অপরের কল্যাণ কামনার ফজিলত

ঢাকা, সোমবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৮,   ১৮ সফর ১৪৪৩

অপরের কল্যাণ কামনার ফজিলত

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৫৯ ২৭ জুলাই ২০২১  

পেয়ারা নবী, রাসূলের আরাবি (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন হলো নসিহতের নাম। ছবি: সংগৃহীত

পেয়ারা নবী, রাসূলের আরাবি (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন হলো নসিহতের নাম। ছবি: সংগৃহীত

পেয়ারা নবী, রাসূলের আরাবি (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন হলো নসিহতের নাম। দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা ও সদুপদেশের নাম। দ্বীন হলো আনুগত্যের নাম।’ আমরা (সাহাবি) আরজ করলাম, (এ কল্যাণকামিতা) কার জন্য? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ও তার কিতাবের, তার রাসূলের, মুসলিম শাসক এবং মুসলিম জনগণের।’ (মুসলিম)। এই হাদিসটি তামিম আদ দারি (রা.) থেকে বর্ণিত। এছাড়া আরও অনেক হাদিস বিশারদ থেকেও বর্ণিত হয়েছে। 

‘নসিহাহ’ এর এ হাদিসটি বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। ইমাম আবু দাউদ (র.) বলেছেন, পাঁচটি হাদিসে ফিকাহর সারমর্ম নিহিত।
১. হালাল স্পষ্ট ও হারাম স্পষ্ট।
২. ক্ষতি করাও যাবে না। ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না।
৩. আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
৪. দ্বীন হলো নসিহার নাম।
৫. আমি তোমাদের যা আদেশ দিই, তোমরা তা গ্রহণ করো এবং যে বিষয়ে তোমাদের নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাকো।

হাফেজ আবু নুআঈম বলেছেন, ‘নাসিহাহ’ এর হাদিসটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মুহাম্মদ বিন আসলামা তুসী উল্লেখ করেছেন, ‘আদ দ্বীন আন নাসিহাহ’ হাদিসটি দ্বীনের চার ভাগের এক ভাগ। এ হাদিসটি সদাসর্বদা প্রত্যেক নর-নারীর জন্য শিরোধার্যের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রমাণ, আল্লাহ তায়ালা শরিয়তের বিধিবিধান পালনে আদিষ্ট কিছু ব্যক্তি থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু ওজর ও অপারগতার কারণে কিছু ইবাদত রহিত করেন। কিন্তু ‘নাসিহাহ’ এর বিষয়টি কোনো অবস্থাতেও কোনো ওজরের কারণে রহিত হয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘দুর্বল, রুগ্ন, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোনো অপরাধ নেই, যখন তারা আল্লাহ ও রাসূলের সঙ্গে মনের দিক থেকে পবিত্র হবে। নেককারদের ওপর অভিযোগের কোনো পথ নেই। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী দয়ালু।’ (সুরা তওবা : ৯১)।

আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, এক মুহূর্তের জন্যও নসিহাহ পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে তিনি কোনো মুসলমানের ওজর-আপত্তি গ্রহণ করবেন না। তাই তো সাহাবিরা নসিহতের অর্থ সম্পর্কে কখনোই জিজ্ঞেস করেননি। কেননা তারা জানতেন, ‘নসিহত’ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ও আবশ্যকভাবে দ্বীনের ব্যাপক অর্থ বহন করে এবং ঈমান, ইসলাম ও ইহসানের স্তরগুলোকেও শামিল করে। এ কারণেই সাহাবিরা শুধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘নসিহত’টা কার জন্য ইয়া রাসূল্লাল্লাহ? আর কারা এর উপযুক্ত?

নাসিহার প্রকৃত অর্থ কোনো কিছুকে দোষত্রুটি ও অভ্যন্তরীণ ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত করা। যেমন মোম ইত্যাদি থেকে মধুকে মুক্ত করা হলে, বলা হয়; ‘মধুকে খাঁটি করা হয়েছে’।

আল্লাহর প্রতি নসিহত ও আনুগত্যের অর্থ, আল্লাহকে ভালোবাসা, তার প্রতি বিনয় প্রদর্শন করা। তার সামনে নম্রতা প্রকাশ করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণে ও তার ক্রোধ-শাস্তির ভয়ে তার কাছে আত্মসমর্পণ করা। তার শরিয়তকে মেনে চলা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘শুধু তারাই আমার আয়াতগুলোর প্রতি ঈমান আনে, যারা আয়াতগুলো দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং অহংকারমুক্ত হয়ে তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে। তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা সিজদা : ১৫-১৬)। 

আরও বলেছেন, ‘কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।’ (সুরা বাকারা : ১৬৫)। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসো। কেননা তিনি তোমাদের বিচিত্র নেয়ামতের মাধ্যমে আহারের ব্যবস্থা করেন।’

আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বড় নসিহত ও আনুগত্য হলো, সব নবীর সরদার মুহাম্মদ (সা.) এর পথ ও আদর্শ অনুসরণ করে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র তার ইবাদত করা। তার সঙ্গে কোনো শিরক না করা। দোয়া, ইস্তেগফার, নুসরাত ও তায়াক্কুলসহ সব ধরনের ইবাদত একমাত্র রবের জন্য নিবেদন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘বলুন, আমি তো আমার পালনকর্তাকেই ডাকি এবং তার সঙ্গে কাউকে শরিক করি না।’ (সুরা জিন : ২০)।

মহান রবের ইবাদত করা হয়। কারণ তিনি সিফাতে কামালি ও জালালির অধিকারী এবং তিনি অপরিপূর্ণ সব বৈশিষ্ট্য থেকে পূতপবিত্র। আমরা আল্লাহর ইবাদত করি। কারণ মাখলুকের ওপর তারই নেয়ামতের ছায়া সদা বিদ্যমান। বান্দারাও তার রহমতেরই মুখাপেক্ষী। আর ইবাদত আল্লাহর কল্যাণ প্রাপ্তির মাধ্যম এবং মানুষের জন্য জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পরে সব অনিষ্ট প্রতিরোধকারী।

আল্লাহ তায়ালা কোরআনে নিজের জন্য যে বিষয় সাব্যস্ত করেছেন, রাসুল সা. আল্লাহর যে নাম ও গুণ সাব্যস্ত করেছেন। যে সাব্যস্ত বিষয়ের ওপর সাহাবিরা রা. ছিলেন। তা অক্ষুণ রাখার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি নসিহত ও আনুগত্য অর্জন হবে। এক্ষেত্রে কোনো ব্যাখ্যা করা যাবে না। আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে হবে। কোনো নিষ্ক্রিয়তার গুণ সাব্যস্ত করা যাবে না। উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘বান্দার ইবাদতগুলোর মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ইবাদত আমার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন।’ (মুসনাদে আহমদ, তাবারানি)।

রাসূলে কারিম (সা.) এর প্রতি নসিহত ও আনুগত্যের অর্থ, তাকে ভালোবাসা। তাকে শ্রদ্ধা করা। তার সুন্নতকে সম্মান করা। তার আদেশ মেনে চলা। নিষেধ থেকে বিরত থাকা। তার শরিয়ত মোতাবেক আল্লাহর ইবাদত করা। তার দেখানো পথ অনুসরণ করা। তার খবরগুলোকে সত্যায়ন করা। তার হাদিসের প্রচার করা। তাকে এবং তার সুন্নতকে রক্ষা করা। তার দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘বলুন, আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। তোমরা যদি তার আনুগত্য করো, তবে সৎপথ পাবে। রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু সুস্পষ্টরূপে পৌঁছে দেওয়া।’ (সুরা নুর : ৫৪)।

আল্লাহর কিতাবের প্রতি নসিহত ও আনুগত্যের অর্থ, কোরআন কারিমকে সম্মান করা। হৃদয় দিয়ে ভালোবাসা। কোরআন শেখা, শেখানো এবং এর বিধানাবলি হৃদয়ঙ্গম করতে যথাসাধ্য কোশেশ করা। কোরআন বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াত করা। এর আদেশগুলো মেনে চলা। নিষেধগুলো থেকে বিরত থাকা। ধারাবাহিক ও সার্বক্ষণিক তেলাওয়াত করা। এর হরফ ও শব্দের হেফাজত করা। কোরআনের অর্থ, তাফসির ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। কোরআন নিয়ে চিন্তাফিকির করা। এর মাধ্যমে চরিত্র গঠন করা। কোরআন-সুন্নাহের অপব্যাখ্যাকারীদের প্রতিরোধ করা। তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা। তাদের ভ্রান্ত মতবাদ খন্ডন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘এই কোরআন এমন পথপ্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল।’ (সুরা ঈসরা : ৯)।

মুসলিম শাসকদের প্রতি নসিহত ও কল্যাণকামিতার অর্থ, তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করা। তাদের ন্যায়নীতি ভালোবাসা। তাদের নেক তৌফিকে আনন্দ প্রকাশ করা। তাদের সঙ্গে খেয়ানত ও প্রতারণা না করা। তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া। তাদের ব্যাপারে বিদ্রোহ না করা। সত্য পথে তাদের সহযোগিতা করা। আল্লাহর নাফরমানিমুক্ত বিষয়ে তাদের আনুগত্য করা। সমস্যা সমাধানে তাদের জন্য সঠিকপথ অবলম্বন ও নেক তৌফিকের দোয়া করা। আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তিনটি কাজ পছন্দ করেন। তোমরা তারই ইবাদত করবে, তার সঙ্গে কিছুই শরিক করবে না। তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জু মজবুতভাবে ধারণ করবে। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না এবং আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বিষয়টি যার দায়িত্বে দিয়ে দিয়েছেন তার জন্য কল্যাণ কামনা করবে।’ (মুসলিম)।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘তোমরা পৃথক থাকা অবস্থায় যা পছন্দ করো তা থেকে জামাতবদ্ধ অবস্থায় যা অপছন্দ করো তা অধিক উত্তম। যুবায়ের ইবনে মুতঈম (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) খুতবায় বলেছিলেন, ‘তিন বিষয়ে মুসলমানের অন্তর কখনও খেয়ানত করতে পারে না। আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ ইবাদত। মুসলমান শাসকের জন্য কল্যাণকামিতা। জামাতে সংঘবদ্ধ থাকা। কেননা ইসলামের দাওয়াত তাদেরকে ঘিরে রাখে।’ (মুসনাদে আহমদ)।

মাকিল ইবনে ইয়াসার বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তায়ালা যাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন; কিন্তু খেয়ানাতকারীরূপে যদি তার মৃত্যু হয়, তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (বোখারি, মুসলিম)।

সাধারণত মুসলমানদের জন্য নসিহত ও কল্যাণকামিতার অর্থ, তাদের কল্যাণার্থে সঠিক পথের নির্দেশনা দেওয়া। দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে তালিম দেওয়া। তাদের দোষত্রুটি গোপন রাখা তাদের প্রয়োজন পূরণ করা। তাদের সঙ্গে খেয়ানত ও প্রতারণা না করা। হিংসা থেকে দূরে থাকা। তাদের জন্য কষ্ট সহ্য করা। নবী-রাসূলের তরিকায় তাদের নসিহাহ করা।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মোমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।’ (সুরা তওবা : ১২৮)।

হযরত নুহ (আ.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং তোমাদের সদুপদেশ দেই। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব বিষয় জানি, যেগুলো তোমরা জান না।’ (সুরা আরাফ : ৬২)।

হুদ (আ.) সম্পর্ক বলেছেন, ‘আমি তোমাদের প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং আমি তোমাদের হিতাকাঙ্খী, বিশ্বস্ত।’ (সুরা আরাফ : ৬৮)।

হযরত সালেহ (আ.)  সম্পর্কে বলেছেন, ‘সালেহ তাদের কাছ থেকে প্রস্থান করল এবং বলল, হে আমার সম্প্রদায়, আমি তোমাদের কাছে স্বীয় প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছিয়েছি এবং তোমাদের মঙ্গল কামনা করেছি; কিন্তু তোমরা মঙ্গলকাক্সক্ষীদের ভালোবাসো না।’ (সুরা আরাফ : ৭৯)।

কল্যাণকামিতা মোমিনের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা ইয়াসিন (আ.) এর প্রতি ঈমান প্রদর্শনকারী সম্পর্কে বলেছেন, ‘রাসূলদের অনুসরণ করো। অনুসরণ করো তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় কামনা করে না, অথচ তারা সুপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা ইয়াসিন : ২০-২১)।

ঘটনার সমাপ্তিতে বলেছেন, ‘তাকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ করো। সে বলল হায়, আমার সম্প্রদায় যদি কোনোক্রমে জানতে পারত!’ (সুরা ইয়াসিন : ২৬)। এ আয়াত প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘স্বজাতির জন্য নাসিহা ও কল্যাণকামিতা বেঁচে থাকাকালীন এবং মৃত্যুর পরেও।’ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘মোমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজুরাত : ১০)। আরও বলেছেন, ‘আর তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে