রমন লাম্বা: দেশের ক্রিকেটে এক বিস্মৃত তারা

ঢাকা, বুধবার   ০৩ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৮ ১৪২৭,   ১৮ রজব ১৪৪২

রমন লাম্বা: দেশের ক্রিকেটে এক বিস্মৃত তারা

আসাদুজ্জামান লিটন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৯ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৪:৩৯ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

রমন লাম্বা

রমন লাম্বা

প্রিয়তমা স্ত্রী কিম লাম্বাকে অনেক ভালোবাসতেন রমন লাম্বা। তার খেলার সময় গ্যালারীতে একটু চোখ বোলালেই দেখা যেত আইরিশ সুন্দরী কোথাও না কোথাও বসে আছেন, উপভোগ করছেন রমনের খেলা। স্ত্রীকে দেখার জন্য কখনোই হেলমেট পড়ে খেলতে চাইতেন না লাম্বা। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে নিজের শেষ ম্যাচ খেলার সময়েও হেলমেট পড়েননি তিনি। মাঠে নেমেছিলেন তারা হয়ে। এখনো যখন তাকে স্মরণ করা হয়, তারা হিসেবেই সম্মান পান। তবে অধিকাংশ সময়েই থাকেন দূর আকাশের কোণে, বিস্মৃত এক তারা হয়ে।

বাংলাদেশের টেস্ট পূর্ব যুগে লাম্বা যখন খেলতে আসেন, তখনো ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে বড় কোনো তারকা ক্রিকেটারের আগমন ঘটেনি। ফলে আবাহনীর রমনই তখন বড় তারকা। ভারতের জাতীয় দলে বড় কিছু করার সম্ভাবনা নিয়েই এসেছিলেন। যদিও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি ৪ টেস্ট আর ৩২ ওয়ানডেতেই থেমে গেছে। আশির দশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা লাম্বা ইংল্যান্ডের কাউন্টি ও আইরিশ লিগগুলোতে বেশ দাপটের সঙ্গেই খেলেছেন। সেখানেই পরিণয় হয় কিমের সঙ্গে, যা গড়ায় বিয়ে পর্যন্ত।

এরপর ১৯৯১ সালে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট মাতাতে বাংলাদেশে আসেন রমন লাম্বা। প্রতি মৌসুমেই আবাহনীর হয়ে নিয়মিত খেলতে আসতেন তিনি। হয়ে উঠেছিলেন আবাহনীর ‘ঘরের ছেলে’। শেষ পর্যন্ত ঘরের জন্য লড়াই করতে গিয়েই বাইশ গজের সবুজ গালিচায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের বন্দোবস্ত হয় তার।

দিনটি ছিল ১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল আবাহনী ও মোহামেডান নেমেছিল লড়াইয়ে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই দুই দলের লড়াই এখন তেমন উন্মাদনা জাগায় না। তবে সে সময় আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ মানেই দেশ দু’ভাগ হয়ে যাওয়া। এমনি এক ম্যাচে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে খেলতে নেমেছিলেন রমন লাম্বা। 

রমন লাম্বা ছিলেন তার সময়ে ঢাকার ক্রিকেটের অন্যতম তারকা ক্রিকেটারপ্রথমে ব্যাট করে সেই ম্যাচে দেড়শর কিছু বেশি রান করতে পারে আবাহনী। চ্যাম্পিয়ন হতে চাইলে জয় ছিল অতি প্রয়োজন। মূল ঘটনার সময় মোহামেডানের হয়ে ব্যাট করছিলেন মেহরাব হোসেন অপি। নন স্ট্রাইক প্রান্তে ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। নিয়মিত অধিনায়ক আকরাম খান মাঠের বাইরে থাকায় তার হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন খালেদ মাসুদ পাইলট। 

মোহামেডানকে চেপে ধরতে বাঁহাতি স্পিনার সাইফুল্লাহ খান জেমের হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন পাইলট। সে সময় শর্ট মিড উইকেট থেকে হেঁটে হেঁটে বারবার স্লিপে আসছিলেন রমন লাম্বা। অপির কাছে গিয়ে দু-চারটে কথাও শুনিয়ে যাচ্ছিলেন। যাকে ক্রিকেটের ভাষায় স্লেজিং বলে আর কী।

এক সাক্ষাৎকারে সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাইফুল্লাহ বলেন, ‘আমি লাম্বাকে বলে দেই যে আমার শেষ বলে তুমি স্লিপে এসো না। চার হয়ে গেলে ওদের রান বেশি হয়ে যাবে। তুমি শর্ট মিড উইকেটেই থাকো।’ কিন্তু ও এসে অপিকে স্লেজিং করছিল এবং হেলমেট ছাড়াই ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে দাঁড়াচ্ছিল। আমি বারবার নিষেধ করেছি। হেলমেট নিতে অনুরোধ করেছি, কিন্তু ও শোনেনি। 

তিনি আরো বলেন, শেষ অবধি বল করে ফেলি। অপি সজোরে পুল শট খেলে। বলটি রমন লাম্বার মাথায় লেগে সোজা উপরে উঠে যাওয়ার পর পাইলট ক্যাচটা ধরে। সে সময় খেলা হতো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। মাঠে স্ট্রেচার থাকত না। তাই ওকে হাঁটতে হাঁটতে ড্রেসিংরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। হেঁটে যাওয়ার সময় মোটামুটি কথা বলতে পারলেও ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পর সে আর কথা বলেনি।

সবস্ময় হাসিমুখেই থাকতেন লাম্বাজানা যায়, ৩৮ বছরের রমন লাম্বা সেদিন মাঠে জ্ঞান হারাননি। কিন্তু ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পর বমি করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। সেই যে সংজ্ঞা হারালেন, আর ফিরলেন না এই ক্রিকেটার। সঙ্গে সঙ্গে লাম্বাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনদিন লড়াই করেন মৃত্যুদূতের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক বিষণ্ণ দুপুরে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান পরপারে।

লাম্বা চলে যাওয়ার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভুলে গেছে সবাই। কেউ না থাকলে তাকে ভুলে যায়, এটাই যে জগতের নিয়ম। ঘরের ছেলে লাম্বার স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখতে যেখানে আবাহনীই কোনো চেষ্টা করেনি, সেখানে অন্যরা আর কীই বা করবে! এ যেন ক্লাবটির জন্যই লজ্জার বিষয়। অবশ্য দেশের কিংবদন্তি ফুটবলার মোনেম মুন্না বা রবিউদ্দিন রবিদেরই যেখানে আবাহনী সম্মান দেখাতে পারেনি, সেখানে ক্লাবের হয়ে খেলতে এসে জীবন দেয়া অন্য দেশের লাম্বা তো আরো পরের ব্যাপার। 

লাম্বার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তার নামে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের একটি বোলিং প্রান্তের নামকরণ করা হবে। দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই কথাটি থেমে আছে সেখানেই। এখন তো স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেটের পাটই চুকে গেছে। লাম্বাকে নিয়েও কারো মাথা ঘামাতে হয়নি।

বিশেষ দিন ছাড়া এখন আর লাম্বাকে মনে করার কেউ নেইঅবশ্য কার মনেই যে লাম্বা নেই, এটাও ঠিক না। তিনি এখনো বেঁচে আছেন স্ত্রী কিমের হৃদয়ে। তাকে দেখার জন্যই তো লাম্বা হেলমেট পড়তেন না, যার ফল হিসেবে প্রাণটা পর্যন্ত দিয়ে গেছেন। এমন একজনকে আইরিশ সুন্দরী কিম ভুলবেন কিভাবে!

দুই সন্তান জেসমিন ও কামরানকে নিয়ে বর্তমানে পর্তুগালের মাদেইরাতে থাকেন তিনি। জানা গেছে, সবসময় লাম্বার দেয়া একটি ধাতব মুদ্রা মানিব্যাগে রাখেনন কিম। এছাড়া তার বিছানার নিচে থাকে লাম্বার প্রিয় একটি ক্রিকেট বল।

প্রতি বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি আসে, লাম্বার স্মৃতিচারণ হয়, আবার হারিয়ে যান। কেউ ক্রিকেট মাঠে মাথায় আঘাত পেলেও হয়তো উঠে আসে তার কথা।

সবসময় তরুণ থাকতে চেয়েছিলেন লাম্বা, পৃথিবী ছেড়েছেন অল্প বয়সেই। ক্রিকেটপ্রেমীদের মনেও লাম্বা থাকবেন চিরসবুজ হয়ে। খেলার জন্য না হলেও বিষাদময় ট্র্যাজেডির জন্য। আর যদি কারো মনে না-ই থাকেন, দূর আকাশের বিস্মৃত তারার মতোই আকাশের কোণে থেকে সব দেখবেন তিনি। হয়তো হাসবেন আর ভাববেন, সেদিন হেলমেট পড়লে হয়তো...

ডেইলি বাংলাদেশ/এএল