ম্যান অব দ্য ম্যাচ বেন স্টোকস

ঢাকা, বুধবার   ১২ মে ২০২১,   বৈশাখ ৩০ ১৪২৮,   ২৯ রমজান ১৪৪২

ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা

ম্যান অব দ্য ম্যাচ বেন স্টোকস

স্পোর্টস ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০১:৩৭ ৩১ মে ২০১৯   আপডেট: ০২:১২ ৩১ মে ২০১৯

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে অলরাউন্ডারদের র‍্যাংকিংয়ে সেরা দশেও নেই বেন স্টোকস। কিন্তু তাতে কী! ১১তম অবস্থায় থেকে বিশ্বকাপ শুরু করেও তিনি যে ব্যাটে বল কতটা পারদর্শী সেটা আরো একবার বুঝিয়ে দিলেন। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনটা যদি ইংল্যান্ডের হয় তাহলে সেই লাকি দিনটা হওয়ার পেছনের মূল কারিগর বেন স্টোকস।

জিম্বাবুয়েতে জন্ম নিলেও ক্রিকেটের হাতেখড়ি হয়ে ইংল্যান্ডের হয়েই। উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কোথায় ছিলেন না বেন স্টোকস! ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং তিন জায়গাতেই যেন সবার চেয়ে নিজেকে আলাদাভাবে চেনালেন এ পেস বোলিং অলরাউন্ডার।

উদ্বোধনী ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিলে প্রথম ওভারে উইকেট হারালেও বেশ ভালোভাবে সেই বিপর্যয় সামাল দেন জো রুট ও জ্যাসন রয়। দুজনের ১০৬ রানের জুটি ইংল্যান্ডকে পথ দেখায়। কিন্তু দ্রুতই এ দুই ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বেশ বিপদে পড়ে ইংল্যান্ড। ১০৭/১ থেকে ১১১/৩ এ পরিণত হয় ইংল্যান্ড। তখনই ক্রিজে আসেন বেন স্টোকস।

অধিনায়ক ইয়ন মরগানকে সঙ্গে নিয়ে গড়েন ১০৬ রানের জুটি। ব্যাট হাতে এদিন প্রোটিয়া বোলারদের বেশ ভালোভাবেই শাসন করেন এই বা হাতি ব্যাটসম্যান। প্রথম দিকে একটু দেখে শুনে খেলতে থাকেন তিনি। প্রিটোরিয়াসের করা ৩৬ তম ওভারে তিনটা চার মেরে ৪৬ বলে নিজের অর্ধশতক পূরণ করেন তিনি। তবে স্টোকসের অর্ধশতক করার পর ইংল্যান্ড কিছুটা চাপে পড়ে যায়। অন্যদিক থেকে একে একে মঈন আলী, ক্রিস ওকসরা বিদায় নিলে একা হাতেই লড়াই করতে থাকেন তিনি।

শেষ দশ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ের বিপক্ষে একাই লড়েন স্টোকস। তাকে বারবার স্লোয়ার বল দিচ্ছিল লুংগি এনগিডি, ফেহলুকায়ো এবং রাবাদা। কিন্তু তাদেরকে শক্ত হাতে সামাল দিতে থাকেন। কিন্তু ৪৯তম ওভারের শেষ বলে এনগিডির বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে হাশিম আমলার কাছে ক্যাচ দেন স্টোকস। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১১ রান দূরে থাকতে প্যাভিলিয়নে ফেরেন এ বা হাতি ব্যাটসম্যান। যেখানে তিনি ইনিংসটি সাজিয়েছিলেন ৯টি চার দিয়ে। হয়তো বিশ্বকাপের প্রথম সেঞ্চুরি থেকে একটু দূরে থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সেটিকে পুষিয়ে দিয়েছে বোলিং এবং ফিল্ডিং দিয়ে।  

ইয়ন মরগান বেন স্টোকসকে বোলিংয়ে আনেন ৩৬ তম ওভারে। যেখানে প্রায় সময়েই তাকে ১০-২০ ওভারের ভেতর বোলিং করতে দেখা যায়। জয় নিশ্চিত হয়ে গেছিল বলেই মনে হয় ইংল্যান্ড অধিনায়কের এই ভাবনা। স্টোকস যখন বোলিংয়ে আসেন তখন দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রস ১৮৩/৭। প্রথম দুই ওভারে কোনো উইকেটের দেখা পাননি স্টোকস। প্রথম ওভারে রান দেন এক এবং দ্বিতীয় ওভারে দেন ৭ রান।

কিন্তু নিজের তৃতীয় ওভার করতে এসেই সাফল্যের দেখা পান এই ডান হাতি পেসার। ওভারের চতুর্থ এবং পঞ্চম বলে রাবাদা ও ইমরান তাহিরকে আউট করেন দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের সমাপ্তি ঘটান এ পেসার। সঙ্গে জিইয়ে রাখেন পরবর্তী ম্যাচে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও। বোলিং এবং ব্যাটিংয়ের থেকেও এই ম্যাচে সবচেয়ে নজর কেড়েছে স্টোকসের ফিল্ডিং।

প্রিটোরিয়াসকে রানআউট করার পাশাপাশি চোখধাধানো এক ক্যাচ নিয়ে সবাইকে চমকে দেন। আদিল রশিদের করা বলে ফেহলুকায়ো ডিপ মিডউইকেটে উড়িয়ে মারেন। স্টোকস সেটিকে ছক্কা হওয়ার আগেই লাফিয়ে পড়ে এক হাত দিয়ে অবিশ্বাস্য এক ক্যাচ লুফে নেন। অনেকে এই ক্যাচের পর তাকে বেন ‘ঈগল’ স্টোকসও বলতেছেন। বলবে নাই বা কেন! এমন ক্যাচ খুব সচরাচর ক্রিকেটে দেখা যায় না।

ম্যাচ শেষে এই ক্যাচ নিয়ে বেন স্টোকস বলেন, আমি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম। কিছুটা সামনে এগিয়ে গেছিলাম কিন্তু আমার ডাক নাম হচ্ছে ‘দ্য ক্ল’, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় সেটিই লেগে গেছে আমার নামের সঙ্গে।’ দ্য ক্ল হলো ট্রয় ছবির একটি পার্ট যাকে ‘এলিয়েন’ নাম দেয়া হয়েছিল।

একটি ছোট্ট মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন স্টোকস। অরবিন্দ ডি সিলভার পর ১৯৯৬ সালের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটির পর প্রথম কোনো খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে এক ম্যাচে ৮০+ রান, ২টি এবং ২টি উইকেট নেয়ার বিরল মাইলফলকটি স্পর্শ করেছেন স্টোকস।  

নিজের পাশাপাশি দলের জয় নিয়েও কথা বলেন বেন স্টোকস। ‘উইকেট কিছুটা ট্রিকি ছিল। ৩০০-৩৩০ এই স্লোয়ার বলের বিপরীতে ভালো স্কোর। এখানে বাউন্ডারি পাওয়া কঠিন। মানসিক দিক দিয়ে তিনশর বেশি রান এখানে একটা প্রভাব ফেলে। দর্শকরা দারুণ সমর্থন দিয়েছে আমাদের।’

বেন স্টোকস ছাড়াও এ ম্যাচে ইংল্যান্ডের জয়ের সহকারী নায়ক হিসেবে ছিলেন অনেকেই। জেসন রয় এবং জো রুটের কথা না বললেই নয়। শুরুর বিপর্যয় তারা ভালোভাবেই সামাল দিয়ে দলকে বিপর্যয় সামাল দিতে সাহায্য করেছেন। রয় করেন ৫৪ এবং রুট করেন ৫১ রান। অন্যদিকে অধিনায়ক ইয়ন মরগানও কম যাননি। ৬০ বলে চারটি ৪ ও তিনটি ছক্কার মাইরে ৫৭ রানের লড়াকু একটি ইনিংস খেলেন। যখন তিনি ক্রিজে আসেন তখন দলের দুই উইকেট পটাপট চলে গিয়েছিল।

অন্যদিকে বোলিংয়ে ইংলিশ বোলাররা দারুণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ দলের সবচেয়ে আলোচিত তারকা জোফরা আর্চারের গতির কাছে মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙ্গে পড়ে। তার ১৪০+ কিলোমিটার গতির বল খেলতে হিমশিম খেতে হয় আফ্রিকান ব্যাটসম্যানদের। হাশিম আমলাকে গতিতে পরাস্ত করে বল তার হেলমেটে লাগান। আমলা কিছুটা ব্যথাও পান তাতে এবং মাঠ থেকে উঠে যান। এরপরেই আর্চার ঝড় শুরু হয়। কম রানের ব্যবধানে মারকরাম এবং ফ্যাফ ডু প্লেসিসের উইকেট তুলে নিয়ে প্রমাণ করেন কেন তাকে ইংল্যান্ড দলে নেয়া হয়েছে, কেন তিনি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্য। এ দুটি ছাড়াও, ভ্যান ডার ডুসেনকেও গতিময় বাউন্সারে পরাস্ত করেন স্টোকস। বিশ্বকাপ অভিষেকটা তিন উইকেট নিয়ে স্মরণীয় করে রাখলেন এই পেসার। তিনি ছাড়াও লিয়াম প্লাঙ্কেওটও আফ্রিকান ব্যাটিংকে গুড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছেন। প্লাঙ্কেট নেন ২ উইকেট। কিন্তু দিন শেষে পুরো ম্যাচেরই নায়ক বেন স্টোকস।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/আরএ