ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্সের ক্ষমতার উৎস যেখানে

ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৭,   ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্সের ক্ষমতার উৎস যেখানে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:০২ ২৮ অক্টোবর ২০২০  

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

ইউরোপসহ গোটা বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর ও প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্স। শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে ফ্রান্সের বেশ সুনাম থাকলেও তাদের ক্ষমতার উৎস হিসেবে ধরা হয় উপনিবেশবাদকে। আর দেশটির এই উপনিবেশবাদ নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক ও অসুখকর ইতিহাস।

ঔপনিবেশিক আমলে আফ্রিকার ২৪ টি দেশে কলোনি স্থাপন করেছিলো ফ্রান্স। দেশগুলো হলো - উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, সাহিল অঞ্চল বা পশ্চিম আফ্রিকার মৌরতানিয়া, মালি, চাদ, নাইজার, সেনেগাল, টোগো বেনিন, বুর্কিনা ফাসো, আইভরিকোষ্ট, গিনি, মধ্য আফ্রিকার ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো (রিপাবলিক), গ্যাবন এবং পূর্ব আফ্রিকার জিবুতি, কমোরোস ও মাদাগাস্কার।

এই কলোনিগুলোর বেশিরভাগকেই ফ্রান্স ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা প্রদান করে। মোটামুটি ১৯৮০ সালের মধ্যেই সব আফ্রিকান দেশকে ফ্রান্স স্বাধীনতা দিয়ে দেয়।

ব্রিটিশরা তাদের কলোনিগুলোকে স্বাধীনতা প্রদানের সময় আর কোনো চুক্তি করেনি। শর্তহীন স্বাধীনতা প্রদান করা হয় ব্রিটিশ কলোনিগুলোকে। কিন্তু ফ্রান্স আফ্রিকার সবগুলো দেশকে শর্তহীন স্বাধীনতা প্রদান করেনি।

ফ্রান্স তার কলোনিগুলোকে স্বাধীনতা প্রদানের সময় দুর্বল দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামরিক কিছু চুক্তি করে। আর এই চুক্তির গ্যাঁড়াকলে পড়ে দেশগুলো প্রতিনিয়তই হারাচ্ছে তাদের স্বকীয়তা।

ফ্রান্স আফ্রিকায় তার কলোনিগুলোকে স্বাধীনতা প্রদানের সময় দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এক অর্থনৈতিক ফাঁদ তৈরি করে। রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তারা সেই দেশগুলোর অর্জিত আয়ের সবটাই রাখে FCFA (france for france african) নামক ব্যাংকে। এই FCFA তে আফ্রিকার ১৪ টি দেশ তাদের সব জাতীয় আয় জমা রাখে। দেশগুলো হলো – টোগো, বেনিন, বুর্কিনা ফাসো, গিনি বিসাউ, সেনেগাল, আইভরিকোষ্ট, মালি, নাইজার, চাদ, ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো (ব্রাজাভিলা), নিরক্ষীয় গিনি, গ্যাবন।

ইতালির ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টারের মতে, ফ্রান্সের এই মুদ্রাভিত্তিক শোষণ আফ্রিকার মানুষকে বাধ্য করছে দেশ ত্যাগ করতে। তারা ইউরোপে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে দেখা যায় ভূমধ্য সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিহতের ঘটনায় বেশিরভাগই FCFA-র অধিভুক্ত দেশের নাগরিক।

FCFA ভুক্ত প্রতিটি দেশ মুদ্রা হিসেবে ফ্রাংক ব্যবহার করে, যার নাম Currency of Franc for African সংক্ষেপে CFA। এর পাশাপাশি আফ্রিকার দেশগুলো তাদের সব সম্পদ FCFA তে জমা রাখতে বাধ্য।  কিন্তু যখন খরচ করবার প্রয়োজন পড়ে তখন মাত্র ১৫% টাকা তারা উত্তোলন করতে পারবে। এরচেয়ে বেশি দরকার হলে আফ্রিকার দেশগুলোকে নিজেদের টাকা নিজেদেরকেই ঋণ নিতে হবে FCFA থেকে। আবার এই ঋণ নেয়ার পরিমাণ কখনো ২০% এর বেশি হতে পারবে না। আর সুদও দিত হবে বাণিজ্যিক হারে!

আফ্রিকান দেশগুলোর জমাকৃত টাকার ৬৫% ই FCFA খরচ দেখায় অপারেশনাল খাতে। FCFA মোট জমাকৃত টাকার ৮০% এরও বেশি বিনিয়োগ করে নিজেদের নামেই। এ বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লাভের কোনো হিসাব কখনোই কোনো আফ্রিকান দেশকে দেয়া হয় না! ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার FCFA এর রিজার্ভে আছে।

কলোনি থাকার সময় ফ্রান্স আফ্রিকার দেশগুলোতে কিছু কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করেছিলো। ওই অবকাঠামোর খরচ দেখানো হয়েছিলো স্ব স্ব দেশের সরকারের খাত দিয়ে। বলা বাহুল্য, সব খরচই আফ্রিকান দেশগুলোর সরকারী ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ঋণদাতা দেশ ফ্রান্সকে ওই ঋণগুলো এখনো পরিশোধ করতে হচ্ছে স্বাধীন সার্বভৌম আফ্রিকার দেশগুলোকে।

পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার দেশগুলো যখন ফ্রান্সের কলোনি থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন ফ্রান্স সেই দেশগুলোর সঙ্গে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের এক অসম চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তি অনুযায়ী কলোনিয়াল দেশগুলোর সব খনিজ সম্পদ উত্তোলনের প্রাথমিক দাবিদার হবে ফ্রান্স। ফ্রান্স যদি কখনো আগ্রহ না দেখা, তখনই কেবল সে দেশগুলো অন্য কোনো দেশ দিয়ে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে পারবে!

বিগত শতাব্দীতে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার এই দেশগুলোতে একের পর এক খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সন্ধান মিলেছে। গত ৫০ বছরে আফ্রিকার বুকে একের পর এক প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের খনি আবিস্কৃত হয়েছে। ফ্রান্সের সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানের চুক্তিতে আবদ্ধ অন্য দেশগুলোতেও হীরা, স্বর্ণ, লোহা, টিম্বারসহ অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদের ব্যাপক মজুদ বিদ্যমান।

গ্যাবনে আছে বিশাল ইউরেনিয়ামের মজুদ। আর ফ্রান্সের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোর জন্য দরকার এই ইউরেনিয়াম।

ওমারের মৃত্যুর পর আজও গ্যাবনের ক্ষমতায় আছে তার ছেলে আলি ওমার বঙ্গো। ফ্রান্সের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিষয়টা প্রকাশ পায় ওমার বঙ্গোর একটা উক্তি থেকে। যেখানে জ্যাক শিরাক(সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট) নিজেই আফ্রিকাকে শোষণের কথা স্বীকার করেছিলেন, সেখানে বঙ্গো বলেছিলেন, “গ্যাবনকে ছাড়া ফ্রান্স হচ্ছে ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির মতো, আর ফ্রান্সকে ছাড়া গ্যাবন হচ্ছে জ্বালানী ছাড়া গাড়ির মতো। ” অথচ বাস্তবে ফ্রান্সই দশকের পর দশক ধরে গ্যাবনের কাছ থেকে ইউরেনিয়াম জ্বালানি আদায় করে নিচ্ছে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে।

এছাড়াও মালি, নাইজার, চাদ, টোগো, বেনিন, কঙ্গোর মাটির নিচে থাকা স্বর্ণ, হীরা, লোহা, পেট্রোলিয়ামসহ সকল খনিজ সম্পদ একচেটিয়াভাবে উত্তোলন ও ভোগ করে যাচ্ছে ফ্রান্স।

সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেঁরা ১৯৫৭ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আফ্রিকার উপর নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখতে না পারলে একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে ফ্রান্সের কোনো জায়গা থাকবে না। পাঁচ দশক পর তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক ২০০৮ সালে সেটা আবারো নিশ্চিত করে বলেছিলেন, আফ্রিকা না থাকলে ফ্রান্স তৃতীয় বিশ্বের তালিকায় ছিটকে পড়ত।

ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ এই দেশগুলোর সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণ নিয়েও ফ্রান্স একতরফা সুবিধা ভোগ করছে। এই দেশগুলোর সরকারী ভবন নির্মাণ, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাসের পাইপলাইন নির্মাণসহ সকল সরকারী কাজে প্রাধান্য পায় ফরাসী কোম্পানিগুলো।  

এভাবে প্রতিবছর অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে কোটি কোটি ডলার অবৈধভাবে উপার্জন করছে ফরাসি কোম্পানিগুলো।  

ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সঙ্গে তাল না মিলিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলায় কিংবা স্বাধীন থাকতে চাওয়ায় ১৯৬৩ সাল থেকে ২২ জন আফ্রিকান প্রেসিডেন্টকে হত্যা করেছে ফ্রান্স। দেশটির চক্রান্তের শিকার হয়ে প্রাণ হারানো এসব প্রেসিডেন্টের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হওয়া নাম মুয়াম্মর গাদ্দাফি।

এসব হত্যা কিংবা অভ্যুত্থান ঘটানোর পেছনে ছিল ফ্রান্সের তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা। আর এই সংস্থাগুলো হলো এসডিইসিই, ডিজিএসই এবং ডিএসটি। এগুলোই আফ্রিকায় অভ্যুত্থান ঘটানো এবং মহাদেশটির বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যার জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করে এক উপ-সম্পাদকীয় প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম আফ্রিকান গ্লোব। 

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী