‘মৃত’ ঘোষণার পরও মানুষ কেন জেগে ওঠে?

ঢাকা, রোববার   ২২ মে ২০২২,   ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ২০ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

‘মৃত’ ঘোষণার পরও মানুষ কেন জেগে ওঠে?

বিজ্ঞান ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:০০ ২৪ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৩:৪০ ২৯ জানুয়ারি ২০২২

‘মৃত’ ঘোষণার পরও মানুষ কেন জেগে ওঠে?

‘মৃত’ ঘোষণার পরও মানুষ কেন জেগে ওঠে?

২০২০ সালের ১৬ অক্টোবরের ঘটনা। সকালবেলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক মেয়ে শিশুর জন্ম দেন শাহিনুর বেগম নামে এক নারী। জন্মের পরপরই নবজাতকটিকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক।

এখানেই হয়তো ঘটনাটি শেষ হতে পারতো। তবে সেটি হয়নি। শিশুটির বাবা ইয়াসিন মোল্লা শিশুটিকে দাফন করতে কবরস্থানে নিয়ে যান। আর সেখানেই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। দাফনের আগেই নড়ে ওঠে শিশুটি। টের পেয়ে তখনি শিশুটি আবার ফিরিয়ে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে দেয়া হয় চিকিৎসা।

বিভিন্ন সময়ে এরকম আরো বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে। ফরিদপুর জেলার আলীপুরে ২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এমন আরেকটি ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, জন্মের কিছুক্ষণ পর শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন স্থানীয় একটি হাসপাতালের চিকিৎসক। পরে কবর দেয়ার আগে হঠাৎ করেই কেঁদে ওঠে শিশুটি।

আরেকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ২০১৮ সালের এপ্রিলে। তখনও এক নবজাতক কন্যা শিশুকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করার পর দাফনের আগে গোসল করাতে গেলে কান্না শুরু করে শিশুটি। পরে তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

‘মৃত’ ঘোষণা করার পর জেগে ওঠার বা জীবিত হওয়ার এই ঘটনাকে বলা হয় ‘ল্যাজারাস সিনড্রোম’। ল্যাজারাস সিনড্রোম নিয়ে কাজ করেন রাজধানী ঢাকার ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাস্কুলার সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. সাকলায়েন রাসেল।

সম্প্রতি তিনি তার একটি বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ বিষয়ে তার একটি ভিডিও পোস্টের নিচে কমেন্ট করেছেন অনেকে। যাদের মধ্যে অন্তত চার থেকে পাঁচজন দাবি করেছেন যে, তাদের নিকট-আত্মীয় কিংবা পরিচিত জনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে।

ল্যাজারাস সিনড্রোম কী?

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরী অব মেডিসিন এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ এর তথ্য অনুযায়ী, ল্যাজারাস সিনড্রোমকে বর্ণনা করা হয় এভাবে, কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর দেয়া শেষ করার পর দেহের সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফিরে আসা বা রিটার্ন অব স্পনটেনিয়াস সার্কুলেশন-আরওএসসি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রথম ১৯৮২ সালে এ ধরণের ঘটনার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর ১৯৯৩ সালে এই ঘটনাগুলোকে ল্যাজারাস সিনড্রোম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এই নামটি নেয়া হয়েছিল বাইবেলে বর্ণিত ল্যাজারাস নামে এক ব্যক্তির কাহিনি থেকে। বলা হয় যে, ল্যাজারাসকে তার মৃত্যুর চার দিন পর জীবিত করেছিলেন যিশু খ্রিস্ট। ওই ঘটনার সঙ্গে মিল রেখে এমন ব্যাপার ঘটলে তাকে চিকিৎসকরা বলে ল্যাজারাস সিনড্রোম

জার্নাল অব দ্য রয়াল সোসাইটি অব মেডিসিন এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে ল্যাজারাস ফেনোমেনা বিষয়ে বলা হয়, এখনো পর্যন্ত ৩৮টি ল্যাজারাস সিনড্রোমের ঘটনাকে নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

তবে এই প্রতিষ্ঠানটির মতে, এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যেগুলো কখনো নথিবদ্ধ হয়নি। এ রকমের অনেক ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের খবরে প্রায়ই দেখা যায় বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

যে ৩৮টি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে মেডিকেল জার্নালগুলোতে - তাদের মধ্যে সাত জন বাদে বাকিদের গড়ে ২৭ মিনিট ধরে সিপিআর দেয়া হয়েছিল।

এই ৩৮ জনের মধ্যে ১৭ জন জেগে উঠার পরপরই আবার মারা যায়। বাকি ১৭ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। এদের মধ্যে তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আর ১৪ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। বাকি চারজন রোগীর ক্ষেত্রে তেমন কোন তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

ল্যাজারাস সিনড্রোম কি নতুন ধারণা?

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ল্যাজারাস সিনড্রোমকে নথিবদ্ধ করা হয় ১৯৮২ সালে। তবে এর অনেক আগে থেকেই এ ধরণের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

আমেরিকান লেখক এডগার অ্যালান পো ১৮৪৪ সালে তার বিখ্যাত রোমহর্ষক একটি ভৌতিক উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন ‘দ্য প্রিম্যাচিওর বারিয়াল’ নামে। এই বইটির কাহিনীতে বলা হয়, এক তরুণ গৃহবধূকে ভুলবশতঃ মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে তাকে একটি কফিনে করে পারিবারিক ভল্টে রাখা হয়। কয়েক বছর পর ওই ভল্টটি খোলা হয় আরেকটি কফিন রাখার জন্য। তখন ওই ভল্টের দরজার কাছে কাপড়ে মোড়া একটি কংকাল পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় যে, ওই গৃহবধূ হয়তো তখন মারা যাননি। বরং বেঁচে উঠে পরে ভল্টের দরজা খুলতে না পেরে মারা গেছেন। মূলত এই গল্পটি ওই সময়কার একটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে লেখা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ এর তথ্য অনুযায়ী, সেই সময়েও অর্থাৎ ১৮০০ শতকেও জীবন্ত কবরস্থ হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল মানুষের মধ্যে। আর এজন্যই অনেকে মৃত্যুর আগে করা উইলে উল্লেখ করতেন যে, দাফন করার আগে যেন পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। জীবন্ত দাফন হয়ে যাওয়ার এই ভয়কে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘টাফোফোবিয়া’।

কেন মৃত মানুষ জেগে উঠে ?

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরী অব মেডিসিন এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ এর তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যু কোনো একটি ঘটনা নয়, বরং এটি একটি প্রক্রিয়া।

১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যের মেডিক্যাল রয়াল কলেজেস এর এক কনফারেন্সের পর যে স্মারকলিপি দেয়া হয়ে সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, মৃত্যু হচ্ছে এমন প্রক্রিয়া যেখানে জীবনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যায়। দেহের সঞ্চালন ও শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এর একটি উদাহরণ।

মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার শারীরিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে হৃৎস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর তাই সিপিআর এবং আরওএসসি বা আবার প্রাণ ফিরে আসার মাঝের সময়টাতে কাউকে মৃত বলে ঘোষণা করা যেতেই পারে।

কাদের 'মৃত্যু' থেকে জেগে ওঠার সম্ভাবনা থাকে?

হাসপাতাল ভর্তি অবস্থায় যারা মারা যান তাদের মধ্যে এই 'মৃত' থেকে জেগে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এর কারণ, হাসপাতালে যারা মারা যান তাদেরকে মৃত্যুর আগে আগে সিপিআর দেয়া হয়। এছাড়া জীবন বাঁচাতে সহায়ক নানা ধরণের ইনজেকশনও দেয়া হয়। যাদের সিপিআর দেয়া হয়, ইনজেকশন দেয়া হয়, সেটা বয়স, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, তাদের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে বাসায় বা গ্রামে মৃত্যুবরণকারী যারা আবার জেগে ওঠেন - তাদের ক্ষেত্রে নানা কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ বোঝেও না যে ওই ব্যক্তি আসলেই মারা গেছে কিনা। সে হয়তো অজ্ঞান হয়ে থাকতে পারেন, অনেক সময় মানুষ তাদের মৃত ভেবে বসতে পারে।

কিভাবে জেগে ওঠে মানুষ?

ল্যাজারাস সিনড্রোমের আরেকটি ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারে। সেখানে ক্যারল ব্রাদার্স নামে ৬৩ বছর বয়সী এক নারীর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ৪৫ মিনিট পর আবার জেগে ওঠেন তিনি।

এ বিষয়ে নিউ ইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটির রিসাসিটেশন রিসার্চ বা পুনরুত্থান গবেষণা বিষয়ক বিভাগের পরিচালক ডা. স্যাম পারনিয়া তখন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘৪৫ মিনিট খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং এই সময়ের মধ্যে অনেক মানুষই তাকে মৃত বলে জেনেছে। কিন্তু এখন আমরা জানি যে, অনেক মানুষ রয়েছে যারা মৃত ঘোষণা করার তিন, চার বা পাঁচ ঘণ্টা পর ফিরে এসেছে এবং স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করছে।’

ডা. স্যাম পারনিয়া বলেন, বেশিরভাগ মানুষ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে মৃত্যুর সমার্থক বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু এটা আসলে চূড়ান্ত কিছু নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে মনে করা হয় যে, যদি কারো হৃদযন্ত্র ২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকে তাহলে তার মস্তিষ্কে অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এই ক্ষতিও এড়ানো সম্ভব ভালো মানের সিপিআর এবং জেগে ওঠার পরবর্তী চিকিৎসার মাধ্যমে।

ডা. স্যাম পারনিয়া তার ল্যাজারাস ইফেক্ট নামে একটি বইয়ে লিখেছেন, রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সেটি নষ্ট হয়ে যায় না। বরং এক ধরণের হাইবারনেশনে চলে যায়। এটি মূলত মস্তিষ্ক নষ্ট যাওয়া রোধের একটি নিজস্ব উপায়।

এই হাইবারনেশনে থাকা মস্তিষ্ক জেগে ওঠার মুহূর্ত খুবই বিপদজনক। কারণ এই সময়ে মস্তিষ্কে যে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয় সেটি বিষাক্ত হয়ে পড়তে পারে। আর এটি রোধে রোগীর দেহ ৩৭ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখার কথা বলেন ডা. স্যাম পারনিয়া।

কেউ ‘মৃত’ থেকে জেগে উঠলে কী করতে হবে?

চিকিৎসকদের নির্দেশনা দেয়া থাকে যে, কাউকে সাথে সাথে না মৃত ঘোষণা না করে ধাপে ধাপে মৃত্যুর সব উপসর্গ নিশ্চিত হয়ে তারপর তাকে মৃত ঘোষণা করা উচিত। আর এর জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে অন্তত ১০ মিনিট সময় নেয়ার কথা বলা হয়। তবে সাবধানতার জন্য কাউকে মৃত ঘোষণা করার আগে অন্তত ৩০ মিনিট সময় নেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে তাকে পর্যবেক্ষণ করা হয় যে আসলেই তিনি মারা গেছেন কিনা।

তবে কারো মধ্যে যদি ল্যাজারাস সিনড্রোম থাকে বা কেউ যদি 'মৃত' অবস্থায় যাওয়ার পর আবার জেগে ওঠেন - তাহলে তাকে একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। তার মধ্যে শারীরিক বা মানসিক কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে কিনা সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া উচিত।

বেশিরভাগ সময়েই হাসপাতালে যারা জেগে ওঠেন তারা কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার মারা যান। তবে অনেকেরই জেগে ওঠার পর বছরের পর বছর সুস্থ অবস্থায় বেঁচে থাকার কথা শোনা গেছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »