পৃথিবীতেই মঙ্গল অভিযান, ছয় নভোচারীকে আটকে রাখা হলো ৫২০ দিন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

পৃথিবীতেই মঙ্গল অভিযান, ছয় নভোচারীকে আটকে রাখা হলো ৫২০ দিন

‌বিজ্ঞান ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৭ ১৯ এপ্রিল ২০২১  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মহাকাশে নভোচারীদের জীবনযাপন নিয়ে আমাদের কৌতূহলের শেষ নেই। তারা সেখানে কীভাবে খাওয়াদাওয়া করেন, ঘুমান অথবা কীভাবে প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারনি; এসব নিয়ে অনেকেই ভাবেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বেঁচে থাকার আনন্দ কিংবা লড়াইটা কেমন, সেটা পৃথিবীতে বসেই বুঝতে পেরেছিলেন ছয় ন‌ভোচারী। এক মাস কিংবা এক বছর নয়, তাদেরকে গুনে গুনে মহাকাশযানের মতো একটি জায়গায় ৫২০ দিন আটকে রাখা হয়েছিল।

ঘটনাটা সাধারণ মানুষের কাছে খুবই অবাক করার মতো বিষয়। পৃথিবীর ম‌ধ্যে থেকেও মহাকাশের রুটিনে ১৮ মাসেরও বেশি সময় কাট‌ানো চা‌ট্টিখানি কথ‌া নয়! তবে এর নেপথ্যে বড় একটা স্বার্থ রয়েছে, মঙ্গলে কোনো অভিযান চালানোর সময় নভোচারীরা কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে সে বিষয়ে ধারণা অর্জন করা।

সময়টা ২০১০ সাল। এই পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য আবেদন করতে বলা হয়ে‌ছিল। প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আবেদনপত্র জমা‌ দেন। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয় মাত্র ছয়জনকে; তিনজন রুশ, একজন ফরাসী, একজন চীনা। আর দিয়েগো একজন ইতালিয়ান-কলাম্বিয়ান। এরা সবাই প্রকৌশল কিম্বা চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকেই পরীক্ষামূলক এই মঙ্গল অভিযান চ‌ালানো হয়। অভিয‌ানের নাম দেয়া হয়েছিল 'মার্স ৫০০'। সেই বছরের ৩ জুন ওই ছয়জনকে একটি নকল মহাকাশযানের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এটি ছিল মস্কোর একটি বিশাল গুদাম-ঘরের ভেতরে।

তাতে অংশ নেওয়া একজন দিয়েগো ওবিনা বলেন, প্রথম দিন নিজেদেরকে খুবই ক্ষুদ্র মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এরকম একটি জায়গায় আমরা এতো দীর্ঘ সময় কিভাবে থাকবো! কিন্তু ধীরে ধীরে এই পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করলাম।

কেমন ছিল দিনগুলো?

প্রত্যেকের জন্য বানোয়াট মহাকাশে তিন বর্গমিটার জায়গা নির্ধারিত ছিল। একটা লিভিং রুম ছিল যেখানে অবসর সময়ে বিশ্রাম নিতেন তারা। আলাদা করে একটা খাওয়ার জায়গা ছিল। দিনের একটা সময়ে সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়ে গল্প করতো। ওষুধপত্র রাখার জন্য একটা জায়গা ছিল। আরেকটা জায়গা ছিল খাদ্যদ্রব্য রাখার। ব্যায়ামের জন্য কিছু যন্ত্রপাতিও ছিল। আরো ছিল ছোট্ট একটা গ্রিন হাউজ।

এই পরীক্ষায় তাদেরকে এমনভাবে রাখা হয়েছিল যেন মনে হয় যে তারা সত্যিকার অর্থেই মঙ্গলগ্রহের অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এসময় তারা পরীক্ষা চালাবে, কন্ট্রোল রুম থেকে বার্তা গ্রহণ করবে, বার্তা পাবে প্রিয়জনদের কাছ থেকেও। এমনকি মঙ্গলের পৃষ্ঠেও তারা অবতরণ করবে।

এসময় তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে তার ওপর সারাক্ষণ নজর রাখা হচ্ছিল। চালানো হচ্ছিল নিয়মিত পরীক্ষা। তাদেরকে শারীরিক কিছু নমুনাও দিতে হতো পরীক্ষা করার জন্য।

দিয়ে‌গো ওবিনা বলেন, শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত ছিলাম না। জানতাম না যে এরকম একটি অবস্থায় আমরা আসলে ঠিক কীভাবে সাড়া দিতে পারি। সেসব জানতে আমি খুব আগ্রহী ছিলাম।

বেশকিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনারও সাক্ষী হয়েছেন তারা। এরকম একটি ঘটনার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তারা আমাদের বলল যে বাইরে আগুন লেগেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হলো। সব বন্ধ হয়ে গেল! খাবার দাবার যাতে নষ্ট হয়ে না যায় সেজন্য আমরা ব্যস্ত হয়ে গেলাম। লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমও কাজ করছিল না। বাতাস পরিশোধনের যন্ত্রটিও বন্ধ হয়ে গেল। আমরা জানতে চাইলাম ভেতরে যে বাতাস আছে সেটা দিয়ে আমরা কতদিন বেঁচে থাকতে পারব। হিসেব করে দেখা গেল যে আরো কয়েকদিন বেঁচে থাকার জন্য সেখানে যথেষ্ট বাতাস ছিল।

কিন্তু পরে তারা জানতে পারলেন যে আসলে এরকম কোন পরিস্থিতিই তৈরি হয়নি। এটা ছিল এই পরীক্ষারই অংশ।

আট মাস পরে তাদের মধ্যে তিনজনকে মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করার পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছিল। দিয়েগো ছিলেন তাদের একজন। এজন্য তাদেরকে একটি ল্যান্ডারে দুই সপ্তাহের জন্য আলাদা করে রাখা হয়। এরপর তারা স্পেস স্যুট পরে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্টে নেমে আসেন। গুদাম ঘরে প্রচুর বালি ফেলে মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সবাই এটাকে মঙ্গল গ্রহ বলেই মনে করেছিলেন।

‌ফিরে এসে পেয়েছেন নতুন এক পৃথিবী

২০১১ সালের নভেম্বরে তারা বেরিয়ে আসেন মহাকাশযান থেকে। যেন তারা সত্যিই মঙ্গল অভিযান থেকে ফিরে এসেছেন। সেখান থেকে বের হয়ে দেখলেন তাদের সামনে দাঁড়িয়েছিল একদল মানুষ। তারা তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

দিয়েগো বলেন, একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল। কারণ দেড় বছরের জন্য আমরা কোনো মানুষ দেখিনি। আমি যখন দেখলাম, তাদেরকে আমার বাস্তব মানুষ বলে মনে হয়নি। আমার পরিবারকে আবার দেখতে পেলাম। এই প্রথম আমি আবার সূর্য দেখছি, একটা কুকুর দেখতে পেলাম। এই প্রথম একটা শিশুকে দেখলাম। এটা ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত।

এমনভাবে আরেকবার বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে রাজি নন দিয়েগো ওবিনা। তবে তাকে যদি সত্যি সত্যি মঙ্গলে পাঠানো হয়, তার জন্য তিনি আনন্দ নিয়েই যাবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে