মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে বার্গম্যানের ধৃষ্টতা

ঢাকা, সোমবার   ২৫ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ১০ ১৪২৮,   ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে বার্গম্যানের ধৃষ্টতা

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৫ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৫:১৭ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

বিতর্কিত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। ছবি: সংগৃহীত

বিতর্কিত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালের মার্চ। তখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সেসময় পাক বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছিল এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামধারী কিছু নরপশু। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী ওই যুদ্ধে শহিদ হন ৩০ লাখ মানুষ, আর সম্ভ্রম হারান আড়াই লাখ মা-বোন। যদিও যেকোনো গণহত্যাতেই সংখ্যা প্রধান বিচার্য বিষয় নয়, তারপরেও মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের এই সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন বিতর্কিত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।

স্বাধীনতার দীর্ঘ ৩৯ বছর পর, ২০১০ সালে শুরু হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। তখন থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর নানা অপচেষ্টা চালাতে থাকেন সাংবাদিক নামধারী বার্গম্যান। ব্লগিং, উন্মুক্ত সম্পাদকীয়- যেভাবেই সুযোগ পেয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালিয়েছেন।

বার্গম্যানের নিজস্ব ব্লগ ‘বাংলাদেশ ওয়ারক্রাইমস ডট ব্লগস্পট ডট কম’-এ তিনটি লেখায় মুক্তিযুদ্ধকালে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এগুলো হলো: ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস-১: ইন অ্যাবসেন্সিয়া ট্রায়ালস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনএডেকোয়েসি’; ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস-২: ট্রাইব্যুনাল অ্যাসাম্পশন’ এবং ‘সাঈদী ইনডাইক্টমেন্ট: ১৯৭১ ডেথস।’

জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দলটির সাবেক সদস্য (রুকন) আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে দেয়া রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হন, আড়াই লাখ নারী সম্ভ্রম হারান আর প্রায় এক কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। কিন্তু বার্গম্যান তার ব্লগে লিখেছেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে দেয়া এসব তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় থেকে এই সংখ্যাটির উৎপত্তি। রাষ্ট্রপক্ষ এসব তথ্য প্রমাণ করেনি, কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সেগুলো সাধারণ জ্ঞান (কমন নলেজ) হিসেবে আমলে নিয়েছেন।

এ ঘটনায় ২০১৪ সালে ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হতে হয় বার্গম্যানকে। ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো সমালোচনা না করার জন্য বার্গম্যানকে সতর্ক করেন ট্রাইব্যুনাল।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছেন- এর স্বপক্ষে রয়েছে হাজারো প্রমাণ, দলিল এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘প্রাভদা’ বাংলাদেশে ৩০ লাখ শহিদদের বিষয়টি প্রকাশ করে। ওই বছরেরই ২১ ডিসেম্বর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, হানাদার দুশমন বাহিনী বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ নিরীহ লোক ও দুই শতাধিক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এছাড়া Rudolph Joseph Rummel তার রচিত ‘Estimating Democide: Methods and Procedures’ শীর্ষক নিবন্ধে গণহত্যার পরিসংখ্যান কীভাবে করতে হয়, তার একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। তার উদ্ভাবিত গণহত্যা পরিসংখ্যান পদ্ধতি অনুসারে তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ৩০ লাখ ৩ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছেন। এদিকে ১৯৮১ সালের UNHRC (ইউনাইটেড ন্যাশনস হিউম্যান রাইটস কমিশন) রিপোর্ট বলছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ মানুষ খুন হয়েছিল। গণহত্যার ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ গড়। এমনকি পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী লেখিকা সামান্তা পাওয়ারের গণহত্যা সম্পর্কিত লেখা সর্বাধিক বিক্রি হওয়া একটি বই ‘আ প্রবলেম ফ্রম হেল: আমেরিকা অ্যান্ড দ্য এজ অব জেনোসাইড’ বইয়ে ১৯৭১ সালে শহিদের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে ৩০ লাখ বলা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট defence.pk-তে প্রকাশিত The Radical Truth: Teaching MPACUK the Forgotten Chapter of Pakistan’s History শীর্ষক নিবন্ধের তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘In 1971, over 9 months, President Yahiya Khan and his military commanders with the aid of local collaborators committed mass atrocities on unarmed civilians, killed an estimated three million people...’

এত এত প্রতিবেদন, দলিল এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষী থাকার পরও মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাকে ধৃষ্টতা বলে উল্লেখ করছেন জেনোসাইড গবেষকরা।

বার্গম্যানের বিরুদ্ধে এর আগেও আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক সংবাদের প্রায় সবগুলোতেই যেন অবধারিতভাবে উপস্থিত থাকেন তিনি। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আল জাজিরার বিতর্কিত প্রতিবেদনের পেছনের মানুষটিও আর কেউ নন - বার্গম্যান।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে/এইচএন