সাহাবায়ে কেরাম কেন সত্যের মাপকাঠি

ঢাকা, বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৮,   ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

সাহাবায়ে কেরাম কেন সত্যের মাপকাঠি

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১৬ ২৫ নভেম্বর ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সহচরবৃন্দ 'সাহাবায়ে কেরাম'। দ্বীন ইসলামের জ্ঞান আহরণ ও প্রচার-প্রসারে যারা জীবন বাজি রেখে আমৃত্যু কাজ করেছেন। সেই সাহাবায়ে কেরাম আমাদের সাধারণ উম্মতের মতো নন। তাঁরা রাসুল (সা.) ও তাঁর উম্মতের মাঝে আল্লাহর তৈরি সেতুবন্ধনের মতো। তাঁদের মাধ্যম ব্যতীত উম্মতের কাছে কোরআন ও হাদীস এবং রাসুলের শিক্ষা পৌঁছার ভিন্ন কোনো পথ নেই।

তাই ইসলামে তাঁদের বিশেষ একটি মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের এই মর্যাদা ইতিহাসগ্রন্থের সত্যমিথ্যা মিশ্রিত বর্ণনা দ্বারা নয়; বরং কোরআন ও হাদীসের চিরসত্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন,

إنما المؤمنون الذين امنوا بالله و رسوله ثم لم يرتابوا و جهدوا بأموالهم و أنفسهم في سبيل اللهط أولئك هم الصدقون

'তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে। তারাই (সাহাবীগণ) সত্যনিষ্ঠ (বা সত্যবাদী)।' (সুরা হুজুরাত-১৫) অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,

ولكن الله حبب إليكم الإيمان و زينه في قلوبكم و كره إليكم الكفر و الفسوق و العصيانط أولئك هم الراشدون

'কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অন্তরে ঈমানের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, শিরক, পাপাচার ও নাফরমানির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তারাই (সাহাবীগণ) সৎপথ অবলম্বনকারী।' (সুরা হুজুরাত-৮)

আল্লাহ বলেন- 

وألزمهم كلمة التقوى وكانوا أحق بها

'আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য কালিমায়ে তাক্বওয়া তথা সংযমের দায়িত্ব অপরিহার্য করে দিলেন। বস্তুতঃ তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত।' (সুরা ফাত্হ-২৬) ‘কালিমায়ে তাক্বওয়া’ মানে তাওহীদ ও রিসালতের কালিমা। সাহাবায়ে কেরাম এই কালিমার অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত আখ্যা দিয়ে সেসব লোকের লাঞ্ছনা প্রকাশ করে দিয়েছেন, যারা তাঁদের প্রতি কুফর ও নিফাকের দোষ আরোপ করে।

তিনি আরো বলেন- 

أولئك هم المؤمنون حقا ط لهم درجت عند ربهم و مغفرة و رزق كريم

'এমন সব লোকই (সাহাবীরা) সত্যিকারের মুমিন (যাদের ভেতর ও বাহির এক রকম এবং মুখ ও অন্তর ঐক্যবদ্ধ)। তাদের জন্য রয়েছে স্বীয় পরওয়ারদিগারের নিকট সুউচ্চ মর্যাদা ও মাগফিরাত এবং সম্মানজনক রিজিক।' (সুরা আনফাল-৪)

হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- 

عن أبي سعيد الخدريرض قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا تسبوا أصحابي فلوا أن أحدكم أنفق مثل أحد ذهبا ما بلغ مد أحدهم و لا نصيفه (بخاري ص ৫১৮ و مسلم ص৩১০)

'আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তোমরা আমার সাহাবীগণকে গাল-মন্দ করো না। কেননা (তারা এমন শক্তিশালী ঈমান ও সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে,) তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও তাদের এক মুদ (৩ ছটাক প্রায়) কিংবা অর্ধমুদ (যব খরচ) এর সমান সওয়াবে পৌঁছুতে পারে না।' (বুখারী: ৩৩৯৭, মুসলিম:৪৬১০)

মুফতী শফী’ রহ. মাআ’রিফুল কোরআনে উল্লেখ করেছেন, হযরত জাবির রা. এর এক হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন, 'আল্লাহ  সারা জাহান থেকে আমার সাহাবীগণকে পছন্দ করেছেন।'

অন্য হাদিসে এসেছে,

عن جابررض عن النبي قال لا تمس النار مسلما راني أو راى من راني

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. ইরশাদ করেন, জাহান্নামের আগুন সে মুসলমানকে স্পর্ষ করতে পারে না, যে আমাকে দেখেছে (অর্থাৎ আমার সাহাবীরা) কিংবা আমাকে যারা দেখেছে তাদেরকে দেখেছে (অর্থাৎ তাবেয়ীরা)। (তিরমিজি: ৩৮০১)

এক হাদিসে রাসুলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেন,

عن عبد الله بن مغفلرض قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ………من آذاهم فقد آذاني و من آذاني فقد آذى الله و من آذى الله فيوشك أن يأخذه

আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, '…… যে আমার সাহাবীদেরকে কষ্ট দিল সে যেন আমাকে কষ্ট দিল; যে আমাকে কষ্ট দিল সে যেন আল্লাহকে কষ্ট দিল; যে আল্লাহকে কষ্ট দিল অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।' (তিরমিযী: ৩৭৯৭)

সাহাবায়ে কেরাম ঈমান যাচায়ের কষ্টিপাথর

সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা. এর সংস্রব ও সাহচর্যের মাধ্যমে বিশ্বজনীন খ্যাতনামা ও মানবতাবোধ সম্পন্ন উন্নত জাতিতে পরিণত হলেন। শুধু তাই নয়; বরং বিশ্বমানবতার জন্য চির অনুসরণযোগ্য এবং উম্মতের ঈমান-আমলের সত্যতা ও শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের জন্য মাপকাঠির সনদ লাভ করেছেন মহান আল্লাহর পাক থেকে।

আল্লাহর ভাষায় : সাহাবায়ে কেরামের ঈমানকে অন্যদের ঈমান যাচায়ের কষ্টিপাথর সাব্যস্ত করে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদেরকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন,

فإن امنوا بمثل ما امنتم به فقد اهتدوا و إن تولوا فإنما هم في شقاق

'যদি তারা ঈমান আনে, যেরূপ তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর যদি তারা (এত্থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা হঠকারিতায় রয়েছে।' (সূরা বাক্বারা: ১৩৭)

এই আয়াতে সাহাবীদের ঈমানকে আদর্শ ঈমানের মাপকাঠি সাব্যস্ত করে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, মহান আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত ঈমান সেরকম ঈমান, যা রাসূলের সাহাবীগণ অবলম্বন করেছেন। যে ঈমান ও বিশ্বাস এত্থেকে চুল পরিমাণও ভিন্ন, তা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।

অপর আয়াতে মুনাফিকদের হঠকারিতার বিষয় উল্লেখ করে ইরশাদ করেন,

و إذا قيل لهم امنوا كما امن الناس قالوا أنؤمن كما امن السفهاء ألا إنهم هم السفهاء و لكن لا يعلمون

'যখন তাদেরকে বলা হয়, মানুষরা অর্থাৎ সাহাবীরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আন। তখন তারা বলে আমরাও কি বোকাদের মতো ঈমান আনব? মনে রেখো প্রকৃতপে তারাই বোকা; কিন্তু তারা তা বোঝে না।' (সুরা বাক্বারা: ১৩

এই আয়াতেও একই কথা বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার দরবারে সাহাবীগণের ঈমানই গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ যে বিষয়ে তাঁরা যেভাবে ঈমান এনেছিলেন অনুরূপ ঈমান যদি অন্যরা আনে, তবেই তাকে ঈমান বলা হয়; অন্যথায় তাকে ঈমান বলা চলে না। এতে বোঝা গেল যে, সাহাবীগণের ঈমানই ঈমানের কষ্টিপাথর, যার নিরিখে কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট সব উম্মতের ঈমান পরীক্ষা করা হয়। এ কষ্টিপাথরের পরীক্ষায় যে ঈমান সঠিক বলে প্রমাণিত না হয়, তাকে ঈমান বলা যায় না এবং অনুরূপ ঈমানদারকে মুমিন বলা চলে না। এর বিপরীতে যত ভালো কাজ বা কথা হোক না কেন, আর তা যত নেক নিয়তেই হোক না কেন, আল্লাহর নিকট তা ঈমানরূপে স্বীকৃতি পায় না; বরং তা মুর্খতা ও বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।

রাসুলের ভাষায় সাহাবায়ে কেরাম

রাসূলুল্লাহ সা. পরবর্তী উম্মতদেরকে সাহাবীদের অনুকরণ ও অনুসরণ করে নিজেদের জীবনকে হেদায়াতের আলোতে আলোকিত করার জন্য গুরুত্বারোপ করেছেন। এ মর্মে অনেক হাদীস রয়েছে। তম্মধ্যে এখানে একটি হাদীস উল্লেখ করা হল।

عن عمر بن الخطابرض قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم أصحابي كالنجوم فبأيهم اقتديتم اهتديتم –

رزين (مشكاة ৫৫৪)

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, 'আমার সাহাবীরা আকাশের তারকাতুল্য। তোমরা তাদের যেকোনো একজনের অনুসরণ করবে, হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে।' (মিশকাত)

বিশিষ্ট সাহাবী হ.আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ রা.-এর ভাষায় :

عن عبد الله بن مسعودرض قال من كان مستنا فليستن بمن قد مات ……. واتبعوهم على أثرهم وتمسكوا بما استطعتم من أخلاقهم وسيرهم فإنهم كانوا على الهدى المستقيم

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ রা. উম্মতে মুহাম্মদীকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তোমরা যদি হেদায়াতের পথ চাও, সফলতা অর্জনে আগ্রহী হও, মহান আল্লাহর পরিচয় ও রাসূল (সা.) এর প্রেম-ভালোবাসার উচ্চ শিখরে পৌঁছতে আবেগমান হও, তবে তোমরা পূণ্যাত্মা সাহাবায়ে কেরামের পথ ধরে চল। তাঁদের আখলাক ও আদর্শকে নিজেদের জন্য গন্তব্যে পৌঁছার একমাত্র তরিকা স্থির করে নাও। তাঁদের অনুকরণ ও অনুসরণকে নিজেদের জন্য চূড়ান্ত সফলতার মাধ্যম মনে কর এবং তাঁদের প্রতি অগাধ মায়া-মহব্বত ও গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধার বিনিময়ে নিজেদের জীবনের প্রতিটি অংশকে নূরান্বিত করতে সচেষ্ট হও। কেননা তাঁরা সরল-সঠিক পথে ছিলেন।' (মিশকাত)

সত্যের মাপকাঠি না মানলে যে সমস্যা দাড়ায়

সত্যিকারের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতপন্থীদের জন্য অনেক সমস্যা; যদিও পরিপন্থীদের জন্য কোনো সমস্যা নেই। এখানে কয়েকটি সমস্যার কথা উল্লেখ করা হলো।

১. কোরআনের উপর অনাস্থা

একথা চিরসত্য যে, সরাসরি রাসূল সা. এর পবিত্র জবান থেকে কোরআন শরীফের এক একটি আয়াত সহী-শুদ্ধভাবে শিখেছেন এবং তা সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে পরবর্তী উম্মত পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পৌঁছে দিয়েছেন যাঁরা, তাঁরা হলেন রাসূল সা. এর আস্থাভাজন সাহাবায়ে কেরাম। সাহাবীগণ যখনই কোনো আয়াত রাসূলের জবানে শুনতেন, তাৎক্ষণিক তা লিখে নিতেন বা মুখস্থ করে নিতেন। আবার বিশেষভাবে কয়েকজন সাহাবী রাসূল সা. এর পক্ষ থেকে ওহী লিখার দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত মু‘আবিয়া রা. বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাসূল সা. ইহজগৎ ত্যাগ করার পর হযরত উমর রা.- এর পরামর্শক্রমে মুসলিম জাহানের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা. এর তত্ত্বাবধানে কোরআনের বিক্ষিপ্ত আয়াতকে সংকলন করতঃ পর্যায়ক্রমে তাকে এডিশনে রূপায়ণের কাজও আঞ্জাম দিয়েছেন নবীজীর সৌভাগ্যবান সাহাবীরা। তাঁদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা. বিশেষভাবে উলেখযোগ্য। তারপর দূরদর্শী সাহাবী হযরত হুযায়ফা রা. এর পরামর্শক্রমে হযরত উসমান রা. ২৫হিজরী সনে পঞ্চাশ হাজার সাহাবীর বিশাল সম্মেলন ডেকে সকলের সম্মতিক্রমে কুরাইশী ভাষায় কোরআনের নতুন এডিশন তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেজন্যে তিনি চার সদস্যবিশিষ্ট পরিষদ তথা হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা., আব্দুলাহ ইবনে যুবায়র রা., সাঈদ ইবনে ‘আস রা. ও আব্দুলাহ ইবনে হারিস রা.কে দায়িত্ব দেন। তাঁরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অত্যন্ত সততা, দতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিখুঁতভাবে এই মহতী কাজের আঞ্জাম দেন। তৈরি হয় কোরআনের নতুন এডিশন, যার অবিকল অনুুলিপি আজ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের হাতে রয়েছে।

নবীজির প্রিয় সাহাবীগণ যদি অকান্ত পরিশ্রম ও অপূর্ব সাধনার বিনিময়ে কুরআনের সংরণ ও সংকলনের কাজ আঞ্জাম না দিতেন, তাহলে পরবর্তী উম্মত চিরদিনের জন্য কোরআনের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত থেকে যেত। অতএব যাঁদের মাধ্যমে আমরা কোরআন পেয়েছি, তাঁদেরকে সত্যের মাপকাঠি না মানা; তাঁদেরকে সমালোচনার উর্ধ্বে মনে না করা; এক কথায় তাঁদের প্রতি অনাস্থাভাব পোষণ করা এবং তাঁদেরকে কোনো না কোনোভাবে কদর্য করা পরোক্ষভাবে কোরআনকে কদর্য করা এবং কোরআনের প্রতি অনাস্থাভাব পোষণ করা। যেহেতু বর্ণনার উপর নির্ভরতা বর্ণনাকারীর উপর নির্ভর করে। বর্ণনাকারী গ্রহণযোগ্য হলে, তার বর্ণিত বিষয় গ্রহণযোগ্য; আর বর্ণনাকারী অনির্ভরযোগ্য হলে, তার বর্ণিত বিষয় অনির্ভরযোগ্য; বর্ণনাকারী বিতর্কিত ও সমালোচিত হলে, তার বর্ণিত বিষয় বিতর্কিত সমালোচিত হয়ে যায়; এটাইতো সর্বজন স্বীকৃত কথা।

২. হাদীস শরীফের উপর অনাস্থা

কোরআনের সংরক্ষণ করেছেন যেমন সাহাবায়ে কেরাম, নবিজির হাদীসভাণ্ডারের সংরক্ষণ করেছেন তাঁরা। তাঁদের থেকেই পর্যায়ক্রমে তা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। অতএব সাহাবীগণকে যদি সমালোচনার পাত্র বানানো হয়, তবে তাঁদের সংরক্ষিত হাদীসভাণ্ডারও নির্ভরযোগ্য থাকে না। তাহলে দ্বীন-শরীয়ত বলতে আর কী থাকে?

৩. রাসূলের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা

 অনেক হাদীসে রাসূল সা. সাহাবীদের সমালোচনা করতে এবং তাঁদেরকে তুচ্ছ নজরে দেখতে নিষেধ করেছেন। এমর্মে এখানে একটি হাদীস উল্লেখ করা হলো,

عن عبد الله بن مغفلرض قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الله الله في أصحابي لا تتخذوهم غرضا من بعدي الخ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহকে ভয় কর। তাদেরকে (সমালোচনার) ল্যবস্তু স্থির করো না। (তিরমিযী: ৩৭৯৭) মুসনাদে আহ্মদ- হাদীস

এই হাদীসের আলোকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবীদের সমালোচনা করলে, নিশ্চিত রাসূল সা. এর নিষেধাজ্ঞা অমান্য হয়।

৪. রাসূলের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ

সাহাবীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করলে, তা স্বয়ং নবীজির প্রতি বিদ্বেষ পোষণের নামান্তর। নিম্নবর্ণিত হাদীস দ্বারা তাই প্রমাণিত হয়।

عن عبد الله بن مغفلرض قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ………. فمن أحبهم فحبي أحبهم و من أبغضهم فبغضي أبغضهم (مشكاة ৫৫৪)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, '………..যারা (আমার) সাহাবাকে ভালোবাসল, তারা আমার ভালোবাসায় তাদেরকে ভালোবাসল এবং যারা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করল, তারা আমার প্রতি বিদ্বেষের কারণে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করল।' (তিরমিযী: ৩৭৯৭)

৫. সাহাবীদেরকে কদর্য করা রাসূল সা.কে কদর্য করার নামান্তর

সাহাবায়ে কেরামের সম্পূর্ণ শিক্ষা ও শিষ্টাচার রাসূল সা. থেকে অর্জিত। তাঁদের নম্রতা-ভদ্রতা ও ঈমানী-আমলী ত্যাজদীপ্ততা রাসূল সা. এর মহত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে চন্দ্র, সূর্য থেকে আলো গ্রহণ করতঃ সূর্যের ঔজ্জ্বল্যের প্রতিনিধিত্ব করে। এ মর্মে কবি যথার্থ বলেছেন, অর্থাৎ যেই চাঁদ মক্কা নগরির দিগন্তজুড়ে আভা ছড়িয়ে উদ্ভাসিত হলো, সেই চাঁদের উজ্জ্বল নত্র হলেন সাহাবায়ে কেরাম।

অতএব, সাহাবায়ে কেরামের জীবনকে কলুষযুক্ত করে দেখা, স্বয়ং রাসূলের জীবনকে কলুষযুক্ত করে দেখার নামান্তর।

৬. সুন্নতের বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়া

এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, বিদ্যুতের পাওয়ার হাউজ থেকে স্বচ্ছ বিদ্যুৎ লাভ করার জন্য নিখুঁত তারের মাধ্যম গ্রহণ করা আবশ্যক। তবেই বিদ্যুৎ দ্বারা উপকৃত হওয়ার আশা করা যায়। পক্ষান্তরে ত্রুটিযুক্ত তারের মাধ্যম গ্রহণ করলে উপকৃত হওয়ার বিপরীতে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। ঠিক তেমনিভাবে যারা রাসূলে করীম সা. এর স্বচ্ছ সোনালী আদর্শের পাওয়ার হাউজ থেকে আলো গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করতে চায়, তবে তারা অবশ্যই সাহাবায়ে কেরামকে মাপকাঠি মেনে তাঁদেরকে নিখুঁত মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে যারা এই নিখুঁত মাধ্যমকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো ত্রটিযুক্ত মাধ্যম গ্রহণ করবে, তারা নিশ্চয় সুন্নতে রাসূলের বরকত থেকে আজীবন বঞ্চিতই থাকবে। ইহকাল ও পরকালে তাদের বিপদ অবশ্যম্ভাবী।

৭. আল্লাহর অভিশাপের পাত্র হওয়া

যারা সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করে, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ পতিত হয়। নিম্নবর্ণিত হাদীস একথার সাক্ষী।

عن عبد الله بن عمررض قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا رأيتم الذين يسبون أصحابي فقولوا لعنة الله على شركم (ترمذي ص২২৫)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, যখন তোমরা ওইসব ব্যক্তিকে দেখবে, যারা আমার সাহাবাকে গাল-মন্দ করে, তখন তোমরা বলে দাও, তোমাদের এই মন্দ আচরণের কারণে তোমাদের উপর আল্লাহর লানত। (মিশকাত: ৫৫৪)

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ