অনিয়মই নিয়ম নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজে

ঢাকা, বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৬ ১৪২৭,   ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অনিয়মই নিয়ম নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজে

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:০৬ ২৫ জুন ২০২০   আপডেট: ২১:৩৪ ২৫ জুন ২০২০

নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নাইটিংগেলে অনিয়মই নিয়মে পরিনত হয়েছে। ফলে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা, শিক্ষক নিয়োগে বিশৃঙ্খলাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে মেডিকেল কলেজটির বিরুদ্ধে।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক কোটি টাকা জরিমানা, সরকারের কালো তালিকাভুক্তির পরও সংশোধন হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলেজটির অধ্যক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। কোনো কোনো বিভাগ চালানো হচ্ছে সবে মাত্র এমবিবিএস পাস শিক্ষক দিয়ে।

২০০৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) মানসম্মত মেডিকেল শিক্ষার জন্য কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক (অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও কিছু ক্ষেত্রে নির্দেশনাকারী) থাকতে হবে তার নির্দেশিকা তৈরি করে। নির্দেশিকায় (এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিষ্ট্রি, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, মেডিসিন, কমিউনিটি মেডিসিন, সার্জারি, মাইক্রোবায়োলজি, গাইনী) ৫০, ১০০ ও ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য কতজন শিক্ষক থাকবেন তা উল্লেখ আছে। নতুন ৫০জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলে শিক্ষক থাকতে হবে কমপক্ষে ১৯৮ জন। ১০০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক ২৯৩ জন আর ২০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হলে শিক্ষক লাগবে ৪০০ জন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজে অধিকাংশ বিভাগেই কোনো শিক্ষক নেই। মেডিসিন, গাইনী, অর্থোপেডিক্স ও চক্ষু বিভাগে মাত্র একজন করে শিক্ষক আছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের (প্রি ক্লিনিক্যাল) শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকজন শিক্ষক থাকলেও তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের (ক্লিনিক্যাল) শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো শিক্ষক নেই।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটিতে এনেসথেসিয়ার কোনো ডাক্তার নেই। অপারেশন থিয়োটার চলে ভাড়া করা লোক দিয়ে। রেডিওলোজি ও সার্জারি বিভাগে কোনো প্রফেসর নেই। এমবিবিএস পাস এক ডাক্তার দিয়ে চালানো হচ্ছে সার্জারি বিভাগ।

নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ

বর্তমানে কালো তালিকাভুক্ত নাইটিংগেল মেডিকের কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা খুবই কম। একটি হাসপাতাল চালাতে গেলে যেখানে প্রতিদিন ৫০-৬০ জন রোগী থাকার প্রয়োজন। সেখানে রোগী ভর্তি থাকে গড়ে ৫ জন। হাসপাতালটিতে নেই কোনো পরিচালকও।

জানা গেছে, হাসপাতাল পরিদর্শনে আসা সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকরা এ বিষয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করলেও ম্যানেজ করেই হাসপাতালের কার্যক্রম অব্যাহত রাখছেন কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ রয়েছে মেডিকেল কলেজটির শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও। নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান কলেজ অধ্যক্ষের কোনো পরামর্শ ছাড়াই যখন তখন শিক্ষক নিয়োগ দেন তিনি। চাকরিচ্যুতও করা হয় যখন তখন।

কলেজের হিসাব বিভাগ পরিচালনার জন্য চেয়ারম্যান ও অধ্যক্ষের যৌথ একাউন্ট থাকার নিয়ম থাকলেও মানা হচ্ছে না তাও। অর্থিক কোনো বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষের ক্ষমতা নেই এখানে।

জানা যায়, সম্প্রতি কলেজটির অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনালেল (অব.) প্রফেসর মো. হাবিবুর রহমানকে তার কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রেখে চাকরিচ্যুত করেছে নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এর আগে হাবিবুর রহমানকে দিয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ৮৫ শিক্ষার্থী কলেজটিতে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়েছে উল্লেখ করে রেজিষ্ট্রেশন ফরম সরবরাহের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আবেদন করানো হয়। অথচ তাকে চাকরিচ্যুতের সময় জানিয়েছে মাত্র ৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। পরে হাবিবুর রহমান ঢাবি কর্তৃপক্ষকে সংশোধনী চিঠি দিতে বললেও তা দেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এদিকে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের জন্য আদালত কলেজটিকে মোটা অঙ্কের জরিমানাও করেছে বলে জানা গেছে।

২০১৬ সালে জুন মাসে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের নীতিমালার শর্ত পূরণ না করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অপরাধে নাইটিংগেলসহ ৪টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির উপর বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়।

একই বছরের অক্টোবরে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির শর্ত পুরণ না করায় নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজকে এক কোটি টাকা জরিমানা করে সর্বোচ্চ আদালত।

নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে ২০১৬ সালে জুনে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। সে সময় শিক্ষার্থীরা কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন জামান চৌধুরীকে অবরুদ্ধ করে রাখে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. দীপক কুমার ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কলেজটিতে এখন একটাই ব্যাচ আছে যারা প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক আছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের যেহেতু কোনো ছাত্র নেই তাই শিক্ষকও নেই।

অধ্যক্ষকে না জানিয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান আমাদের কাছে কোন বিভাগে শিক্ষকের স্বল্পতা আছে তা জেনে নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেন। যখন তখন শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস/এসআর/এমআরকে