মামুনুল হক: দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিই যার ব্যবসা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

মামুনুল হক: দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিই যার ব্যবসা

নিজস্ব প্রতিবেদক  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:১৮ ১৪ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৪:৩০ ১৪ এপ্রিল ২০২১

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক

হাজার বছরের অকৃত্রিম ঐতিহ্য হচ্ছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। সে বাংলাদেশকে মাঝে মধ্যেই ছোবল দেয় সাম্প্রদায়িক উগ্রগোষ্ঠী। এসব সাম্প্রদায়িক উগ্রগোষ্ঠীর একজন নেতা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক।

তিনি ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে রাজধানীর আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, যিনি ছিলেন রাজাকার। শুধু তাই-ই নয় তার (আজিজুল হক) বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণ ও বলাৎকারের অভিযোগও ছিল। ১৯৯২ সালে ধর্ষণের অভিযোগে ৩ মাসের কারাভোগও করেছেন তিনি।

সাম্প্রদায়িক উগ্রগোষ্ঠীর নেতা মামুনুল হক এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স সমাপ্ত করেন। পারিবারিক জীবন নিয়ে বলতে গেলে তার ঠিক কতজন স্ত্রী রয়েছেন এর সঠিক হিসাব নেই। তবে তার বর্তমানে ৪ জন প্রেমিকা রয়েছেন। তার প্রথম স্ত্রীর সংসারে রয়েছেন ৩ সন্তান। তার শ্বশুর জঙ্গি সংগঠন জামায়াতে ইসলামের সদস্য।

বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন জামায়েত ইসলাম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ইন্ধনে হেফাজত ইসলাম নামে নতুন সংগঠন গঠিত হয়। মূলত এই সংগঠনটি আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অবরোধ করার মাধ্যমে। ওই ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত, কেননা তারা চেয়েছিল দেশজুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে। তাদের এই আন্দোলনের ইন্ধনদাতা ছিল জামায়াতে ইসলামী। কারণ সেই সময় যুদ্ধাপরাধের বিচারের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল বাংলার সাধারণ জনগণ। যুদ্ধাপরাধীদের যাতে বিচার না হয় সেই জন্য ওই আন্দোলন গড়ে তুলে হেফাজতে ইসলাম।

হেফাজত ইসলামের উগ্র-সাম্প্রদায়িক প্রতিটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এই মামুনুল হক। মূলত আইএস, জামায়াতে ইসলাম, পাকিস্তান এবং আরো কিছু জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে তার। এমন তথ্যও গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। বাংলাদেশে যত সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে তার প্রায় সবগুলোকেই পেছনে বা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মামুনুল হক।

গত ১৭ মার্চ সকালে সুনামগঞ্জের কাশিপুর, নাচনী, চণ্ডিপুরসহ কয়েকটি গ্রামের মামুনুল হকের অনুসারীরা তার-ই নির্দেশে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে পার্শ্ববর্তী নোয়াগাঁও গ্রামে অতর্কিত হামলা চালান। সেই হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেয়ায় মামুনুল হককে গ্রেফতারও করা হয়।

সব সময় আলোচনায় থাকার জন্য এই মামুনুল হক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে দেশে প্রায়ই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যু নিয়েও দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন মামুনুল হক।

সূত্রমতে, তখন জামায়াতে ইসলাম থেকে মোটা অংকের টাকাও নিয়েছিলেন তিনি। যার ফলে মামুনুল হকের সন্ত্রাসীরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা করে।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাহফিল করে সেখানে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিতেন মামুনুল। সর্বশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগমনকে ঘিরে দেশে নতুন করে নাশকতা সৃষ্টি করেন তিনি। মামুনুল হকের নেতৃত্বে শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন লাগিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন বাড়িতেও হামলা চালিয়ে লুটপাট করেন মামুনুল হকের পালিত সন্ত্রাসীরা। সরকারি-বেসরকারি অফিসেও হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। শুধু তাই-ই নয় আন্দোলনে উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ে মাদরাসার ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে দেন মামুনুল হক।

সর্বশেষ প্রায় এক ডজন অডিও-ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় আসে মামুনুল হকের অনৈতিক কর্মকাণ্ড। সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টে নারীসহ স্থানীয় লোকজনের কাছে অবরুদ্ধ হন তিনি। সেই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয়ও দেন। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের নানা প্রশ্নবাণে তাকে ধরাশায়ী হতে দেখা যায়। স্ত্রীর পরিচয় যথাযথভাবে দিতে পারছিলেন না মামুনুল হক। এছাড়া রিসোর্টের রেজিস্টারে তিনি নারী সঙ্গীর নাম উল্লেখ করেন আমেনা তৈয়বা। কিন্তু ওই নারী জানান, তার নাম জান্নাত আরা ঝর্ণা। উল্লেখ্য, আমেনা তৈয়বা মামুনুল হকের প্রথম স্ত্রীর নাম।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হেফাজত নেতা মামুনুল হক অনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে ধরা খেয়ে নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। রিসোর্ট থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীরা তাকে ছিনিয়ে নেয়ার পর তিনি তার স্ত্রী আমেনা তৈয়বাকে ফোন করেন। স্ত্রীকে তিনি ফোনে জানান, রিসোর্টে থাকা ওই নারী তার বন্ধু শহীদুল ইসলামের স্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে কিছু মনে না করার অনুরোধ জানিয়ে হেফাজতের এই নেতা স্ত্রীকে বলেন, ‘কেউ জিজ্ঞাসা করলে তুমি বইলো, আমি সব জানি।’

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের অডিও ফাঁস হওয়ার পরপরই ওই নারী সঙ্গী যে মামুনুল হকের বৈধ স্ত্রী নন— সে বিষয় কিছুটা পরিষ্কার হয়ে যায়। এরই মধ্যে আরো পাঁচটি অডিও ফাঁস হয়। যেগুলোতে গত কয়েক দিনে মামুনুল হক ও তার কথিত সেই নারী সঙ্গীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এমনকি ওই নারী মামুনুল হককে সাগর তীরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও মনে করিয়ে দেন। জবাবে মামুনুল ঝামেলা শেষ হলে সেই ইচ্ছা পূরণ করবেন বলে ওই নারীকে আশ্বস্ত করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই নারীকে স্ত্রী হিসেবে দাবি করলেও তা পণ্ড হয়ে যায় মামুনুল হকের বোন ও তার প্রথম স্ত্রীর ফোনালাপ ফাঁসের মাধ্যমে। ওই ফোনালাপে মামুনুল হকের বড় বোন মামুনুল হকের স্ত্রীকে বিষয়টি নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে শিখিয়ে দেন কেউ ফোন করলে কি বলতে হবে। মামুনুল হকের বোনকে বলতে শোনা যায়, ‘তুমি বলবা আমার শাশুড়ি বেঁচে থাকতেই এই বিয়ে হয়েছে। আমার এতে সম্মতি ছিল। আমরা পরিবারের লোকজন সবাই তোমার সঙ্গে আছি। ঝামেলা একটু শেষ হোক।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামুনুল হক ইস্যুতে আরেকটি অডিও ফাঁস হয়েছে তার সঙ্গে থাকা নারী ও তার আগের ঘরের সন্তানের কথোপকথনের। সেখানে ওই নারী রিসোর্টের পরিস্থিতির কথা ছেলের কাছে ব্যাখ্যা করেন। ছেলে তার মায়ের সঙ্গে ঘটনা নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ওই ছেলের আরেকটি ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে আব্দুর রহমান নামে ওই তরুণ হেফাজত নেতা মামুনুল হককে ‘মুখোশধারী জানোয়ার’ উল্লেখ করে তার বাবা-মায়ের সংসার ভাঙার পেছনে মামুনুল হককে দায়ী করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ/এইচএন