মুগ্ধতার রঙে আঁকা মারায়ন তং, ঘুরে আসুন শরতেই

ঢাকা, বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১১ ১৪২৭,   ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

মুগ্ধতার রঙে আঁকা মারায়ন তং, ঘুরে আসুন শরতেই

নাকিব নিজাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪৬ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০  

মারায়ন তং পাহাড়। ছবি: সংগৃহীত

মারায়ন তং পাহাড়। ছবি: সংগৃহীত

মারায়ন তং—এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা কেবলই রোমাঞ্চকর নয়; বরং সেখানে চ্যালেঞ্জটাই মুখ্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই পাহাড়ের উচ্চতা ১৬৬০ ফুট। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার তীব্র লালসায় নিজেদের ধরে রাখতে না পেরে আমরা চারজন চলে যাই বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মারায়ন তং জাদি পাহাড়ে। এটির সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠতে আমাদের হাঁটতে হয়েছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পাহড়ি রাস্তা। যেখানে কোথাও এক ফুটের জন্য রাস্তা নিচের দিকে নামেনি! ট্রেইলের শুরু থেকে একদম চূড়া পর্যন্ত পুরোটাই খাড়া রাস্তা।

এমন একটা পাহাড়ের চূড়ায় শুধুমাত্র চার কিশোরের ক্যাম্পিং করাটা অনেকটা দুঃসাহসিক দেখাচ্ছিল। সেদিন আমরাই সর্বপ্রথম চূড়ায় উঠেছিলাম। তবে কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে ১২ জন এবং ৯ জনের দুটি দল যথাক্রমে চূড়ায় আসতে দেখে কিছুটা সাহস পেলাম। বৃষ্টির বাগড়া মাথায় নিয়ে সম্পন্ন করতে হলো তাবু টানানো।

‘মারায়ং তং’, ‘মারাইং তং’, ‘মেরাইথং’ বিভিন্ন নাম আছে এই পাহাড়ের। চূড়ায় উঠেই যেটা সবার প্রথমে চোখে পড়ে, তা হল বিশাল একটি জাদি। জাদি মানে বৌদ্ধদের পূজা-অর্চনার জন্য বানানো বুদ্ধমূর্তি। এমনভাবে জাদিটি বানানো হয়েছে, যেন দূরের কোনো প্রকৃতির রহস্য নিয়ে ভাবছে আর স্মিত হাসি ফুটে উঠছে তার ঠোঁটে। জাদির চারদিকে খোলা ও ওপরের দিকে চালা।

ক্যাম্পিং করার জন্য দেশের সবচেয়ে সেরা জায়গা বলা হয় এটিকে। ছবি: সংগৃহীত

পাহাড়টির ওপরের অংশটুকু সমতল। এখান থেকে যত দূর দৃষ্টি যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সেসবের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে জনবসতি। নিচে সাপের মতো এঁকে-বেঁকে বয়ে চলেছে মাতামুহুরী নদী। তার দুই কূলে দেখা যায় ফসলের মাঠ। এ পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এদের মধ্যে ত্রিপুরা, মারমা ও মুরং অন্যতম।

পাহাড়ের নিচে থাকে মারমা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে মুরংদের পাড়া। এরা পাহাড়ের ঢালে তাদের বাড়ি বানিয়ে বসবাস করে। মাটি থেকে সামান্য ওপরে এদের টংঘর। এসব ঘরের নিচে থাকে বিভিন্ন গবাদি পশু যেমন-গরু, ছাগল, শূকর ও মুরগি। কখনো গবাদি পশুর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠও রাখা হয় স্তূপ করে।

বিকেলে সূর্য যখন পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে যাচ্ছিল, প্রকৃতির অনন্য একটা রূপের দেখা পেলাম আমরা। মনে হচ্ছিল পাহাড় নিজের ছায়াতলে খুব সযত্নে আলতো করে সূর্যটাকে লুকিয়ে রেখে দিচ্ছে। বিকেলের স্নিগ্ধ আলো আর সন্ধ্যার রক্তিম আকাশের মিষ্টি আবহ পাহাড়ের চূড়ায় থাকা সবাইকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে নিচ্ছে। চারিদিক স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে আর চূড়ায় থাকা আমরা সবকিছুকে খুব গভীরভাবে অনুভব করছি। খুব কাছ থেকে প্রকৃতির হিংস্র রূপ দেখে আসা আমরাই আবার প্রকৃতির করুণা উপভোগ করছি।

চূড়ায় উঠেই প্রথমে চোখে পড়বে জাদি। ছবি: সংগৃহীত

কিছু সময় পর আঁধার ঘনিয়ে এল। পাহাড়ের চারপাশে তখন মেঘেরা বাসা বাঁধতে শুরু করলো। তুলার চেয়েও নরম মেঘগুলোর রূপ এতটাই সুন্দরভাবে ফুঁটে উঠছিল, আমরা ক্রমেই অভিভূত হচ্ছিলাম। আর তখন কারো ছবি তোলার ইচ্ছে ছিল না। শুধুমাত্র উপভোগ করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। রাতে অসহনীয় শীত শুধু ক্যাম্প ফায়ারই দূর করতে পারে।

রাতের আকাশে সুবিন্যস্ত তারকারাজির অমায়িক একটা দৃশ্য ক্রমশই আমাদের ভুলিয়ে দিতে থাকলো দিনের সব পরিশ্রম, ভয়াবহতা, ক্লান্তি–গ্লানিকে। তাবুর ছাদ খুলে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা জিনিসই বারবার চাইছিলাম, সকাল যেন না হয়!

নির্দেশনা

ঢাকা/চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে চকরিয়া যেতে হবে। সেখান থেকে চান্দের গাড়ি বা বাসেকরে যেতে হবে আলিকদম আবাসিক মোড়ে। সেখানে খাবার ও পানির কোনো ব্যবস্থা নেই, কাজেই শুকনো খাবার ও পানি সমতল থেকেই নিয়ে যেতে হবে। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই মারায়ং তং যাবার রাস্তা দেখিয়ে দিবে। সেখান থেকে হেঁটে মারায়ন তং পাহাড় চূড়ায় পৌঁছতে ২ ঘণ্টার মতো লাগবে। তবে ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতা না থাকলে সময় আরো বেশি লাগতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে