বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সন্ধান, ধূমকেতুর চারপাশে জ্যোতির্বলয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৭ ১৪২৭,   ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সন্ধান, ধূমকেতুর চারপাশে জ্যোতির্বলয়

বিজ্ঞান ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪২ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:৪৬ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সন্ধান, ধূমকেতুর চারপাশে জ্যোতির্বলয়|

বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সন্ধান, ধূমকেতুর চারপাশে জ্যোতির্বলয়|

এই প্রথম ধূমকেতুর চারপাশে দেখা মিলেছে এক ধরনের জ্যোতির্বলয়ের। পৃথিবীতে ‘অরোরা’ বা মেরুজ্যোতি বা মেরুপ্রভার মতোই একই ঘটনা ঘটে গেলো ধূমকেতুতেও। আর এটিকে মহাজাগতিক বিরল ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (এসা) মহাকাশযান ‘রোসেটা’র পাঠানো ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করেই ‘৬৭পি/শুর্যুমোভ-গেরাশিমেঙ্কো’ ধূমকেতুতে এমন দৃশ্যের দেখা মেলে।

গত সোমবার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-তে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

আনন্দবাজার ডিজিটালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আজ থেকে ছয় বছর আগে ধূমকতুতেই প্রথম পা রাখে মানবসভ্যতা। যদিও নামার সময় ধূমকেতুর পিঠের খাঁজে আটকে পড়ে নিষ্ক্রিয় হয় ল্যান্ডার ‘ফিলি’। যে যন্ত্রের মাধ্যমে ধূমকেতু ‘৬৭পি/শুর্যুমোভ-গেরাশিমেঙ্কোর’ অরোরার প্রথম সন্ধান মিলেছে, সেটি নাসার জেট প্রোপালসন ল্যাবরেটরি (জেপিএল)-তে বানানো হয়েছিল। তার নাম ‘মাইক্রোওয়েভ ইনস্ট্রুমেন্ট ফর রোসেটা অরবিটার (মাইরো)’।

গবেষকেরা জানান, গ্রহ, উপগ্রহ ছাড়া এই প্রথম কোনো মহাজাতিক বস্তু থেকে অরোরার মতো তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ বেরিয়ে আসার ঘটনা দেখা গেছে। 

তরঙ্গ দৈর্ঘ আর কম্পাঙ্কের ভেদাভেদে আলোক-বর্ণালীতে দৃশ্যমান আলো ছাড়াও আল্ট্রাভায়োলেট রে বা অতিবেগুনি রশ্মি ও ইনফ্রারেড রে বা অবলোহিত রশ্মি থাকে। অতিবেগুনি রশ্মির কম্পাঙ্ক সবচেয়ে বেশি (সবচেয়ে কম তরঙ্গদৈর্ঘ) আর অবলোহিত রশ্মির কম্পাঙ্ক সবচেয়ে কম (সবচেয়ে বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ)। দৃশ্যমান আলোয় যেমন সাতটি রঙ থাকে তেমনই অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মিতেও নানা রঙ থাকে। তবে সেগুলোর কোনোটিই খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়।

গবেষকেরা আরো জানান, ‘৬৭পি/শুর্যুমোভ-গেরাশিমেঙ্কো’ ধূমকেতুতে যে অরোরা দেখা গিয়েছে, তার আলো অতিবেগুনি রশ্মির সুদূর প্রান্তে (‘ফার-আলট্রাভোয়ালেট রে’)।

মানবসভ্যতা ‘৬৭পি/শুর্যুমোভ-গেরাশিমেঙ্কো’ ধূমকেতুতেই প্রথম পা রাখে 

২০০৪ সালে প্রথম কোনো ধূমকেতুতে প্রথম পা রাখার জন্য রোসেটা মহাকাশযানের উৎক্ষেপণ হয়েছিল এসা। ১০ বছর ধরে মহাকাশে ছুটে ২০১৪ সালে রোসেটা ধূমকেতু ‘৬৭পি/শুর্যুমোভ-গেরাশিমেঙ্কোর’ কক্ষপথে ঢুকে পড়ে। তার পর রোসেটায় থাকা ল্যান্ডার ‘ফিলি’ ধূমকেতুতে পা ছোঁয়ায় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে।

পৃথিবীতে মেরুজ্যোতি হয় কেন?

প্রতি মুহূর্তেই সূর্য থেকে বেরিয়ে পৃথিবী-সহ সৌরমণ্ডলের সব প্রান্তে ছুটে যাচ্ছে সৌরবায়ু। এ সৌরবায়ুতে অত্যন্ত শক্তিশালী সৌরকণা রয়েছে। কোনো গ্রহ বা উপগ্রহের বায়ুমণ্ডলের একবারে উপরের স্তরে থাকা কণাগুলোর সঙ্গে সৌরকণাদের সংঘর্ষ হয়। এতে সেই গ্রহ বা উপগ্রহগুলোর উপকারই হয়। বায়ুমণ্ডল সৌরকণাদের রুখতে না পারলে পৃথিবীতে প্রাণ থাকা অসম্ভব হয়ে যেত। 

 ‘৬৭পি/শুর্যুমোভ-গেরাশিমেঙ্কোর’ ধূমকেতু

এ সৌরকণাগুলোতে বৈদ্যুতিক আধান (‘চার্জ’) থাকে। চৌম্বক ক্ষেত্রও থাকে । তাই যে গ্রহের (যেমন পৃথিবী) মোটামুটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে তার সঙ্গে এই সৌরকণাদের সংঘর্ষ হলেই আলোর মতো তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের জন্ম হয়। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তার দুই মেরুতেই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। তাই পৃথিবীর উত্তর আর দক্ষিণ মেরুতেই এই অরোরা বা মেরুজ্যোতি দেখা যায়। যাদের আমরা যথাক্রমে বলি ‘নর্দার্ন লাইটস’ আর ‘সাদার্ন লাইটস’। যা সাদা, সবুজ, লাল, বেগুনি নানা রঙয়ে বা তাদের মিশেলে দেখা যায়।

ধূমকেতু জুড়েই অরোরা কেন?

মূলত নাসার বানানো যে দুটি যন্ত্রের মাধ্যমে ধূমকেতুতে অরোরার প্রথম সন্ধান মেলে, সেই ‘মাইরো’ প্রজেক্টের অন্যতম সদস্য নাসার জেপিএল-এ সিনিয়র সায়েন্টিস্ট গৌতম চট্টোপাধ্যায়।

তিনি বলেন, ধূমকেতুতে বরফ, গ্যাস আর পাথর থাকে। দূরে থাকলে সেই বরফ জমাট বেঁধে থাকে। আর ধূমকেতুগুলো যত সূর্যের কাছে আসে ততই সেই বরফ গলে গিয়ে পানিব বিন্দু হিসেবে মহাকাশে ছড়িয় পড়ে। তাতেই ধূমকেতুর লেজ তৈরি হয়। নানা ধরনের পদার্থ গ্যাসীয় অবস্থায় ধূমকেতুর মাথার দিকেই থাকে। ধূমকেতুর একটা গ্যাসের আবরণী তৈরি করে এরা (নানা ধরনের পদার্থ গ্যাস)। যাকে বলা হয় ‘কোমা’।
 
সৌরবায়ুতে প্রচুর পরিমাণে ইলেকট্রন কণা থাকে। সেগুলোর সঙ্গে ধূমকেতুর গ্যাসের কণাগুলোর সংঘর্ষ হয়। সেই সৌরকণারাই ধূমকেতুর বরফ থেকে তৈরি হওয়া পানির বিন্দুগুলোকে ভেঙে দেয়। ভেঙে দেয় গ্যাসে থাকা অন্যান্য অণুগুলোকেও। ফলে ধূমকেতু থেকে অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ বেরিয়ে আসছে। যা আসলেই ধূমকতুর অরোরা। ধূমকেতুর কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র নেই। তাই ধূমকেতুর চারপাশেই সেই অরোরা দেখা যায়।

মহাকাশের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সহায়ক হবে

কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্স (আইসিএসপি)’-এর কর্মকর্তা জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী জানান, ধূমকেতুতে প্রথম অরোরার সন্ধান পাওয়ার চেয়েও সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার বিকিরণের ভিন্নতা। যা সৌরবায়ুতে থাকা ইলেকট্রন কণাদের ঘনত্ব বোঝা সম্ভব হবে। ঘনত্ব বেশি থাকায় সংঘর্ষের ঘটনা বেশি হয় বলেই বিকিরণ তীব্রতর হচ্ছে। এটা আগামী দিনে মহাকাশের আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে বিজ্ঞানীদের আরো সহায়তা করবে। 

পানি বিন্দু ও অতিবেগুনি রশ্মিতে থাকবে নজর

সন্দীপের ভাষ্য, ধূমকেতুর অভিকর্ষ বল মোটেই শক্তিশালী নয়। তাই তারা বায়ুমণ্ডলও ধরে রাখতে পারে না। গ্যাসগুলোকেও ধরে রাখতে পারে না। সেই গ্যাসের কণা কোথায় কতটা পরিমাণে ভাঙবে সেটাও নির্ভর করে তার উপর কী পরিমাণে সৌরবায়ু এসে পড়ছে। সেখানকার সৌরবায়ুতে সৌরকণাদের ঘনত্ব কতটা তার উপর। তাই অতিবেগুনি রশ্মির কমা-বাড়া থেকেই সৌরবায়ুতে থাকা ইলেকট্রন কণাদের ঘনত্ব নিখুঁতভাবে জানা যাবে বলে সন্দীপের মনে হয় না। তার জন্য দুটি ঘটনাকেই মিলিয়ে দেখতে হবে। তাই মহাকাশের আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাসের জন্য ধূমকেতুর পানি বিন্দুর পরিমাণ ও তার অরোরার অতিবেগুনি রশ্মির তীব্রতার বাড়া-কমা, দুটির উপরেই নিয়মিত নজর রাখা জরুরি।

এসা-র রোসেটা অভিযানের গবেষণার সঙ্গে ১০ বছর ধরে জড়িত শিলচরের অসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অশোক সেন।

তিনি বলেন, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। কারণ, সৌরবায়ু কীভাবে কোনো গ্রহ, উপগ্রহের বায়ুমণ্ডলের উপর কোথায় কী পরিমাণে আঁছড়ে পড়ে, এই গবেষণায় প্রথম তা সবিস্তারে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে বায়ুমণ্ডল থাকা সৌরমণ্ডলের কোনো মহাজাগতিক বস্তুতে ভবিষ্যতে আমাদের অবতরণের জন্য এ গবেষণা অনেক সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ