নিজের সম্পর্কে আমরা কতটা জানি?

ঢাকা, বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৫ ১৪২৭,   ১২ সফর ১৪৪২

মনোবিজ্ঞান

নিজের সম্পর্কে আমরা কতটা জানি?

বিজ্ঞান ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১২ ৭ সেপ্টেম্বর ২০২০  

নিজের সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু জানি না। ছবি: সংগৃহীত

নিজের সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু জানি না। ছবি: সংগৃহীত

‘নিজেকে জানো’–সক্রেটিসের এ পন্থাটি যথেষ্ট ছিল। তবুও সত্যিকার অর্থে আমরা নিজের সম্পর্কে খুবই কম জানি। প্রতিনিয়ত অন্যের বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা করতেই কম-বেশি ভালোবাসি। আরেকজনের ভালো, খারাপ, প্রশংসা, নিন্দাসহ বেশ কিছু উপর্সগ কিংবা অনুসর্গ আমরা ধরতে পারলেও নিজের সম্পর্কে বেশি কিছু জানি না।

আমরা কীভাবে পৃথিবীকে উপলব্ধি করি এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ করি তার উত্তর দীর্ঘদিন ধরেই জানার চেষ্টা করে আসছেন মনোবিজ্ঞানীরা। এ কাজে তারা বেশ সফল হয়েছেন। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অনেক কারণ তারা উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। এ লেখায় মানুষের সাধারণ তিনটি প্রবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো; যা সচরাচর আমরা করে থাকি।

মন্দ কিছু ক্ষমতা আছে সবার মধ্যেই

মন্দ কাজ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে আমাদের সবার মধ্যেই। সুযোগ পেলেই আমরা মন্দ কাজ করে থাকি। আপনি হয়তো আশেপাশের জীবন থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা অনেক আগেই পেয়েছেন। মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত পরীক্ষা ছিল এটি।

সামাজিক অবস্থা কীভাবে মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে এ বিষয়ে স্ট্যানফোর্ড কারাগারে ১৯৭১ সালে গবেষণা করা হয়। নেতৃত্বে ছিলেন মনস্তাত্ত্বিক ফিলিপ জিম্বার্ডো। গবেষকরা এক হয়েছিলেন স্ট্যানফোর্ড সাই বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে। সেখানে একটি নকল জেল তৈরি করা হয়েছিল। নকল সেই জেলে বন্দী থাকার করার জন্য ২৪ জন স্নাতকোত্তর স্বেচ্ছাসেবককে বেছে নেয়া হয়েছিল। তারা এর আগে কোনো আপরাধ করেনি এবং মানসিকভাবে সুস্থ ছিল।

গবেষকরা লুকানো ক্যামেরা ব্যবহার করে বন্দীদের (যাদের ২৪ ঘণ্টা জেলে কাটাতে হয়) এবং গার্ড (যারা আট ঘণ্টা করে সময় ভাগাভাগি করে) পর্যবেক্ষণ করেন। যে গবেষণা দুই সপ্তাহ করার কথা ছিল; তা ৬ দিনেই স্থগিত করা হয়। আসলে কর্তৃপক্ষ স্থগিত করতে বাধ্য হয়। রক্ষীদের তীব্র কঠোর আচরণ এবং অনেক সময় তারা বন্দীদের উপর জঘণ্য মানসিক অত্যাচার চালাতো।

শুধুমাত্র বন্দী হওয়ার কারণে কয়েকটি নিরপরাধ মানুষকে পেতে হয়েছিল নির্মম সাজা। অন্যদিকে নিরপরাধ জেনেও রক্ষীরা মানসিক কিংবা দায়িত্বজনিত কারণে হোক তাদেরকে নিপীড়িত করেছে। এটাই আসলে মানুষের একটি অন্যতম সাধারণ প্রবৃত্তি। এতে প্রমাণিত, মানুষ সুযোগে অন্যায় করতে দ্বিধাবোধ করে না। আর এটাই মন্দ কাজ করার অদ্ভুত ক্ষমতা।

চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করি না

আপনি কি জানেন আপনার চারপাশে কী ঘটছে? আপনি নিজেও জানেন না আপনার আশেপাশে মানে চারপাশের সম্পর্কে কতটা কম খোঁজখবর রাখেন! ১৯৯৮ সালে  হার্ভার্ড এবং কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একটি কলেজ ক্যাম্পাসে পথচারীদের নিয়ে একটি মনোবিজ্ঞান পরীক্ষা করলেন। পরীক্ষাটির উদ্দেশ্য ছিল তাদের মধ্যে কতজন মানুষ আশেপাশের পরিবেশের দিকে লক্ষ করে।

পরীক্ষায় এক অভিনেতাকে গবেষকরা তাদের গবেষণা কাজে ব্যবহার করেছিলেন। সেই অভিনেতা পথচারীর কাছে গিয়ে একটা পথের খোঁজ করছিলেন। যখন পথচারীরা সেই পথের নির্দেশনা দিচ্ছিলো, ঠিক সেই সময় দুইজন লোক ওই অভিনেতা এবং পথচারীর মধ্যে একটি বড় কাঠের দরজা নিয়ে চলে গেলেন। যে কারণে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অভিনেতা এবং পথচারী একে অপরকে দেখতে পায়নি। এবং এই সময়ের মধ্যে অভিনেতাকে সরিয়ে সেখানে একই রকম আরেকজনকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেননি!

ক্ষমতা পেলে অপব্যবহার করি

ক্ষমতা থাকলে তার অপব্যবহার করা এক ধরনের মানসিক ব্যাধি। আমরা জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পছন্দ করি কিংবা ভালোবাসি। এটার নেপথ্যে সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যাও রয়েছে। ২০০৩ সালের এক গবেষণায় প্রকাশিত এক জার্নালের রিভিউ লেখার জন্য তিনজন ছাত্রকে পাঠানো হয়েছিল। কাগজপত্র লেখার জন্য দুই ছাত্রকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অন্যজনকে কাগজটির মূল্যায়ন করতে এবং প্রতিটি ছাত্রকে কতটা অর্থ প্রদান করা হবে তা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছিল।

তাদের কাজের মাঝখানে গবেষক একটি প্লেটে করে পাঁচটি কুকি (এক ধরণের খাবার) রাখলো। সাধারণভাবেই শেষ কুকিটা  কখনো খাওয়া হয় না (কারণ ওরা সব মিলে চারজন ছিল)। তবুও তাদের মধ্যে যে প্রধান, সে প্রায় সবসময় চতুর্থ কুকি খেয়ে থাকেন এবং শেষটাও তার ভাগ্যেই থাকে। ব্যাপারটা অনেকটা মানসিকভাবেই সবাই মেনে নেয় যে, যিনি প্রধান তিনিই বেশি ভাগ পাবেন। আবার প্রধানরাও মনের মধ্যে এই ধারণা পুষে রাখেন।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড্যাচার কেল্টনার বলেন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় গবেষকরা অনেক জনবলকে কাজে লাগান। বিভিন্নভাবে তাদের উপর প্রভাব খাটাতে পছন্দ করেন। তাদের চলাফেরা, পোষাক পরিচ্ছেদ, কথা বলার ভঙ্গি এমনকি খ্যাদাভাসেও। এই বিষয়টির জন্য আসলে গবেষণার খুব একটা প্রয়োজন হয় না। আমরা আমাদের আশেপাশে হরহামেশাই এসব ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ দেখতে পাই। এটা মানুষের এক ধরণের মানসিক ব্যাধি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে