঘটনার সাক্ষী গাছগুলো কেবল দিয়েই যাচ্ছে। একেকটা গাছ কত্ত না লম্বা হওয়ার কথা। কিন্তু মানুষের ছলকৌশলে গাছগুলো চিরকালের বামুন দশা নিয়েই টিকে আছে। ছায়াবৃক্ষ দিয়ে পৃথিবীর আলো থেকে তাদের দূরে রাখা হয়েছে। দেখলাম, বাগানের শ্রমিক মেয়েগুলো থলে হাতে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে। খেয়াল করলাম, মানুষগুলোর চেহারায় বেদনা ভরা এক অদ্ভুত মায়া। নিজভূমি থেকে ব্রিটিশরা তাদেরকে এদেশে এনেছিল কত রঙ্গিন স্বপ্ন দেখিয়ে! 

মুল্লুকে চলো আওয়াজ তুলে তাদের কতজনকে না প্রাণ দিতে হয়েছে। মুল্লুকে ফিরতে ব্যর্থ মানুষগুলো নিয়তির জালে বন্দি হয়ে চা বাগানেই জীবনটাকে কাটিয়ে দিচ্ছে। বাগানে ব্রিটিশদের সে পদ্ধতির কোন পরিবর্তন আজও দেখা যায়নি। সে পদ্ধতির হেরফের করলে পুঁজিপতিদের সোনার ডিম পাড়া হাঁস চা শিল্প যে ধ্বংস হয়ে যাবে! জানলাম, টিলার উপরের অংশের সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বনে নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী বসবাস করে।

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউরা উপজেলার আমছড়া খাসিয়া পুঞ্জিতে বসবাসরত একটি সুখি পরিবারের সদস্যরা। অরণ্য জনপদের এই বাসিন্দাদের দিনরাত কাটে পুঞ্জির ভেতরেই।

পরিকল্পনা মতো ন’টার মধ্যেই চলে আসলাম বাংলোতে। ফ্রেস হয়ে নাস্তা সারলাম। এরপর বেরিয়ে পড়লাম কুলাউড়ার আমছড়া খাসিয়াপুঞ্জির উদ্দেশ্যে। প্রায় ৫ কি.মি. দূরের সে পুঞ্জিতে প্রবেশের দু’টি রাস্তা। আমরা শর্টকাট রাস্তায় পাহাড়-টিলা ডিঙিয়ে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। উল্টো পথে যাওয়ার কারণে আমাদেরকে পানের জুমের মধ্যে অচেনা পথে এগুতে হল। সীমার মধ্যে পৌছতেই আমরা দেখলাম জুমের মধ্যে কাজ করছেন খাসি নারীরা। কারও আবার পিটের সাথে রয়েছে কোমলমতি সন্তান। উঁচু-নিচু পাহাড়ি খাড়া পথ। আমরা ক্রমশ এগুচ্ছি আর নিসর্গের নিকানো বাগান দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। যে মুগ্ধতায় ভুলে গেলাম পথের ক্লান্তি।
 
দেখলাম, চারিদিকে কেবল সবুজের সমারোহ। লম্বা লম্বা সুপারি আর বনবৃক্ষের সাথে আঁকড়ে আছে পানগাছগুলো। বর্ষা মৌসুমে পানগাছগুলো আরও যৌবনা হয়ে উঠেছে।পাতায় পাতায় নুয়ে পড়ছে একেকটি গাছ। খাসীদের জীবনযাত্রা পুরোপুরি পানের উপর নির্ভরশীল। পান যেন তাদের প্রাণ। তাই একেকটি পানগাছের জন্য তারা জীবন বাজি রাখেন, যত্ন করেন। পানগাছের মাটি সংলগ্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করলেই ব্যাপারটি সহজে দেখা যায়। অবাঞ্চিত গাছের মরা ডাল আর নানা ধরণের জৈব সার দিয়ে গাছের খাদ্যের যোগান দেওয়া হচ্ছে। নিজেদের লোকায়ত জ্ঞানকে তারা এ কাজে পুরোপুরি কাজে লাগায়। পুরুষরা ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করছেন, কখনও পানি নিষ্কাশন পথ তৈরি করছেন। পান চাষ নয় যেন প্রকৃতির সন্তানরা যেন প্রকৃতির সাধনায় নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে কাজ করছেন। পান ছাড়াও দেখলাম, পানের মোট বাঁধার বিশেষ এক ধরণের পাতার গাছ । আরও নাম না জানা জানা বিচিত্র গাছ-গাছালীতে ভর্তি পুরো জুম। 

হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমরা পৌঁছে গেলাম আমছড়ি পুঞ্জির মন্ত্রীর বাড়িতে। মন্ত্রীর নাম জেমসন লামিন। আধুনিক ও স্মার্ট অথচ ঐতিহ্যপ্রেমী এ মানুষটি বাড়িতে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানালেন। পাহাড়ের একেবারে চুড়ায় নির্মিত বাড়িটি অরণ্যে ঘেরা হলেও ঘরটি আধুনিক স্থাপত্যের মিশেলে তৈরি। করোনার কারণে আমরা একটু নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছিলাম। হালকা নাস্তার সাথে সাথে চললো খাসিয়াপুঞ্জির সমস্যা ও সম্ভাবনার আলোচনা। 

লেখক আব্দুল হাই আল-হাদী

মি. জেমসন জানালেন, আমছড়ি পুঞ্জির আয়তন প্রায় ৯০ একর এবং জনসংখ্যা প্রায় ২৫০। ১৯৪৯ সালে পুঞ্জির যাত্রা শুরু হয় এবং বর্তমানে মোট ৩০টি খাসি পরিবার পুঞ্জিতে বসবাস করে। ধর্মে প্রায় সবাই খ্রিস্টান। করোনাকালের প্রসঙ্গ আসতেই তিনি বললেন, করোনায় এখনও পুঞ্জির কেউ আক্রান্ত হননি। তবে লকডাউনের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে আর্থ-সামাজিক কারণে। তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, বর্ষাকালেই সবচেয়ে বেশি পান উৎপাদিত হয় কিন্তু এবার লকডাউনের কারণে প্রচুর উৎপাদন সত্ত্বেও পানের দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে খাসিদের কষ্টে দিনানিপাত করতে হচ্ছে। তিনি তাঁর বাড়িটি ঘুরে দেখালেন। বাড়ির উঠোনের গির্জাটিও আমরা দেখলাম। 

মন্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়েই আমরা গেলাম ডিবরা লংডহের বাড়িতে। পিসন তারিয়াং, বিউটিফুল লংডহ আর তার দু’বছরের সন্তান কুইনফুল লংডহ নিয়ে তাদের সুখের সংসার । বাড়িতে যেতেই তারা যারপরনাই আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। করোনাকালীন সময়ে অপ্রত্যাশিত হলেও আমরা শেষ পর্যন্ত পান-সুপারির আপ্যায়ন গ্রহণ করতে বাধ্য হলাম। তাদের বড় মেয়েকে নকশিয়ার পুঞ্জিতে বিয়ে দিয়েছেন। গল্প হলো অনেক। মোটামুটি তারা সুখেই আছেন। তাদের থেকে বিদায় নিয়েই জুমের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে আবার ফিরে এলাম বাগানের বাংলো ঘরে।

গোসল আর খাওয়া-দাওয়া করে খানিকটা বিশ্রাম নিলাম। এবার যে ফিরতে হবে। কিন্তু বড়সাহেব চা কারখানা দেখাবেন। তাই কারখানায় গেলাম, দেখলাম এতো শ্রমের চা কিভাবে সর্বশেষ খাবার উপযোগী হয়। এরই মাঝে সন্ধ্যার মৌনতায় নিস্তব্ধ অরণ্য ছেড়ে পথ ধরলাম সিলেটের পথে। অরণ্য জনপদের দিন-রাত্রির অবসান হল। ফিরেছি কিন্তু একদিন একরাতের বনবাসের ঘোর যেন এখনো অনুভূতির সর্বাঙ্গে লেপতে আছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ