বীথি: ক্রিকেটার তৈরি থেকে অসহায়ের আশ্রয়স্থল

ঢাকা, শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৪ ১৪২৮,   ০৪ রমজান ১৪৪২

বীথি: ক্রিকেটার তৈরি থেকে অসহায়ের আশ্রয়স্থল

ক্রীড়া প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫০ ৮ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৫:৩৩ ৮ মার্চ ২০২১

আরিফা জাহান বীথি

আরিফা জাহান বীথি

স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হবেন। সে পথে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে নাকের ইনজুরিতে পড়ায় সেই স্বপ্ন আর বাস্তবের মুখ দেখেনি। ক্রিকেটার হতে না পারলেও থেমে থাকেননি। গড়ে তুলেছেন নারীদের ক্রিকেট একাডেমি। যা দেশের মধ্যে প্রথম। আবার অসহায়দের পাশেও দাঁড়াচ্ছেন নিয়মিত। তিনি রংপুরের মেয়ে আরিফা জাহান বীথি।

২৩ বছর বয়সী বীথি রংপুর স্টেডিয়ামে গড়ে তুলেছেন 'উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি'। সেখানে কোনো ধরনের ফি ছাড়াই ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে পারেন মেয়েরা। এরই মধ্যে ২৫০ জন অদম্য তরুণীকে নিয়ে সবুজ ঘাসে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। এর বাইরে করোনার সময় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সাবেক এ নারী ক্রিকেটার। এরপর থেকেই নিয়মিত অসহায় মানুষদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

বীথির জন্ম ও বেড়ে ওঠা রংপুর নগরীর নুরপুরে। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোট থেকেই বড় হয়েছেন দারিদ্র্যের মাঝে। এক পর্যায়ে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন বীথি। কিন্তু পরে মা ও বড় বোনের কারণে এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি। 

তখন থেকেই শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বাড়ির সামনে মায়ের সঙ্গে মুদি দোকান দিয়ে শুরু করেন নতুন পথচলা। এভাবে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে একসময় দেখতে থাকেন বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন। স্থানীয় এক কোচের অধীনে ক্রিকেট প্রশিক্ষণও শুরু করেন তিনি।

২০১০ সালে রংপুর জেলার হয়ে ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নেন বীথি। ওপেনিংয়ে ভালো করায় ঢাকার ক্রিকেটেও চলে আসেন তিনি। খেলেছেন ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব, লেজেন্ড অব ভাওয়াল ক্রিকেট একাডেমি, ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট একাডেমি ও রায়েরবাজার অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে। 

বীথির ক্রিকেট একাডেমির সদস্যরাক্রমাগত ভালো খেলতে থাকায় বীথির লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন হাতের মুঠোয় চলে আসে! কিন্তু সে সময়েই বাদ সাধে শারীরিক সমস্যা। ২০১৭ সালে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ চলাকালে অপ্রত্যাশিতভাবে নাকের ইনজুরিতে পড়েন। নাক থেকে ঝরতে থাকে রক্ত। 

চিকিৎসকদের পরামর্শে চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও বীথির নাক থেকে রক্তপড়া সারেনি। একসময় জানতে পারেন, ক্রিকেট খেলা না ছাড়লে তার ৮০ শতাংশ ক্যান্সার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দেন। 

ক্রিকেটার হতে না পারলেও খেলা থেকে দূরে যেতে পারেননি বীথি। নিজেকে তৈরি করেন নতুন করে। এবার আত্মপ্রকাশ করেন প্রশিক্ষক হিসেবে। বাংলাদেশ হুইলচেয়ার নারী ক্রিকেট টিমের প্রশিক্ষণ দিয়ে কোচিং জীবনের শুরু। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় দিনের প্রশিক্ষণ শিবির চালান তিনি।

এরপর বীথির মাথায় উত্তরাঞ্চল থেকে সম্ভাবনাময় নারী ক্রিকেটার তৈরি করে জাতীয় দলে নিয়ে আসার চিন্তা আসে। মাঠের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নারী ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি। এ লক্ষ্যে রংপুর নগরীর ৬-৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ক্রিকেট প্রশিক্ষণে আগ্রহীদের খুঁজে বের করেন। সে সময় পেয়ে যান ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী। 

২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর রংপুর জিমনেসিয়ামে ক্রিকেট একাডেমির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন বীথি। এতে ক্রিকেট কোচিং ও আউটসোর্সিং করে জমানো ১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। বিষয়টি তার মা জানতে পারলে মেয়েকে এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দেন। সেই টাকায় প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য ব্যাট, বল, প্যাড, হেলমেটসহ ক্রিকেট খেলার সকল সামগ্রী এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

বন্যার্তদের পাশে বীথিবর্তমানে বীথির ক্রিকেট একাডেমিতে বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন প্রায় আড়াইশ তরুণী। কঠিন অনুশীলনকে কাজে লাগিয়ে তার একাডেমি থেকে চলতি বছর ১১ জন ক্রিকেটার বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা বিকেএসপিতে পরীক্ষা দেন। সেখানে টিকে যান আটজন। তাদের সকলেই নিম্ন আয়ের এবং অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে। 

নারী ক্রিকেটার তৈরির পাশাপাশি অসহায়-অসচ্ছলদের জন্যও কাজ করে বেড়ান বীথি। করোনার শুরুর দিকে রংপুর বিভাগের আট জেলার চরাঞ্চলসহ দুর্গম সব এলাকায় গর্ভবতী মায়েদের ফোন পেয়ে খাবার নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন সাবেক এ ক্রিকেটার। 

এ সময় প্রায় চার হাজার গর্ভবতী মায়ের জন্য নানারকম পুষ্টিকর খাবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এ কাজে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার তামিম ইকবাল, রুবেল হোসেন, কোচ ফাহিম আবেদীনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহযোগিতা করেছেন।

এখনো অসংখ্য অসহায় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন বীথি। একইসঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেটার তৈরির কাজও। সবমিলিয়ে স্বপ্নপূরনের পথে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বীথির এমন কল্যাণমূলক কাজ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে, এমনটাই প্রত্যাশা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এএল