বাড়িতে না বলে মহাকাশে গিয়েছিলেন প্রথম মহাশূন্যচারী

ঢাকা, বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ২ ১৪২৮,   ০১ রমজান ১৪৪২

ইউরি গ্যাগারিনের জন্মদিন আজ

বাড়িতে না বলে মহাকাশে গিয়েছিলেন প্রথম মহাশূন্যচারী

বিজ্ঞান ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৮ ৯ মার্চ ২০২১  

প্রথম মহাশূন্যচারী ইউরি গ্যাগারিন। ছবি: সংগৃহীত

প্রথম মহাশূন্যচারী ইউরি গ্যাগারিন। ছবি: সংগৃহীত

১২ এপ্রিল, ১৯৬১ সাল। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে মানব সভ্যতা মহাকাশ যুগে প্রবেশ করে। আর এই যুগসন্ধিক্ষণের ঘটনাটি ঘটেছিল তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার বৈমানিক ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশ ভ্রমণের মাধ্যমে। সয়ুজ নামের এক মহাকাশযানে চড়ে পৃথিবীর প্রথম প্রতিনিধি হিশেবে মহাশূন্যে যান তিনি।

ইউরি গ্যাগারিনে সয়ুজের ভস্তক ক্যাপসুলে আবস্থান করে ১০৮ মিনিট ধরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেন। নাম লেখান মহাশূন্যচারী প্রথম মানুষ হিসেবে। এ ঘটনা মানবসভ্যতার ইতিহাসে শুরু হয় একটি নতুন যুগ, যার নাম মহাকাশ যুগ। এ মহাকাশ যুগ যার হাত ধরে শুরু, আজ ৯ মার্চ তার জন্মদিন।

বাড়িতে না বলেই ছুটলেন মহাকাশে

ইউরি গ্যাগারিন যে সেদিন মহাকাশে পাড়ি দেবেন, তা পরিবারের কেউই জানতেন না। ‘বাইরে একটু কাজ আছে, কয়েকদিন পরই ফিরবো’—এমনটা বলেই তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। সেদিন ২৭ বছর বয়সী ইউরি গ্যাগারিন কাজাখস্তানের রকেট উ্রক্ষেপন কেন্দ্রে ৩০ মিটার উঁচু রকেটে বসে মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যখন স্থানীয় সময় ঠিক ৯ টা ৭মিনিটে রকেটটি উৎক্ষেপন করা হয়, তখন গ্যারিন বলে উঠলেন– ‘চলো, যাই!’

মহাকাশ যুগ ইউরি গ্যাগারিনের হাত ধরে শুরু। ছবি: সংগৃহীত

১৯৫৫ সালে কারিগরী বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেন ইউরি গ্যাগারিন। এরপর ওরেনবার্গে পাইলট’স স্কুলে যুদ্ধবিমান চালনা প্রশিক্ষণে ভর্তি হন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনর পর তাকে নরওয়ের সীমান্তের কাছে লুওস্তারি এয়ারবেসে নিয়োগ করা হয়, যেখানে খারাপ আবহাওয়ার জন্য বিমান চালানো বেশ ঝুকিপূর্ণ ছিল।

ইউরি গ্যাগারিন সোভিয়েত বিমান বাহিনীতে লেফটেনেন্ট পদ লাভ করেন ১৯৫৭ সালের ৫ নভেম্বর। তার ঠিক দুই বছর পরই তিনি সিনিয়র লেফটেনেন্ট পদে পদন্নতি পান। গ্যাগারিনের পরবর্তী পদোন্নতিই মিলে যায় ঋত্বিক ঘটকের ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-সিনেমার কাঞ্চন চরিত্রের মতোই!

বাবা একদমই বিশ্বাস করলেন না!

গ্যাগারিন যখন রকেট চেপে বসেন, তখন তার গ্রাম ক্লুসিনোতে কেউ একজন শোনেন এক ব্যক্তি প্রথমবারের মত মহাশূন্যে পাড়ি দিচ্ছেন। আর সেই মানুষটি ইউরি গ্যাগারিন। মানুষটি আর কিছু না ভেবেই তার বাবা অ্যালেক্সে ইয়ানোভিচ গ্যাগারিনকে খবর দেন। কিন্তু বাবা বিশ্বাস করলেন না! বললেন, ‘আমার ছেলে কাজের প্রয়োজনে বাইরে আছে।’

ইউরি গ্যাগারিন ফেরার পর মস্কোতে সোভিয়ত সরকার রেড স্কোয়ারে এক বিশাল উৎসবের আয়োজন করে। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু ততক্ষণে আরও মানুষ ইউরি গ্যাগারিনের বাবার কাছে একই খবর নিয়ে আসলেন। তখনই তার বাবা চটে গিয়ে গ্রামের পোস্ট অফিসে যান। জানতে চাইলেন এ বিষয়ের বিস্তারিত খবর। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছেলে মহাকাশে যায়নি। ছেলে যে মহাকাশে গিয়ে ফিরে এসেছে এসব তার ধারণার বাইরে।

খবর নিয়ে পোস্ট অফিসের এক কর্মকর্তা উল্লসিত হয়ে ইউরি গ্যাগারিনের বাবার সামনে আসেন। তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন যে, আর কাউকে কোথাও খোঁজ করতে হবে না। যে ছেলের খোঁজ চলছে তার বাবা স্বয়ং তার সামনে রয়েছেন। এই কথা বলেই তিনি তার হাতে ফোন ধরিয়ে দিন ঊর্ধ্বতন কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য। ছেলে এসব করে ফেলেছে তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু ঘটনা তো বাস্তব।

নামতে দেখেন ট্রাক চালক

গ্যাগারিন পৃথিবী থেকে ৩২৭ কিলোমিটার দূরে মহাকাশে ১০৮ মিনিট অবস্থানের পরে ইউরি গ্যাগারিন রাশিয়ার সারাতব অবলাস্টের ছোট্ট গ্রাম স্মেলকোভকায় অবতরণ করেন। ইয়াকভ লুসেস্কো নামের এক ট্রাক চালক গ্যাগারিনকে দেখন প্যারাসুট করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। গ্যাগারিন যেখানে অবতরন করেন সেই গ্রামের এক মহিলা এবং তার শিশুকন্যা ইউরিকে আকাশ থেকে নেমে আসতে দেখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলেন। মহিলা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কী পৃথিবীর বাইরে থেকে এসেছো?’ ইউরি গ্যাগারিন বলেছিলেন , ‘হ্যাঁ’।

ইউরি গ্যাগারিন এখনও রাশিয়ান নায়ক। ছবি: সংগৃহীত

গ্যাগারিন মস্কোতে ফিরলে সোভিয়ত সরকার রেড স্কোয়ারে একটি বিশাল উৎসবের আয়োজন করে। তার ছেলে সার্গে ক্রুশচেভ বলেন এই ঘটনার ঐতিহাসিক চরিত্র আর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, মস্কোর বাসিন্দারা যেভাবে সেই উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন, রাস্তায় ভিড় করে, বাড়ি-ঘরের ছাদে দাঁড়িয়ে, জানালার কাছে জড়ো হয়ে...! আমি সেই উৎসবকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ের দিবসের সঙ্গে তুলনা করবো।

মহাকাশ ভ্রমণের জন্য ২৭ বছর বয়সেই তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের নায়কে পরিণত হন এবং দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে গ্যাগারিন মিগ-১৫ ইউটিআই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। যা নিয়ে অবশ্য এক অমীমাংসিত রহস্যও রয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে